করোনা সংকট মহামারির বিষয়ে ইতিহাস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

3
293

প্রথমত, পাকাপাকি ভাবে বর্ডার আটকে দিয়ে আপনি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন না। মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের বহু আগে, সেই মধ্যযুগেও মহামারি খুব দ্রুত ছড়িয়েছে। তাই, সেই ১৩৪৮ সালে ইংল্যান্ড যেমন মহামারি ঠেকাতে ঠাস করে সমস্ত পৃথিবীর সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল-সেরকম কিছুতে কোনো কাজ হবেনা। নিজেকে বাঁচাতে শুধু আইসোলেশনের মতো মধ্যযুগীয় পন্থায় ফিরে গেলে হবেনা। যেতে হবে একেবারে প্রস্তর যুগে। তা কি করা সম্ভব?

দ্বিতীয়ত, ইতিহাস বলে, মানব সম্প্রদায়ের নিজেদের মাঝে নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য আদান প্রদান ও বৈশ্বিক সংহতির মধ্য দিয়ে আসে সত্যিকারের সুরক্ষা। যখন কোনো রাষ্ট্র মহামারিতে আক্রান্ত হয় তখন নিজেদের কোনরকম অর্থনৈতিক ধ্বসের ভয় না করে তাদের উচিৎ মহামারী বা রোগ সম্পর্কে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সৎ ভাবে তথ্য ভাগাভাগি করা-যাতে অন্য রাষ্ট্রগুলো ভাগ করা তথ্য বিশ্বাস করতে পারে, ব্যবহার করতে পারে এবং রোগাক্রান্তকে বহিস্কারের বদলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। আজ, চীন করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখাতে পারে, সমস্যা হচ্ছে বিষয়টা খুবই উঁচুমাত্রার আন্তরাষ্ট্রীয় বিশ্বাস এবং সহযোগিতার দাবী রাখে।

কার্যকর একটা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও দরকার আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। কোয়ারেন্টাইন এবং লক-ডাউন মহামারি আটকানোর জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্র আরেকটি রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না, মনে করে ওর সমস্যা ওই সামলাক, তখন এ ধরনের শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নিতে রাষ্ট্রের সরকার দোটানায় পরে যায়। যদি আপনি আপনার দেশে ১০০ করোনা আক্রান্ত রোগী পেয়ে যান, সাথে সাথে ওই এলাকা বা বিভাগ কি লক-ডাউন করে দেবেন? বিষয়টা বড় করে দেখলে দেখা যায়, সিদ্ধান্তটা নির্ভর করছে আপনি অন্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে কী আশা করছেন তার ওপর। নিজের দেশের একটা শহর পুরোপুরি লক-ডাউন ডেকে আনতে পারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যদি আপনি মনে করেন অন্য রাষ্ট্রগুলো তখন এগিয়ে আসবে আপনার পাশে- তখন এই তড়িৎ পদক্ষেপটা নিতে আপনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। কিন্তু যদি ভাবেন অন্য দেশগুলো এগিয়ে আসবে না বা আপনাকে সাহায্য করবে না, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হবে-ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

এ ধরনের মহামারিতে একটা খুব জরুরি বিষয় লোকজনের বোঝা উচিৎ, মহামারী কোনো একটি রাষ্ট্রে হওয়া মানে গোটা মানব প্রজাতিই বিপদের মুখে। কারণ হচ্ছে ভাইরাসেরা বদলায়। করোনার মতো ভাইরাসের শুরুটা হয় প্রাণীতে, যেমন বাদুড়। যখনই এরা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, শুরুর দিকে মানুষের শরীরে এদের খাপ খাওয়াতে কষ্ট হয়। মানুষের শরীরের ভেতর বংশবৃদ্ধি করার সময় এদের সাধারণত মিউটেশন হয়। বেশিরভাগ মিউটেশনই ক্ষতিকারক। কিন্তু এরই মধ্যে কোনো একটা মিউটেশন ভাইরাসকে অনেক বেশি সংক্রামক এবং মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম প্রতিরোধী করে তোলে। এই মিউট্যান্ট স্ট্রেইনটাই মানুষের মধ্যে তখন দ্রুত ছড়াতে থাকে। একজন মাত্র মানুষের ভেতর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ভাইরাস পার্টিকেল অনবরত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। প্রতিটি সংক্রমিত মানুষ তাই ভাইরাসকে ট্রিলিয়ন সংখ্যক নতুন নতুন সুযোগ করে দেন মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার রাস্তা তৈরি করে দেওয়ার জন্য। প্রতিটি সংক্রমিত মানুষ তখন ভাইরাসের জন্যে একটা জুয়ার যন্ত্র, যেখান থেকে তাকে লটারির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টিকিট দেয়া হচ্ছে। এই ট্রিলিয়ন লটারি টিকিট থেকে ভাইরাসের টিকে থাকার জন্যে প্রয়োজন মাত্র একটা টিকিট। একটা বিজয়ী টিকিট।

যা বললাম তা কিন্তু কোনো জল্পনা নয়। রিচার্ড প্রেসটন তাঁর ‘ক্রাইসিস ইন দ্য রেড জোন’ বইতে ২০১৪ সালে ইবোলা আউটব্রেক সম্পর্কে ঠিক এ ধরনের কিছু ঘটনার কথা বলেছেন। আউটব্রেকের শুরুটা হয়েছে যখন ইবোলা ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে ঢুকেছে। এই ভাইরাস মানুষকে ভয়াবহ অসুস্থ বানিয়ে ফেলত কিন্তু তখনও তারা মানুষের শরীরের চাইতে বাদুড়ের শরীরে থাকার জন্যে বেশি মাত্রায় অভিযোজিত। মানুষের শরীরে খুব একটা সুবিধা করতে না পারা, খুবই অপ্রতুল ইবোলা ভাইরাস তাহলে কি করে একটা মহামারী তৈরি করে ফেলল? পশ্চিম আফ্রিকার মাকোনার কোনো এক জায়গায় সংক্রমিত একজনের মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের একটা সিঙ্গেল জিনে একবারের একটা মিউটেশনে হয়েছে এতো কীর্তি। সেই মিউটেশনে তৈরি হওয়া নতুন ইবোলা স্ট্রেইন। নাম মাকোনা স্ট্রেইন, তাতে দেখা গেলো এরা মানুষের শরীরের কোষের কোলেস্টেরল ট্রান্সপোর্টার ভুল তথ্য দেয়া শিখে গেছে। ট্রান্সপোর্টার তখন কোলেস্টেরল এর বদলে ইবোলার মাকোনা স্ট্রেইনকে কোষের ভেতরে নেয়া শুরু করে দিলো। এই মাকোনা স্ট্রেইন ছিল স্বাভাবিক ইবোলা ভাইরাসের চেয়ে মানুষের জন্য চারগুণ বেশি সংক্রামক।

আপনি যখন এই লাইনটা পড়ছেন, তখনই হয়তো তেহরান, মিলান বা উহানে সংক্রমিত কোন মানুষের ভেতর করোনা ভাইরাসের কোন একটা সিঙ্গেল জিনে এরকম একটা মিউটেশন হচ্ছে। যদি আসলেই তা হয়, হুমকিটা কিন্তু শুধুমাত্র ইরানি, ইটালিয়ান বা চাইনিজদের জন্য নয়, হুমকিটা আপনার নিজের জন্যেও। সারা বিশ্বের মানুষের মরা-বাঁচার প্রশ্নে লড়াইটা হচ্ছে করোনা ভাইরাসকে এরকম কোন সুযোগ দেয়া যাবে না। এর অর্থটা খুব সহজ, প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।

১৯৭০ সালে স্মলপক্সকে মানব সম্প্রদায় হারিয়ে দিতে পেরেছিল, এর কারণ হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দেশের প্রতিটি মানুষকে স্মলপক্সের টীকা দেয়া হয়েছিল। তখন যদি একটি দেশও তার সাধারণ জনগনকে টীকা দিতে ব্যর্থ হতো, বিপদে থাকত গোটা মানব প্রজাতিটাই। কারণ যতোদিন স্মলপক্স ভাইরাস টিকে থাকবে, কোথাও না কোথাও এর বিবর্তন হবেই, ছড়িয়ে পরতে পারে আবারও বিশ্বের সবখানে।

ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানব সম্প্রদায়ের উচিৎ খুব সাবধানে সীমানা পাহারা দেওয়া। দুই দেশের মাঝের সীমানা নয়, মানব সম্প্রদায় আর ভাইরাস সম্প্রদায়ের সীমানা। পৃথিবী নামের এই গ্রহে আছে অগণিত প্রজাতির ভাইরাস, এদের অনবরত জিনগত মিউটেশন হচ্ছে। মানব সম্প্রদায় আর ভাইরাস সম্প্রদায়ের মাঝে যে সীমানাটা রয়েছে তা প্রতিটা মানুষের শরীরের ভেতরে রয়েছে। পৃথিবীর কোথাও যদি একটা বিপদজনক ভাইরাস এই সীমানা অতিক্রম করে মানুষের শরীরে ঢুকে যায়, বিপদে তখন গোটা মানব প্রজাতি।

গত শতাব্দীতে মানুষ এই সীমানাকে নজিরবিহীনভাবে শক্তিশালী করেছে। আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই সীমানায় কয়েক দফা দেয়াল তুলেছে আর বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, নার্সেরা ক্রমাগত পেট্রোলিং করে যাচ্ছেন, দেখছেন কেউ সীমানা অতিক্রম করে এদিকে ঢুকে পড়লো কিনা। যদিও এই সীমানার একটা বিশাল অংশ এখনো অরক্ষিত। সারা বিশ্বে এখনো কয়েকশ মিলিয়ন মানুষ আছেন যারা সাধারণ ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ থেকেও বঞ্চিত। এতে করে বিপদে আছি আমরা সবাই। ‘স্বাস্থ্য’ কথাটা আমরা এখনো বুঝি জাতীয় পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বুঝে উঠতে পারিনি। একজন ইরানি বা চাইনিজ নাগরিকের জন্য ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মানে হচ্ছে ওতে মহামারীর হাত থেকে ইসরাইলি বা আমেরিকানরাও রক্ষা পাবে। এই সহজ সরল সত্য কথাটা একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষটিরও বোঝা উচিৎ, কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই কথাটি পৃথিবীর কিছু খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষও বোঝেন না।
রূপান্তর: মানিক চন্দ্র দাস, কো অর্ডিনেটর, স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া
সূত্র: টাইম

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here