কাজী নজরুল ইসলাম: এক বিস্ময়কর স্রষ্টা

0
18

শিমুল আজাদ
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর (১৮৯৯-১৯৭৬) বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিবেশ-প্রকৃতিতে এক অনন্য নাম, বিস্ময়কর স্রষ্টা। বিদ্রোহী সত্তার চেয়ে তাঁর প্রতিভা ও শ্রমনিষ্ঠা প্রকট হয়ে জাগ্রত হয়েছে সাম্যবাদী দৃষ্টিকোণে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। যে কারণে তিনি বাঙালি সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে নিত্য স্মরণীয়। জীবনের জন্য যেমন বাতাস, পানি, খাদ্য ও আলো অপরিহার্য, তেমনি বাঙালি জাতির জন্য নজরুল। হাফিজ যেমন ইরানের, তেমনি নজরুল বাংলাদেশের। আমাদের এ প্রত্যয় দৃঢ় হয় তখন, যখন আমরা নজরুলের চেতনায়, সৃষ্টিশীলতায় প্রবিষ্ট হই। সেখানে যা যা পাই তা আমাদেরকে উচ্চকিত করে তোলে, জীবন সমৃদ্ধির নানা পথ বাতলে দেয়।


এ পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ইংরেজি, রুশ, তুর্কি, ফরাসি, জাপানি, ফার্সি ভাষায় আলোচনা ও অনূদিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সমসাময়িক রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, কাজী আব্দুল ওদুদ, মুজফফর আহমদ, আব্দুল কাদির, আবুল ফজল, বুদ্ধদেব বসু, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, আজহার উদ্দিন খান প্রমুখ ব্যক্তিত্বের কাছে তিনি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, স্বল্প সময়ের প্রেক্ষিতে তিনি তৎকালীন বাঙালি সমাজে পরিচিত ও নন্দিত হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। এ বিষয়ে সৈয়দ আলী আহসান তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে বলেন, ‘যে কারণে নজরুল সকলের প্রীতিভাজন হয়েছিলেন, তা হলো সাময়িক আদর্শ-বিশ্বাস। বাংলা সাহিত্যে তারও একটি আশ্রয় আছে। আদর্শ-বিলাস হলো প্রথমত, নিপীড়িতদের প্রতি মমত্ববোধ, দ্বিতীয়ত, দেশের স্বাধীনতার জন্য একটি উদগ্র আবেগ। দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য তিনি সর্বদাই করুণা প্রকাশ করেছেন। দুর্বলদের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর অসীম। কিছু তা অশ্রুতে রূপায়িত হয়নিÑ হয়েছে সংঘাতে আবর্তিত। নিপীড়িতদের তিনি বলেছেন বিদ্রোহ করতে, নিশ্চিন্তে বেদনাকে মেনে নিতে নয়।’


ইতিহাসের বরপুত্র, যুগপ্রবর্তক নজরুল যুগের চাহিদা পূরণে সর্বাগ্রে সচেষ্ট হলেন। তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা জাতিসত্তার মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে জাগ্রত। চেতনায় অগ্নিবীণা জ্বালিয়ে নিজের সত্তার চাহিদা ও অবস্থানকে ভূলুণ্ঠিত করে তিনি জাতির সংকট নিরসনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, ততই বেরিয়ে এসেছে নতুন নতুন ক্ষেত্র ও দর্শন। ফলে তাঁর দর্শন, অধ্যাত্ম বা বোধিসত্তার বহুমাত্রিক রূপটিও এখন অনেক পরিষ্কার। কাজী নজরুল ইসলামের নানা কার্যক্রমে আমরা তার বিস্ময়কর প্রমাণ পাই।


সাংবাদিক নজরুল
কাজী নজরুল ইসলাম সৈনিক জীবনে থাকা অবস্থায় সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাহিত্যসাধনার পথ বিকশিত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক থাকা অবস্থায় যুদ্ধশিবির থেকে কলকাতায় প্রবাসী, সওগাত, নূর, বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য সমিতি পত্রিকাসহ নানা পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে ছিলেন। তার মধ্যে ছিল ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’, ‘মুক্তি’, ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের-নেগার’, ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’, ‘ঘুমের ঘোর’ প্রভৃতি গল্প ও কবিতা। যুদ্ধ শেষে করাচি থেকে কবি কলকাতায় চলে আসেন। মোহম্মদ নাসির উদ্দিন ও মুজফফর আহমদের পরামর্শে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি চারটি সাময়িকপত্রের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন: ১. সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ (১৯২০), ২. অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু (১৯২২), ৩. সাপ্তাহিক লাঙল (১৯২৫), ৪. দৈনিক নবযুগ (১৯৪১)। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নজরুল ইসলাম মুজফফর আহমদের সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদনায় নবযুগ পত্রিকা প্রকাশ করেন। নবযুগই এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে কবির মৌলিক পত্রিকা। এরপর ১৯২৬ সালের ১২ আগষ্ট তিনি গণবাণী পত্রিকা প্রকাশ করেন।


আশ্চর্য এই যে, ধূমকেতু পত্রিকায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা দেনÑ ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশ মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদেরকে পাততাড়ী গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে।’


রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নজরুল
ইংরেজি ১৯২০ সাল থেকে খবরের কাগজ প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবি নজরুল আর মুজফফর আহমদ যেমন প্রগতিশীল সংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, তেমনি কৃষক শ্রকিকের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। নবযুগ, ধূমকেতু, লাঙল, গণবাণী প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুলের ভূমিকা ও সক্রিয় কর্মতৎপরতা, কৃষক- শ্রমিকের মুক্তির লক্ষ্যে সোচ্চার ছিল। তখন থেকেই কবি সাম্রাজ্যবাদী শাসকচক্রের ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহ করলেন, শোষণে-নিষ্পেষণে জর্জরিত শ্রমজীবী মানুষের শৃঙ্খল ভাঙার গান শোনালেন। অহিংস মানবতাবাদী সাম্যচিন্তার স্থানে তিনি স্থাপন করলেন সহিংস ‘মুক্তির মন্ত্র’। নিঃসন্দেহে কবি আন্তর্জাতিকতার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। বিশেষ করে রুশ বিপ্লব। একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের জয় কবিকে উৎফুল্ল করেছিল।


তিনি মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে, জাতি ভাবনার মহান বোধে জাগ্রত হয়ে, রাজনৈতিক কার্যক্রমকে যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের একটা রাজনীতির জীবন ছিল। সেটা নষ্ট করতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না।’


কবির রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা এবং কর্মকান্ড ভারতবর্ষে নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। তিনি সারাজীবন নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের প্রতি নৈকট্য অনুভব করেছেন। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
১৯২০ সালের ৯ অক্টোবর কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব সমর্থিত হলে কবি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। কারণ তিনি অনুভব করেন যে, ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করতে না পারলে অসহযোগ আন্দোলন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। ঘূণধরা ক্ষয়িষ্ণু সমাজকে পরিবর্তন করতে যুবসমাজকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনে কবি যৌবনের গান আরম্ভ করেন। তিনি কংগ্রেস থেকে পৃথক হয়ে লেবার স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। বঙ্গীয় কৃষক-শ্রমিক দলের কাজ শুরু করেন। ১৯২৭ সালে উক্ত দলের কমিটির একজন সভ্য মনোনীত হন। পরবর্তী সময়ে প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতায় অসহযোগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ফলে কবিকে জেলে বন্দি হতে হয়।
কবির রাজনৈতিক অবস্থানের একটি ইঙ্গিত এই যে, দেশ ও জাতির সার্বিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজনীতিকে বিবেচনায় রেখে তিনি ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলা থেকে ভারতীয় আইন সভার সদস্য পদের প্রার্থী হয়েছিলেন। যদিও উক্ত নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here