কাবাঘর: মুসলমানদের কেবলা

1
296

কাবা অর্থ উঁচু স্থানে নির্মিত চারকোণ বিশিষ্ট ঘর, পবিত্র কাবাঘর, আল্লাহ্র ঘর, ইত্যাদি। কাবাঘর বলতে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ঘরকে বোঝায়। প্রচলিত অর্থে কাবাঘর বলতে হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ঈসমাঈল যবীহুল্লাহ (আ.) কর্তৃক পুনঃনির্মিত মক্কার কাবাঘরকে বুঝায়। আল্লাহ্ বলেন-‘‘স্মরণ করো, যখন ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমঈল (আ.) কাবাঘরের ভিত নির্মাণ করছিলেন, তখন তাঁরা প্রার্থনা করছিলেন-হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ প্রয়াস কবুল করুন, নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।’’ (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ১২৭)

নামাজের প্রত্যাদেশ পাওয়ার পর থেকে হযরত রাসুল (সা.) জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসা (বাইতুল মুক্বাদ্দাস)-কে সামনে রেখে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কার কাবাঘরকে সামনে রেখে নামাজ পড়ার প্রবল আকাক্সক্ষা মনে মনে পোষণ করতেন। এজন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধুর মনোবাসনা পূর্ণ করে মক্কার কাবাঘরকে সামনে রেখে মাকামে ইব্রাহীমের দিকে নামাজ আদায়ের অনুমতি দিলেন। তখন থেকে মুসলমানগণ এই কাবাঘরকে সামনে রেখে নামাজ আদায় করে থাকেন। আর এ নামাজের কেবলা পরিবর্তনের বিষয়টি মহান আল্লাহ্ তাঁর পাক জবানেই ওহির বাণী আল কুরআনে বলে দিয়েছেন- ‘‘হে রাসুল (সা.)! আপনার বারবার ঊর্ধ্বলোকে তথা আল্লাহ্র দিকে তাকানোকে আমি অবশ্য লক্ষ্য করছি। কাজেই আমি আপনাকে এমন কেব্লার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি, যেটি আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং এখনই আপনি আল মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরান। আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, সেদিকে মুখ করো।’’ (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ১৪৪)
প্রকৃতপক্ষে মক্কার কাবাঘরকে আল মসজিদুল হারাম বা বাইতুল্লাহ বা আল্লাহ্র ঘর বলা হয়। এ ঘরকে কেব্লা করে নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে।

মু’মিনদের জন্য প্রকৃত কাবা কী?


মারেফাতের দৃষ্টিতে কেব্লা বা সাধনার লক্ষ্যস্থল তিনটি। যথা-
১। নামাজের কেবলা বাইতুল্লাহ শরীফ। এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘যখন আল্লাহ্র নবি (সা.) কাবাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কাবাঘরের সকল দিকে ঘুরে ঘুরে দোয়া করেছেন। আর ভেতরে নামাজ আদায় না করেই বেরিয়ে এসেছেন। অতঃপর তিনি বের হলেন এবং কাবা শরীফ সামনে রেখে দুরাকাত নামাজ আদায় করেন এবং বলেন- এটি (নামাজের) কেবলা।’’ (বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭, ই.ফা.বা. কর্তৃক অনূদিত বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩, হাদীস নং ৩৮৯)

এ প্রসঙ্গে ওহির বাণী আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘‘হে রাসুল (সা.)! স্মরণ করুন, যখন আমি কাবাঘরকে মানবজতির জন্য মিলন কেন্দ্র ও নিরাপত্তার স্থান করেছিলাম এবং বলেছিলাম- তোমরা ইব্রাহীম (আ.)-এর দাঁড়ানোর জায়গা তথা মাকামে ইব্রাহীমকে নামাজের জায়গারূপে গ্রহণ করো। আর আমি ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-কে আদেশ করলাম, তোমরা উভয়ে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী এবং রুকু সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’’ (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ১২৫)

২। মোরাকাবার কেব্লা হচ্ছে আপন ক্বালব। কারণ আল্লাহ্র দিদার বা দর্শন আপন ক্বালবের মাধ্যমে লাভ হয়ে থাকে। এজন্য ক্বালবকে দিল কাবা বলে। মহিমান্তিত আল্লাহ্ বলেন- ‘‘জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ্ মানুষ ও তাঁর ক্বালবের মধ্যবর্তীতে বিরাজমান থাকেন।’’ (সূরা আল আনফাল ৮ : আয়াত ২৪)

অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে- ‘‘আমি তোমাদের ক্বালবের (সপ্তম স্তর) নাফসির মোকামে বিরাজ করি, তোমরা কি আমাকে দেখো না?’’ (সূরা আয যারিয়াত ৫১ : আয়াত ২১)

৩। সাধনায় পূর্ণতা লাভ করে আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভের কেব্লা আপন মোর্শেদ। অর্থাৎ আপন মোর্শেদের চেহারা মোবারক স্মরণের মাধ্যমে তাঁর দিল থেকে সাধকের ক্বালবে ফায়েজ হাসিল হয়। আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ বলেন- ‘‘আমার জমিন আমাকে ধারণ করতে পারে না, আমার আসমানও আমাকে ধারণ করতে পারে না, কেবল আমার মু’মিন বান্দার ক্বালব আমাকে ধারণ করে থাকে।’’ (তাফসীরে মাজহারী ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬০)

আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘মু’মিন ব্যক্তির দিল আল্লাহ্র আরশ।’’ (তাফসীরে ইবনুল আরাবী ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৮৯)

এমনিভাবে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) আরো এরশাদ করেন- ‘‘মহান আল্লাহ্ বলেছেন- নিশ্চয় আমার বান্দাদের মধ্যে অলী-আল্লাহ্ হলেন তাঁরা, আমাকে স্মরণ করলে যাঁদের কথা স্মরণ হয়। তেমনি যাঁদেরকে স্মরণ করলে, আমার কথা স্মরণ করা হয়।’’ (তাফসীরে মাজহারী ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৮)
এভাবেই অলী-আল্লাহ্ তথা মোর্শেদ হচ্ছেন সাধকের জন্য কেব্লাস্বরূপ। যে কারণে তাঁকে মোর্শেদ কেব্লা বলা হয়। সুতরাং কাবাঘরকে নামাজের কেবলারূপে গ্রহণ করে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলমানকে আল্লাহ্ প্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আর সে লক্ষে পৌঁছার জন্য মোর্শেদ কেব্লার অনুসরণ করতে হয়।

মুক্তি কোন পথে? গ্রন্থ থেকে সংকলিত

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here