করোনা ভ্যাকসিন: কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

0
22

করোনা ভ্যাকসিন: কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা
সৌগত নিয়োগী

করোনা ভাইরাসজনিত অতিমারী বিগত এক বছরে বিশ্ব জুড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে নিদারুণভাবে ব্যাহত করেছে। করোনা ভাইরাস পরিবারে সাত সদস্য। তার মধ্যে তিনটি- MARS ও SARS এবং নবীনতম SARS-COV-2 মানুষের শসনালী ও ফুসফুসে বাসা বেঁধে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি করে। মারণ-ক্ষমতার নিরিখে MARS ও SARS এর তুলনায় SARS-CoV-2 অনেকটাই পিছিয়ে। SARS-COV-2 তে প্রতি ১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ২ জন মারা যায়। সেখানে MARS ও SARS এর ক্ষেত্রে সংখ্যাটা যথাক্রমে ৪০ ও ১০। কিন্তু বিপদ লুকিয়ে অন্য জায়গায়। বাকি দুটি ভাইরাসের তুলনায় SARS-COV-2 এর সংক্রামণ-ক্ষমতা অনেক বেশি। আর তাই প্রাদুর্ভাবের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এই ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্টি করেছে এক ভয়াল পরিস্থিতি। কোন মহামারি কতখানি ভয়াবহ, মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে তার সামান্যই বিচার করা যায়। কারণ, মহামারি বা অতিমারি সমাজের একটা বড় অংশকে গ্রাস করলেও যারা শারীরিকভাবে দুর্বল, ক্ষতিটা তাদেরই বেশি হয়। অতিমারির করাল থাবায় সমাজ, অর্থনীতি ও জনমানসে সে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, মৃত্যু মিছিলের আড়ালে তা অনেক সময়ই চাপা পড়ে যায়।


ঋতুবদলের সর্দি-জ¦রের তুলনায় কোভিড কেন বিপজ্জনক? কারণ, আর পাঁচটা ফ্লু-ভাইরাসের তুলনায় করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরে অনেকদিন বেশি সক্রিয় থাকে (প্রায় ১৪ দিন)। এই দীর্ঘ সময়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। বিশেষ করে উপসর্গহীন রোগী নিজের অজ্ঞাতসারে সুস্থ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় করোনা ভাইরাস। বিপদের আর-একটা কারণ হলো উপযুক্ত প্রতিষেধকের অভাব। এখন অবধি করোনা মোকাবিলায় কার্যকরী কোনো সুনির্দিষ্ট ঔষধের ব্যবহার জানা যায়নি, যা আছে তা একান্তই জীবনদায়ী ও আপৎকালীন ব্যবস্থা মাত্র। ক্ষীণ আশা যোগাচ্ছে প্লাজমা-থেরাপি। করোনা-আক্রান্ত রোগী যখন সুস্থ হয়ে যায় তখন তার শরীরে ভাইরাস-ধ্বংসকারী প্রোটিন বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির রক্তরস বা প্লাজমায় মিশে থাকা সেই অ্যান্টিবডিকে ব্যবহার করে অন্য রোগীর চিকিৎসা করার নামই হলো প্লাজমা-থেরাপি। প্রাথমিক গবেষণায় এই পদ্ধতি কিছুটা সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু তার পরেও, অ্যান্টিবডি কতদিন কার্যকর থাকবে, প্লাজমা-থেরাপির পার্শসর্প্রতিক্রিয়াই বা কী- এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
বিশ্বব্যাপী এই বিপর্যয়কে সামাল দেওয়ার উপায় একটিই। দ্রুত প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন তৈরি এবং তার সুপরিকল্পিত প্রয়োগ। অতিমারির এই ভয়াবহরূপ বিভিন্ন দেশকে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে লড়াই করতে শিখিয়েছে। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী নিরন্তর কাজ করে চলেছেন করোনার ভ্যাকসিন আসলে কী? ভ্যাকসিন এক ধরনের জৈব-হাতিয়ার, যা প্রয়োগ করলে আমাদের শরীরে কোনো নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা ইমিউনিটি গড়ে ওঠে। ভ্যাকসিন বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি হতে পারে। যেমন নিষ্ক্রিয় জীবাণু (ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া), জীবাণুর সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এমন কোনো উপাদান, জীবাণুর দেহের অংশ বিশেষ- রোগ সৃষ্টিকারী জৈব পদার্থ, DNA বার্তাবাহী বা মেসেঞ্জার RNA ইত্যাদি। এই উপাদানগুলি মানুষের শরীরে ঢুকে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, অথচ আমাদের শরীর ঐ ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি জেনে যায়। এভাবেই তৈরি হয় ইমিউনিটি। এ যেন চোরকে হাত বেঁধে বাড়ির অন্দরমহলে ঘুুরিয়ে আনা! চুরিও হলো না, আবার বাড়ির লোকজন সবাই চোরকে চিনেও রাখল। ভবিষ্যতে চোরকের দেখলেই বাড়ির লোক যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে। ভ্যাকসিন যে শুধু রোগের প্রতিষেধক। (প্রোফাইল্যাক্টিক) হিসাবে ব্যবহৃত হয় তা কিন্তু নয়, অনেক সময় নিরামক (থেরাপিউটিক) হিসাবেও কাজ করে। এছাড়া কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য কখনো কখনো ভ্যাকসিনের সঙ্গে সহায়ক উপদান হিসাবে বিভিন্ন রাসায়নিক বা জৈব পদার্থও প্রয়োগ করা হয়। ভাইরাস-ঘটিত রোগের মোকাবিলায় ভ্যাকসিন হলো একই সঙ্গে নিরাপদ এবং কার্যকারী অস্ত্র। রাশিয়া, ফ্রান্স, ভারত, ইংল্যান্ড-সহ বিভিন্ন দেশের গবেষণায় একাধিক ভ্যাকসিন উঠে এসেছে।
অবশ্য ল্যাবরেটরির ঘেরাটোপে আবিষ্কার হলো মানেই সে সেই ভ্যাকসিন অবাধে মানুষের ওপর প্রয়োগ করা যায়, তা কিন্তু নয়। মাঝে পার করতে হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অগ্নি পরীক্ষা।
সমগ্র বিশ্বে বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিনের কাজ চলছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভ্যাকসিন হলো মডার্না-র ভ্যাকসিন, ফাইজার-নির্মিত ভ্যাকসিন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এবং ভারতবর্ষের কোভ্যাকসিন (ডিসেম্বর ২০২০-র মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে) মডার্না এবং ফাইজার- দুটি ভ্যাকসিনেরই মূল উপাদান মেসেঞ্জার RNA।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করা ভ্যাকসিন এবং রাশিয়ার স্পুটনিক ভি-এই দুটির কার্যপদ্ধতি বেশ অভিনব। এদের বলা হয় ‘অ্যাডেনো ভাইরাল ভেক্টর-ভিত্তি ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের মূল উপাদানটিকে সরাসরি মানবদেহে প্রয়োগ না করে অন্য আর-একটি ভাইরাসের (অ্যাডেনো ভাইরাস) সাহায্য নেওয়া হয়। জৈব প্রযুক্তির সাহায্যে প্রথমে অ্যাডেনো ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। তারপর ভ্যাকসিনের মূল উপাদান তার দেহে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। নিষ্ক্রিয় ভাইরাসটি এরপর মানবদেহের গভীরে প্রবেশ করে পৌঁছে দেয় ভ্যাকসিনের উপাদান। এ যেন খামের মধ্যে পুরে সঠিক ঠিকানায় চিঠি পাঠানো।
ভারত বায়োটেক এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (ICMR )-এর যৌথ প্রচেষ্টায় কোভ্যাকসিন হলো ভারতের মাটিতে তৈরি হওয়া প্রথম ভাকসিন। এই ভ্যাকসিনে উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে নিষ্ক্রিয় করোনা ভাইরাস। কোভ্যাকসিন ছাড়া আরো তিনটি ভ্যাকসিনের কাজ বর্তমানে ভারতে এগিয়ে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের HDT বায়োটেক কর্পোরেশনের সহযোগিতায় পুনের জেনোভা নামক সংস্থা তৈরি করেছে মেসেঞ্জার RNA নির্ভর ভ্যাকসিন HGCO 19 প্রাথমিক গবেশণায় দেখা গিয়েছে যে, বাকি সব ভ্যাকসিনের তুলনায় HGCO ভ্যাকসিনকে সংরক্ষণ করা যায় অনেক বেশি দিন। আহমেদাবাদের ক্যাডিলা হেল্থ কেয়ার (জাইডাস ক্যাডিলা) আবিষ্কৃত জাইকোভ-ডি-এর উপাদান DNA প্লাজমিড। সবশেষে, ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এবং মিনভ্যাক্স নামক সংস্থা যৌথ উদ্যোগে বানিয়েছে পেপটাইড (অ্যামাইনো অ্যাসিডের চেন, প্রোটিনের টুকরো বলা চলে) নির্মিত ভ্যাকসিন। এছাড়াও অন্যতম নামজাদা প্রতিষ্ঠান সেরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ভারত বর্ষে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করা ভ্যাকসিনটিকে ‘কোভিশিল্ড’ নামে প্রস্তুত করছে।


মহামারির সঙ্গে লড়াই মানে আসলে সময়ের সঙ্গেও লাড়াই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আমরা এত দ্রুত সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছালাম কিভাবে? আসলে ২০০৩ সালে যখন SARS ভাইরাসের (যা আদতে করোনা ভাইরাসই) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল তখনি এই সংক্রান্ত গবেষণা বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। তাই SARS-COV-2 এর ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুবিধা পাওয়া গিয়েছে। আশু বিপদের আশংকায় অতিমারির কালে ভ্যাকসিন গবেষণায় প্রচুর পরিমাণ অর্থও ঢালা হয়েছে, তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো গিয়েছে নিশ্চিন্তে। তাছাড়া, প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে বিপুল পরিমাণ তথ্যের বিশ্লেষণ হয়ে যায় অতি সহজে, তথ্যের আদান-প্রদানও হয় চোখের নিমেষে। এই সব কটি বিষয় একযোগে কাজ করেছে বলেই এত দ্রুত আমরা করোনারোধী ভ্যাকসিন পেয়েছি। ভ্যাকসিন নিয়ে আশার আলো দেখা যেতেই তার সফল ও সুষ্ঠু বণ্টন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশই তাদের নাগরিকদের কাছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ভ্যাকসিনের সুফল পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিচ্ছে।


আমরা সকলেই করোনা বিপর্যয়ের দ্রুত সমাপ্তি চাই। তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ভাইরাস খুব দ্রুততার চরিত্র বদল করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মিউটেশন’। মিউটেশনের ফলে করোনা যেমন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে যেতে পারে, তেমনি শক্তি বাড়িয়ে অন্যরূপে ফিরেও আসতে পারে। তবে সৃষ্টি হওয়া নতুন প্রজাতি ভয়ঙ্কর কিনা তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন। এই ‘নিউ-নর্মাল’ জীবনযাত্রায় আমরা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেই এগিয়ে যাব নিজ নিজ গন্তব্যে। ভয়াল এই অতিমারি সহনশীলতা ও সহযোগিতার যে শিক্ষা দিয়ে গেল তা ভবিষ্যতে পথচলায় আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here