কষ্টে আছে পথশিশুরা

0
131

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ৬৬ দিনের লকডাউন শেষ। তবে এখনো দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। কোনো কোনো স্থানে এখনো চলছে লকডাউন। অধিকাংশ অফিস চলছে সীমিতসংখ্যক লোক দিয়ে। হোটেল-রেস্টুরেন্টে এখনো কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার খেতে যাচ্ছে না। ব্যাংকপাড়া, বাস স্ট্যান্ড, রেল স্টেশন বা লঞ্চঘাটে মানুষের উপচে পড়া ভিড় নেই বহুদিন। এতে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষ। কারণ পথে চলা এসব সচ্ছল মানুষ ছিল তাদের রুজি-রুটির প্রধান অবলম্বন। হোটেল-রেস্টুরেন্টের উচ্ছৃিষ্ট খাবারের একটি অংশ খেয়ে জীবন ধারণ করত এরা। স্টেশনে বা লঞ্চঘাটে কুলি-মজুরের কাজ বা ফেরি করে কিছুটা আয় হতো। অথবা শপিংমল, অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সচ্ছল মানুষদের দান-দক্ষিণায় চলে যেত এদের দিন।

কিন্তু এখন নেই হোটেল-রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসা। শপিংমলেও নেই ক্রেতাদের ভিড়। পথে আগের মতো নেই সচ্ছল মানুষের ব্যাপক চলাফেরা। নেই ধনীদের প্রাইভেট কারের জ্যাম। তাই এই মানুষদের কপালে জোটে না উচ্ছৃষ্ট খাবার। মেলে না ছোট-খাটো কোনো কাজও। গাড়ির কাছে গেলে করোনার ভয়ে কেউ খোলে না গ্ল¬াস। দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় হোটেলের কর্মচারী ও মালিকরা। পথে হাঁটা অধিকাংশ সচ্ছল ব্যক্তিও এখন আর তাদের দান করে না। কাছে গেলেই তাড়িয়ে দেয়। ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র এখন আগের মতো পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তাতে এক বেলা খাওয়াও জোটে না। তাই এদের অধিকাংশই কখনো খেয়ে বা না খেয়ে স্টেশনের প্লাটফরমে, রাস্তায়, ফুটপাতে, পার্কে বা খোলা স্থানে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে এদের একটাই চিন্তা খাব কি?

কমলাপুরের পথশিশু রাসেল। বয়স ৮-১০ বছর। ওরা ২০-২১ জন এক সঙ্গে থাকে। সবার মধ্যে ও-ই ছোট। কাওসার, ইমরান, শাকিলের বয়স হবে ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এদের বাড়ি কুমিল্লা, ভোলা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে। অধিকাংশই মাদক সেবন করে। রাসেল জানাল, ‘এখন খাবার পাই না। খুব কষ্ট হয়। রাতে ক্ষুধায় ঘুম ভাইঙা যায়। মাঝে মাঝে অনেক কান্না আসে। অনেক সময় পানি খাই। বেশি পানি খাইলে বমি আয়।’ কাওসার জানাল, ‘মজার স্কুল (অদম্য বাংলাদেশ) প্রতিদিন দুপুরে আমাদের খাবার দেয়। অনেক সময় সকালে আর রাতে না খেয়েই থাকি।’ ইমরান জানাল, ‘আগে খারাপ-ভালো কাম করতাম। নিজে খাইতাম অগোও দিতাম। ওহোন ভালো-খারাপ কোনো কামই নাই। কি করুম খাইয়া-না খাইয়াই থাকি।’ তোমরা যে, নেশা করো পুলিশ কিছু কয় না- এমন প্রশ্নের জবাবে জানায়, অনেক দিন ধইরা কিছু কয় না। আগে পিটাইত। করোনা গেলে আবার পিটাইব। এমনিভাবে রাজধানীর পোস্তগোলা, সায়েদাবাদ, গাবতলী, শ্যামপুর, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, শাহবাগসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুধার কষ্টে আছে ছিন্নমূল মানুষ ও পথশিশুরা। এরা এখন বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে ব্যস্ত।

সম্প্রতি সরকারি হিসাব মতে, ছিন্নমূল বা ভবঘুরে মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখের কিছু কম। ২০১৫ সালে ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। এর মধ্যে আড়াই লাখের বেশিই ছিল রাজধানীতে। বর্তমানে পথশিশুর এ সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখ বলে দাবি করছে অনেক সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘করেনাকালে পথশিশুদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের যতটা দায়িত্বশীল মানবিক হওয়ার কথা ছিল; তা হতে পারেনি। এদের অনেকে খাবার না পেয়ে ছোট-খাটো অপরাধে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। এমনটি হতে থাকলে এটা সুষ্ঠু সমাজ গঠনেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এ দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় এদেরকে নিয়ে এই মহামারিকালে তেমন কোনো কাজ করছে না। এমনকি বেসরকারি সংগঠনগুলোও অনেক বেশি এগিয়ে আসছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকটি জোনে ভাগ করে পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের তালিকা করা যেতে পারে। স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার এদের সাহায্য করতে পারে।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বলেন, ‘লকডাউনের সময় সমাজসেবা থেকে সারাদেশে ১ কোটি টাকার কিছু বেশি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে ছিন্নমূল মানুষ ও পথশিশুদের। লকডাউন উঠে যাওয়ার পরে এ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ১০ হাজারের মতো শিশু সরকারের আশ্রয়ে রয়েছে। যারা আগে থেকে আমাদের কাছে আছে, আমরা তাদের দেখভাল করার চেষ্টা করছি।’ তবে সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনার সংক্রমণের ভয়ে তারা নতুন করে কোনো শিশু ও ছিন্নমূল মানুষকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তাদের আশ্রয়ে ৩০০ জনেরও কিছু কম ছিন্নমূল মানুষ রয়েছে। তবে এ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইউনিসেফের পুষ্টিবিষয়ক কর্মকর্তা আসফিয়া আজিম বলেন, ‘এমনিতেই তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে; তার ওপর করোনার কারণে এখন তারা খেয়ে না খেয়ে থাকে। এটা তাদের স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে।’ কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিনা রহমান বলেন, ‘লকডাউনের সময়ে সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য আমাদের চলমান কার্যক্রমও বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এখন আবার শুরু করেছি। করোনাকালে আসলে ভাসমান জনগোষ্ঠীদের নিয়ে খুবই সীমিত আকারে কাজ হচ্ছে। বর্তমানে এদের যে খাবারের কষ্ট তা খুবই অমানবিক।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here