কিটোজেনিক ডায়েট: শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর শতভাগ কার্যকর একটি পদ্ধতি!

1
541

শহুরে জীবন ব্যবস্থায় দিন দিন আমাদের কায়িক শ্রম কমে যাচ্ছে, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটছে। আমরা সবাই কম-বেশি মোটা হয়ে যাচ্ছি। শরীরের এই অতিরিক্ত মেদ ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপসহ অনেক রোগের আতুর ঘর। তাই এই অতিরিক্ত ওজন বা ওবেসিটি (Obesity) থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই।

মোটা হবার মূল কারণ?
আমরা অনেকেই মনে করি যে অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার খেয়ে আমরা মোটা হয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। আমাদের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে আমরা আসলে শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খাচ্ছি। আর এই শর্করা জাতীয় খাবার খেয়েই আমরা মূলত মোটা হচ্ছি। আমরা যখন শর্করা জাতীয় খাবার খাই, তখন তা বিপাক হয়ে আমাদের রক্তে গ্লুকোজ হিসেবে প্রবেশ করে। এই গ্লুকোজের কিছু অংশ শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। কিছু অংশ গ্লাইকোজেন হিসেবে লিভার এবং মাংশপেশীতে সঞ্চিত থাকে, যা পরবর্তীতে প্রয়োজন সাপেক্ষে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে শক্তি জোগায়। আর বাকি বেশিরভাগ অংশ শরীরে চর্বি আকারে জমা হয়। সুতরাং, আমরা যতটুকু পরিশ্রম করি, তার চেয়ে যদি বেশি পরিমাণে শর্করা জাতীয় খাবার খাই, তাহলে শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত এই শর্করা আমাদের শরীরে চর্বি আকারে জমে যাবে।

শর্করা জাতীয় খাবার কী কী?
সহজভাবে যদি বলি তাহলে ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি থেকে উৎপন্ন সকল খাবারই শর্করা। যেমন: ভাত, মুড়ি, চিড়া, রুটি, বিস্কুট, পপকর্ণ ইত্যাদি। এর পাশাপাশি সবজী হিসেবে আলুও শর্করার একটি ভালো উৎস।

কিটোজেনিক ডায়েট কী?
কিটোজেনিক ডায়েট হলো এক প্রকার বিশেষায়িত ডায়েট বা পথ্য ব্যবস্থা, যেখানে প্রচুর পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার থাকে (প্রায় ৭০-৮০%), কিছু পরিমাণে আমিষ থাকে (প্রায় ১৫-২০%) এবং সামান্য পরিমাণ শর্করা থাকে (প্রায় ৫-১০%)। এই খাদ্য ব্যবস্থা শর্করার পরিবর্তে চর্বি গলিয়ে দেহে শক্তি সরবরাহ করে। সাধারণ অবস্থায়, খাবারে উপস্থিত শর্করা ভেঙে গ্লুকোজ হয়ে তা দেহে শক্তির জোগান দেয়। কিন্তু খাবারে যদি যথেষ্ট পরিমাণে শর্করা না থাকে, তাহলে আমাদের শরীর চর্বিকে গলিয়ে কিটোন বডি তৈরি করে। এই কিটোন বডি শর্করার পরিবর্তে তখন শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

অধিক পরিমাণে শর্করা জাতীয় খাবার আমাদের ওজন কমানোর প্রধান অন্তরায়
শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খেলে তার বিপাক কাজে সহযোগিতা করার জন্য শরীরে বেশি পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। শর্করা বিপাকের জন্য এই ইনসুলিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইনসুলিনের অন্যতম একটি কাজ হলো আমাদের শরীরে জমে থাকা চর্বিকে সে গলতে দেয় না। সুতরাং, শর্করা যত বেশি খাবেন, শরীরে ইনসুলিন এর মাত্রা তত বৃদ্ধি পাবে। তাই, শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া না কমিয়ে যদি অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তাতে শরীরের জমে থাকা এই চর্বি কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

ওজন কমানোর মূলনীতি:

  • খাবার: শর্করা জাতীয় খাবার একেবারেই কম খেতে হবে।
  • ব্যায়াম: নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। খালি পেটে ব্যায়াম করলে তা ওজন কমাতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও ন্যূনতম আধাঘণ্টা হিসেবে সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ব্যায়ামের জন্য সময় বের করুন।
  • ঘুম: রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে এবং রাত জাগার অভ্যাস পরিহার করুন।

কিটোজেনিক ডায়েটের গুরুত্ব কী?
খাবার হচ্ছে আমাদের দেহের জন্য জ্বালানীর মতো। ইঞ্জিন চলার জন্য যেমন জ্বালানীর প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের শরীরের শক্তি উৎপাদনের জন্য আমাদের খেতে হয়। আমাদের শরীরে শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে: (১) গ্লুকোজ, যা শর্করা থেকে আসে এবং (২) কিটোন বডি, যা চর্বি থেকে আসে। আপনি যদি হঠাৎ করে শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া কমিয়ে দেন তাহলে আপনি কিছুটা দুর্বল বোধ করতে পারেন। কারণ, আপনি এতোকাল এই শর্করাকেই জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আপনার শরীর তার সঞ্চিত চর্বি গলিয়ে তা থেকে শক্তি উৎপাদন করে চলতে অভ্যস্ত নয়। ফলে দুর্বলতার জন্য আপনার দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটবে এবং আপনি অচিরেই ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

সেজন্য আপনাকে যা করতে হবে তা হলো সাময়িকভাবে শর্করা জাতীয় খাবার কমানোর পাশাপাশি চর্বি জাতীয় খাবার কিছুটা বাড়াতে হবে, যাকে বলা হচ্ছে কিটোজেনিক ডায়েট। তবে তা হতে হবে শরীরের জন্য উপকারী চর্বি বা হেলদি ফ্যাট (Healthy fat)। আপনার শরীরের শক্তির যে চাহিদা তা তো পূরণ করতেই হবে। ইঞ্জিনে জালানি কম দিলে তা তো ঠিক মতো চলবে না। তেমনি আপনার শরীরকেও তার জ্বালানী হিসেবে প্রয়োজনীয় খাদ্যটুকু দিতে হবে। যেহেতু শর্করা খাওয়া কমিয়ে ফেলছেন, সুতরাং, তাকে কিছুটা সময় দিতে হবে যেন শর্করার পরিবর্তে চর্বি থেকে শক্তি নিয়ে সে চলতে অভ্যস্ত হয়। তাই এই মধ্যবর্তী সময়ে হেলদি ফ্যাট খেতে হবে। যেন আপনার শরীর এই ফ্যাট বা চর্বি থেকে উৎপন্ন কিটোন বডিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। শরীর যখন শর্করার পরিবর্তে ফ্যাট থেকে শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম হবে তখন শরীর নিজেই নিজের শরীরের জমে থাকা চর্বি গলিয়ে তা থেকে শক্তি উৎপাদন করে চলতে পারবে। তখন আর শরীরের শক্তির জন্য অতিরিক্ত কিছু খেতে হবে না। একেই বলে ফ্যাট অ্যাডাপটেশন (Fat adaptation)। ফ্যাট অ্যাডাপটেশন হয়ে গেলে তারপর দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস করতে হবে।

ফ্যাট অ্যাডাপটেশন হয়েছে কিনা কিভাবে বুঝবেন?
ফ্যাট অ্যাডাপটেশন মানে আপনার শরীর তার জমে থাকা চর্বি গলিয়ে চলতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রতিদিনই আপনার কিছু না কিছু ওজন কমবে। যেহেতু আপনার শরীরের সঞ্চিত চর্বি গলিয়েই আপনি প্রয়োজনীয় শক্তি পাচ্ছেন। তাই আপনার ক্ষুধার অনুভুতিও তখন কমে যাবে। ফলে তখন বিনা কষ্টে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে পারবেন। এতে কোনো সমস্যাই হবে না।

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস কীভাবে করবেন?
শুরুটা এভাবে করতে পারেন যে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা থেকে ৮ টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ফেলবেন। এরপর একেবারে পরের দিন সকাল ৮টা থেকে ৯টার দিকে নাস্তা করবেন। এর মাঝখানে পানি ছাড়া আর কিছুই খাবেন না। তাহলে এভাবেই ১২-১৩ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা হবে। এই সময়ে আপনার শরীর আপনার দেহের সঞ্চিত চর্বি গলিয়ে তা থেকে শক্তি উৎপাদন করে চলবে। তারপর ধীরে ধীরে না খেয়ে থাকার পরিমাণ ১২-১৩ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১৫-১৬ ঘণ্টা করতে হবে।

ওজন কমানোর এই সময়ে ভাতের পরিবর্তে রুটি খাওয়া যাবে কী?
অনেকের ধারণা যে ভাতের পরিবর্তে রুটি খেলে ওজন বাড়বে না। মনে রাখবেন, ভাত এবং রুটি উভয়ই শর্করা। সুতরাং, ভাতের বিকল্প হিসেবে রুটি, মুড়ি যাই খান না কেন, তাতে খুব একটা লাভ হবে না।

ওজন কমানোর এই সময়ে ফলমূল, দুধ এসব খাওয়া যাবে কী?
ফলমূল, দুধ এসবেও বেশ ভালো পরিমাণে শর্করা আছে। আপনি যদি ওজন কমাতে চান তাহলে আপাতত এসব খাওয়া যাবে না। তবে ওজন কমানোর টার্গেটে পৌঁছানোর পর মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণে খাওয়া যাবে।

যারা ওজন কমাতে চাচ্ছেন তাদের ডায়েট চার্ট কেমন হবে?
ডায়েট চার্ট সবার এক রকম হবেনা। আপনার বর্তমান ওজন, দৈনন্দিন পরিশ্রমের পরিমাণ, ইত্যাদি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আপনার ডায়েট চার্ট আপনার নিজেকেই ঠিক করতে হবে। আপনি যদি পরিশ্রম কম করেন, ব্যায়াম কম করেন তাহলে আপনার অনেক কম খাবার খেতে হবে। তবে যাই খান না কেন, তাতে যেন শর্করা একেবারেই কম থাকে এবং হেলদি ফ্যাট বেশি থাকে। যেমন: সকালে নাস্তায় ডিম খেতে পারেন। একটা বা দুইটা। ডিম পোচ করার ক্ষেত্রে সয়াবিন তেল ব্যবহার না করে বরং ঘি ব্যবহার করুন। ডিমের কুসুম এবং ঘি হেলদি ফ্যাটের উৎস। ডিমের সাথে কিছু শাক-সবজী খেতে পারেন। শাক-সব্জি রান্না করতে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন। কারণ এটা হেলদি ফ্যাট এর উৎস। তবে রুটি, পরোটা এসব খাবেন না। দুপুরের খাবারে শাক-সব্জি বেশি খাবেন। সাথে মাছ, মাংস বা ডিম অল্প করে খেতে পারেন। শাক-সব্জি যা খাবেন তা থেকেই কিছুটা শর্করা পেয়ে যাবেন। তবে এরকম ভাতবিহিন খাবারে অভ্যস্ত না হলে প্রথমদিকে সামান্য ভাত খেতে পারেন। বিকালে নাস্তা করতে চাইলে মাখন দিয়ে বাদাম খেতে পারেন। বাদাম এবং মাখন উভয়ই হেলদি ফ্যাটের ভালো উৎস। রাতের খাবারের মেনু দুপুরের মতোই রাখতে পারেন। তবে রাতের খাবার রাত ৭-৮টার মধ্যেই সেরে ফেলবেন। যখনই খাবার খাবেন, একটা বিষয়ে সচেতন থাকবেন যে কখনও পেট ভরে খাবেন না। যখনই মনে হবে আরেকটু খেলে পেট ভরবে সে অবস্থায় খাবার শেষ করতে হবে।

হেলদি ফ্যাট এর উৎস কী কী?
মাছের ডিম, মাছের তেল, ডিমের কুসুম। খাটি ঘি, মাখন, বাদাম, এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট অয়েল, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ইত্যাদি। ফ্যাট বা চর্বি মানেই যে তা ক্ষতিকর, তা নয়। হেলদি ফ্যাট শরীরের জন্য ভালো। এটা আমাদের ইগজ BMR (Basal Metabolic Rate)-কে বাড়িয়ে চর্বি গলতে সহায়তা করে।

কোন তেল ক্ষতিকারক?
যে সকল তেল অত্যধিক উচ্চ তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে তা ব্যবহার উপযোগী করা হয়, তা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। যেমন: সয়াবিন তেল, সান ফ্লাওয়ার তেল, রাইস ব্র্যান তেল ইত্যাদি।

কোন তেল স্বাস্থ্যকর?
এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট অয়েল, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, ঘানি ভাঙ্গা খাঁটি সরিষার তেল।

ওজন কমানোর অনেক রকম পদ্ধতি আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অনেকে যেসব ডায়েট চার্ট ব্যবহার করেন তাতে ক্যালোরির পরিমাণ মূলত কমানো হয়। শর্করার পরিমাণ খুব একটা কমানো হয় না। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় অনেকেই অল্পদিনেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাই কিটোজেনিক ডায়েটের কার্যকর এই পদ্ধতিটি একবার ব্যবহার করে দেখতে পারেন। তবে ডায়াবেটিক, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ অন্যান্য সমস্যায় যারা ভুগছেন তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করবেন না।

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা]

1 COMMENT

  1. ডায়েট সম্পর্কে এতোদিন অনেককিছু দেখেছি কিন্তু এতো সুন্দর গোছালো কোন পরামর্শ পাইনি । মনযোগ সহকারে পুরু আর্টিকেলটি পড়লাম । কাল থেকেই এই ডায়েট শুরু করবো ইনশায়াল্লাহ। সম্পুর্ন পালন করতে পারবো না তবে চেষ্টা চালিয়ে যাবো ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here