করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে আপনার শিশুকে টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে করণীয়

0
791

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
টিকা দিলে শিশু অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকে। সুতরাং যত দ্রুত শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব, ততই মঙ্গল। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সচেতন অনেকেই বাড়ির বাহিরে বের হচ্ছেন না। ফলে অনেকেই সময়মতো শিশুর টিকাও দিতে পারছেন না। এতে অনেক বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেকের মনেই টিকার এই সময়সূচি নিয়ে অনেক প্রশ্ন। সেই বিষয়েই আজকের এই আলোচনা।

১৯৭৯ সালের ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকা দান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিকে ৬টি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া শুরু হলেও পরবর্তীতে তা কয়েক ধাপে বর্ধিত হয়ে বর্তমানে মোট ১০টি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে এই টিকা দান কার্যক্রম চালু আছে।

আসুন, প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক টিকা দানকেন্দ্রে গেলে আপনার শিশুকে কী কী রোগের টিকা দেওয়া হয়?

  • বিসিজি টিকা দেওয়া হয়, যক্ষা রোগ প্রতিরোধের জন্য।
  • ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি এই পাঁচটি রোগের টিকাকে একত্রে বলে পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন।
  • নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিনকে বলা হয় পিসিভি।
  • পোলিও টিকার দুইটি ধরন রয়েছে। একটি ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন, যাকে বলা হয় বিওপিভি। এই টিকা মুখে খাওয়ানো হয়। আরেকটি হলো ইনজেকটেবল পোলিও ভ্যাকসিন, যাকে বলা হয় ফ্র্যাকশনাল আইপিভি।
  • হাম এবং রুবেলার জন্য দেওয়া হয় এমআর টিকা।

কোন টিকা কখন দেওয়া হয়?

  • যক্ষা রোগের জন্য বিসিজি টিকা দেওয়া হয় জন্মের ঠিক পরপর। তবে সেই সময়ে এই টিকা দেওয়া সম্ভব না হলে তা দেড় মাস বয়সে বাকি টিকাগুলোর সাথে শুরু করতে হবে।
  • পিসিপি, পেন্টাভ্যালেন্ট এবং বিওপিভি এই তিনটি টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ৬ সপ্তাহ বা দেড় মাস বয়সে, দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১০ সপ্তাহ বা আড়াই মাস বয়সে এবং তৃতীয় ডোজ ১৪ সপ্তাহ বা সাড়ে তিন মাস বয়সে দেওয়া হয়।
  • ফ্র্যাকশনাল আইপিভির প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৬ সপ্তাহ বা দেড় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৪ সপ্তাহ বা সাড়ে তিন মাস বয়সে।
  • শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলে এম আর টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হলে এম আর টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।

বাচ্চার বয়স দেড় মাস পেরিয়েছে, কিন্তু টিকা এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি; এক্ষেত্রে করণীয় কী?

বাচ্চার দেড় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া শুরু করার কথা থাকলেও কোনো কারণে যদি যথাসময়ে তা শুরু করা সম্ভব না হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা শুরু করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যে টিকা ১ বছর বয়স শেষ হবার আগেই শুরু করতে হবে।

বাচ্চার দেড় মাস এবং আড়াই মাস বয়সের টিকা সময়মত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাড়ে তিন মাস বয়সের টিকা যথাসময়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সময় পার হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

টিকাগুলোর ডোজের মধ্যবর্তী বিরতির কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে নিয়ম হচ্ছে সকল টিকা দুই বছর বয়সের মধ্যেই শেষ করতে হবে। সুতরাং, কোনো কারণে যদি যথাসময়ে টিকা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেই টিকা ৩-৪ মাস পরেও দেওয়া যাবে। প্রথম থেকে নতুন করে টিকা শুরু করতে হবে না।

শিশুর টিকা কার্ডে পরবর্তী টিকার যে তারিখ উল্লেখ আছে, সেই তারিখের পূর্বে টিকা দিলে কি কোনো সমস্যা হবে?

দুইটি টিকার ন্যূনতম বিরতির সময় ১ মাস। ন্যূনতম ১ মাস বিরতির আগে টিকা দিলে তা কার্যকরী হবে না এবং সেই টিকা বাতিল বলে গণ্য হবে। সুতরাং টিকা কার্ডে নির্ধারিত যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, সেই তারিখের পূর্বে টিকা দেওয়া যাবে না।

শিশুর সাড়ে তিন মাস বয়সের মধ্যে টিকার প্রথম তিনটি ডোজ সমাপ্ত হলেও ৯ মাস এবং ১৫ মাস পরে এমআর টিকার দুইটি ডোজ বাদ পড়ে গেছে। বাচ্চার বয়স এখন ১৭ মাস। এক্ষেত্রে করনীয় কী?

আগেই বলা হয়েছে যে শিশুর টিকা দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান ন্যূনতম একমাস হতে হবে। সুতরাং পরবর্তী সময়ে এক মাস ব্যবধান রেখে সেই দুইটি এমআর টিকা দেওয়া সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে অবশ্যই তা দুই বছরের পূর্বে সমাপ্ত করতে হবে।

আবার যদি এমন হয় যে বাচ্চার বর্তমান বয়স ১৩ মাস। তাকে নয় মাস বয়সে এমআর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়নি। সেক্ষেত্রে ১৩ বা ১৪ মাস বয়সে এমআর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া যাবে এবং সেক্ষেত্রে বাচ্চার বয়স যখন ১৫ মাস শেষ হবে তখন সে এমআর টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাবে। কারণ, দুইটি টিকার মধ্যে ন্যূনতম একমাস সময়ের ব্যবধান থাকলেই হবে।

বর্তমানে করোনার এই দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত আছে। কিন্তু আপনার বাসা থেকে টিকাদান কেন্দ্র কত দূরে এবং সেই টিকাদান কেন্দ্রে কি রকম লোক সমাগম হয় তার উপর ভিত্তি করে টিকাদান কেন্দ্রে যাবার পরিকল্পনা করতে পারেন অথবা পরিস্থিতি বিবেচনা করে টিকা দানের সময়সূচি পিছিয়ে দিতে পারেন। এই দুর্যোগে সুস্থ থাকুক প্রতিটি শিশু।

[লেখক :এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here