কৃষি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে করোনার প্রভাব

1
245

মোহাম্মদ সায়েদুল হক

৬ মার্চ ২০২০, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হলে আমাদের কৃষিখাতে পাঁচ হাজার তিনশত পঞ্চান্ন কোটি টাকার ক্ষতি হবে। মার্চ মাস শেষে আমরা বুঝতে পারছি করোনার নির্দয় তান্ডবে আমরা পড়ে গেছি। আগামী কয়েক মাসে কি ভয়াবহতা আসতে পারে তা এখনও বলা যাচ্ছেনা। কেননা এ পর্যন্ত পৃথিবীর ২০২ টি দেশ নভেল করোনা ভাইরাসের আক্রমণে দিশেহারা। দুনিয়ার সকল বিজ্ঞানীর এ যাবৎকালের সকল উদ্ভাবনকে নভেল করোনা প্রায় পাত্তাই দিচ্ছে না। পৃথিবীজুড়ে লাশের সংখ্যা শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। নভেল করোনার তান্ডবে ২৫ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত খোদ যুক্তরাষ্ট্রে তেত্রিশ লাখ লোক বেকার হয়ে পড়েছে। ১৯৬৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে এতো মানুষ কর্মহীন হওয়ার রেকর্ড নেই। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ^জুড়ে ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে নিয়োজিত সাড়ে সাত কোটি কর্মী চাকরি হারাতে পারে। বিশ^ব্যাংক, আইএমএফ, ইউরোপিয়ান কমিশনসহ বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর ধারণা চলতি বছর পৃথিবীর মোট জিডিপি অর্ধেকে নেমে আসবে। ইউরো জোন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার শূন্যে নেমে আসতে পারে। আমাদের তৈরী পোশাক শিল্প এবং রেমিট্যান্সে নভেল করোনার প্রভাব পড়লেও এখন পর্যন্ত কৃষি খাতে যেমন ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ, দুগ্ধ শিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম, গরু মোটাতাজাকরণে প্রভাব পড়েনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবার পর কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টরে স্বল্প মেয়াদি, মধ্যম মেয়াদি এবং দীর্ঘ মেয়াদি যেসব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন তার সুফল আমরা এখন ভোগ করছি। উদ্বৃত্ত চাউল রপ্তানি করে আমরা চাউল রপ্তানিকারক দেশের সদস্য হয়েছি। এখন ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চতুর্থ অবস্থানে, সবজি উৎপাদন বিশে^ তৃতীয়, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উৎপাদনে সপ্তম অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে বিশে^ চর্তুথ অবস্থানে পৌঁছেছে। দশ বছর আগে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিলো ৫৩.৬৯ কোটি বর্তমানে ডিম উৎপাদন হচ্ছে ১৫৫.২০ কোটি। দশ বছরে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। দশ বছর আগে দেশে দুধের উৎপাদন ছিলো মাত্র ২২.৮০ লাখ মেট্রি টন বর্তমানে দুধ উৎপাদন হচ্ছে ৯৪.০৬ লাখ মেট্টিক টন। অর্থাৎ দশ বছরে দুধের উৎপাদন বেড়েছে চারগুণের বেশি। দশ বছর আগে দেশে মাংসের উৎপাদন ছিল মাত্র ১০.৪০ লাখ মেট্রি টন বর্তমানে মাংস উৎপাদন হচ্ছে ৭২.৬০ লাখ মেট্রি টন। অর্থাৎ দশ বছরে মাংসের উৎপাদন বেড়েছে সাতগুণ। কোরবানির পশু এখন আর আমদানি করতে হয়না। আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ভোক্তার অধিকাংশই হচ্ছে নিম্ন আয়, নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষ আর রেমিট্যান্স যোদ্ধার পরিবার। করোনার থাবা যদি দুই/তিন মাস স্থায়ী হয় তাহলে আমাদের নিম্ন আয়, নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষের সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যাবে। দেশে আমাদের মোট শ্রমশক্তি ছয় কোটি আট লাখ। এর মধ্যে পাঁচ কোটি সতের লাখ চার হাজার অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অনানুষ্ঠানিক খাত মানে যেখানে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই যেমন পরিবহন শ্রমিক, রিকশা চালক, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক যারা দিন আনে দিন খায়। মাত্র নব্বই লাখ শ্রমশক্তি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস করোনার কারণে অন্তত নয় লাখ লোক আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মহীন হবে। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় এমন পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বা আয় আরও কমে যাবে। বিশে^র যে দশটি দেশ-সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, ওমান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, বাহরাইন থেকে আমাদের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে তার সব কয়টি এখন করোনার থাবায় বিধ্বস্ত; লন্ডভন্ড। আঠারো বছরের মধ্যে জ¦ালানি তেলের দাম এখন সবচেয়ে কম। তাই তেল নির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি কবে ঠিক হবে তা বলা যাচ্ছে না। ১ কোটি ২৫ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধার পাঠানো রেমিট্যান্স কমতে কমতে কোথায় এসে ঠেকবে তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আমাদের তৈরী পোশাকের ৬২ ভাগ রপ্তানি হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৭টি দেশে আর ১৮ ভাগ রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুকূপে। ২৫ মার্চ ২০২০ সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশের তৈরী পোশাকশিল্পের ৯৩৬টি কারখানার মোট ২১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার অর্ডার স্থগিত করা হয়েছে। আমাদের পোশাক শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশই আমদানি করা হয় চীন থেকে; পোশাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক্সেসরিজ ও কেমিক্যাল তো আছেই। করোনার উৎপত্তিস্থল চীন এখনও করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা চলতি বছরের আগস্টের আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অবস্থা স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা কম। তাই যদি হয় তাহলে আমাদের তৈরী পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ৫০ লাখ শ্রমিকের অর্ধেক কার্যত বেকার হয়ে যাবে। সহজ কথায় বললে আমাদের কৃষি পণ্যের ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। উপার্জন কমে গেলে বা ক্রয় ক্ষমতা কমে গেলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং পোল্ট্রি শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমাদের চাষী বা খামারীরা যেহেতু এসব হিসাব করে চাষবাস বা খামার পরিচালনা করেন না তাই তাঁদের জন্য বিরাট ঝুঁিক সৃষ্টি হবে। কখনো দেখা যাবে খামারী উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেনা। আবার কখনও দেখা যাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে ভোক্তাকে ঠকাচ্ছে, উৎপাদনকারীকেও ঠকাচ্ছে।

প্রসঙ্গত বলতে হয় ২০০৬ সালে দেশে বার্ড ফ্লু ধরা পরার পর ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮ সালে প্রায় লক্ষাধিক পোল্ট্রি খামারী নিঃস্ব হয়ে যায়; এদের অধিকাংশই ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে। প্রায় ৬০-৭০ হাজার খামারী স্থায়ীভাবে অন্য পেশায় চলে যায়। বাংলাদেশে নভেল করোনার তান্ডব এখন পর্যন্ত চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো না হলেও আমাদের আর্থিক ক্ষতি কিন্তু ঐসব দেশের সাথে এক সূতোয় গাঁথা। প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারী, ডেয়রি খামারী, গরু মোটাতাজাকরণ খামারী, মৎস্য চাষীদের হিসাব থাকে অন্তত ঈদ মৌসুমে লাভবান হওয়া। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে দুটি ঈদকেই নভেল করোনা নিঃশেষ করে যাবে। আমাদের কৃষি উপকরণ যেমন সার, কীটনাশক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়; কিছু কিছু উচ্চফলনশীল জাতের ফসলের বীজও আমদানি করতে হয়। পোল্ট্রি শিল্পের খাদ্য বা খাদ্যের কাঁচামাল, ঔষধের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। কৃষি পণ্যগুলো যেহেতু কারখানায় উৎপাদিত পণ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা যেমন দুধ, ডিম, সবজি পচনশীল। তাই এসব নিয়ে আমাদেরকে এখনই স্বল্প মেয়াদি, মধ্যম মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ফসলের ক্ষেত্রে আমাদের মৌসুমভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করতে হবে ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে মাসভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করতে হবে এবং উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টরে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার বিগত দশ বছরে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টর যেভাবে ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ডাটাবেজ’র আওতায় এনেছে তাতে এসব করতে বেগ পেতে হবে বলে মনে করি না। আমরা বার্ড ফ্লু জয় করেছি, ২০১০ সালে এনথ্রাক্স মোকাবেলা করেছি, হাওড়ের বন্যা, উপকূলীয় ঝড় জলোচ্ছ্বাস, আইলা, সিডর মোকাবেলা করেছি, ইনশাআল্লাহ করোনাও আমাদের কাছে পরাজিত হবে।

লেখক : কৃষিবিদ

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here