কালজয়ী ইকবাল

0
229

প্রফেসর ড. তারিক সিরাজী
কবি জালাল উদ্দীন রুমী ও হালীর মন্ত্রশিষ্য আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮ খ্রি.) হলেন একজন উঁচুমানের দার্শনিক ও সব্যসাচী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। বিশ^বিশ্রুত এ মনীষী একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজ সচেতন আইনজ্ঞ হিসাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তবে তাঁর কাব্যেই বহুলাংশে তাঁর দর্শনের নিগূঢ় তত্ত্ব ও মতাদর্শ অনুরণিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ও বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনায়। তাঁর কাব্যের মৌলিক বিষয় ধর্মের গূঢ় তত্ত্বের বিকাশ ও মানবীয় আত্মার জাগৃতি- যা তিনি বহুলাংশে ফারসি ভাষায়ই প্রকাশ করেছিলেন। আর এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে সুখী, সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে গড়ে তোলা, মানবীয় গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে জাগরূক করা ও এর সেবায় আত্মনিয়োগ করা।

ইকবালের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ। তাঁর বংশের ঊর্ধতন পুরুষ ‘বাবা লোলহাজ’ পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে জানা যায় এবং পরবর্তীকালে তিনি পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। ইকবাল জন্মগ্রহণ করেন পাকিস্তানের শিয়ালকোটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা নূর মোহাম্মদ ছিলেন একজন বিদ্বান ও সূফি সাধক।

শৈশবে পিতা তাঁকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বহুভাষাবিদ ও পন্ডিত সাইয়্যেদ মীর হাসানের নিকট পড়ালেখা শেখার জন্য প্রেরণ করেন। ইকবাল তাঁর সংস্পর্শে থেকে শৈশবেই কুরআন মজীদ শিক্ষাছাড়াও আরবি, ফারসি ও ইংরেজিতে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষত কুরআনে করীমের শিক্ষা, সাইয়্যেদ মীর হাসানের আদর্শ-ব্যক্তিত্ব ও পিতা-মাতার জীবনাদর্শ তথা সুফিবাদ বা আধ্যাত্মদর্শন তাঁর মধ্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে- যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্য বা কাব্যাদর্শের মূল সুর হিসেবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে।

আল্লামা ইকবাল তাঁর যুগের নিস্ক্রিয়, নির্লিপ্ত ও ঘুমন্তপ্রায় মানুষকে তাঁর দর্শন, কাব্য ও অর্গলভাঙ্গা গানের মাধ্যমে জাগরিত ও উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এ বোধনমন্ত্র পেয়েই তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জনগণ পথের দিশা পায়। শুধু তা-ই নয়, তিনি খুদীদর্শনকে এতটা গুরুত্ব দান করেছেন যে, তাঁর মতে আল্লাহ্কে অথবা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য মানুষকে অনুরোধ-উপরোধ ও দাবী করতে হবে না, হবে না তাকে ফরিয়াদ করতে; বরং তার ব্যক্তিত্ব ও কর্মই তাকে মনজিলে মকসুদে পৌঁছতে সহায়তা করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
তোমার ব্যক্তিত্ব এতখানি উর্ধ্বে তুলে ধর যে,
তোমার প্রতিটি ভাগ্যলিপি নির্ধারণের পূর্বে
আল্লাহ্ তায়ালা নিজেই তাঁর বান্দার কাছে
জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কী চাও?

ইকবাল এ খুদীদর্শনের মোড়কে ব্যক্তি জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, কতগুলো উপাদানের ভিত্তিতে মানুষের খুদী দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সে উপাদানগুলো হচ্ছে, ভালোবাসা, দারিদ্র্য, সাহসিকতা, সহনশীলতা, হালাল উপার্জন ও সৃজনশীলতা। এ উপাদানগুলো তিনি তাঁর ফারসি ভাষায় রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রস্থ আসরারে খুদী-তে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন।

মুসলিম জাতির ঐক্যের আহ্বানে ইকবাল একান্তই সোচ্চার ছিলেন। তিনি জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক্ই প্লাটফর্মে একত্র হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করতেন।
এ জাতির লাভ আর লোকসান একই
সকলের নবি এক, ইমান এবং ধর্মও এক ও অভিন্ন।
আল্লাহ্, পবিত্র হারাম আর কুরআন সবই এক
কতই না উত্তম হতো যদি মুসলমানরাও হতো এক।
কোথাও তাদের হাজারো ফিরকা আর কোথাও তাদের হাজারো সত্তা
আমাদের এ যুগে অগ্রগতির বক্তব্য কী এটিই!
ইকবাল আরো বলেছেন:
ফেরাউনের মোকাবিলায় মূসা আর ইয়াজিদের মোকাবিলায় শাব্বির
এ উভয় শক্তিই জীবন থেকে প্রতিভাত হয়েছে।
শাব্বিরের শক্তি থেকেই সত্য জীবন্ত হয়েছে,
বাদশাহির দুঃখ-যাতনা থেকে বাতিলের আগমন।
কুরআনের রহস্য আমরা হোসাইন থেকেই শিখেছি
আর তাঁর অগ্নি থেকেই আমরা অগ্নিস্ফুলিঙ্গগুলো ধারণ করেছি।
ইকবালের মতে একটি আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ইনসানে কামেল তথা আদর্শ মানুষের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, ব্যক্তি মানুষের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি সুন্দর ও সুশীল সমাজ। আর ব্যক্তিকে অবশ্যই সমাজ জীবনের অধীন থাকতে হয়। মৃত্যুর ৬৯ বছর পর আজও মুসলিম উম্মাহ ইকবালকে স্মরণ করে গভীরভাবে। তিনি কালের সীমা ছাড়িয়ে চির অম্লান হয়ে আছেন সেসব মুসলমানের হৃদয়ে যারা পিছিয়ে পড়া জাতিকে প্রগতির দিকে নিয়ে যেতে সচেষ্ট। তাঁর বাণী যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মার চেতনাকে শাণিত করবে আর উন্মেষ ঘটাবে নতুন দিগন্তের। তাইতো ইরানের খ্যাতিমান কবি মালেকুশ শোয়ারা বাহার ইকবাল সম্পর্কে একটি সুন্দর মন্তব্য করেছেন এমনিভাবে:
বর্তমান যুগ তো কেবল ইকবালেরই তরে
তিনি তো একজন, কিন্তু অতিক্রম করে গেছেন
লক্ষজনকে (এ ধরণীর পরে)।

কবিদের বাহিনী যখন হয়ে গেলো বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত অধিক তখন এ মহান যোদ্ধাই সম্পন্ন করলেন কর্ম শত অশ^ারোহীর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here