কেমন হবে বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি

0
109


সালাহ উদ্দিন: ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। যদিও বলা হয়, আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক নীতি কখনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভেদে সম্পৃক্ততার মাত্রার নানা পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া ট্রাম্পের সময়কালে স্বাভাবিক রীতিনীতি বিরুদ্ধ ও অপ্রচলিত নানাপদ্ধতি মার্কিন কূটনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আসুন দেখা যাক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বাইডেনের নীতিগত অবস্থান কি এবং বাইডেনের অধীনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন অবস্থানের কি কি পরিবর্তন আসতে পারে।
ইরান বিষয়ক
ওবামা প্রশাসনের সময়কালে ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যান্য বিশ্বশক্তির সাথে নিয়ে বহুপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার আওতায় পারমাণবিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে ইরান তার উপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ছাড় পায়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের অভিযোগ ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এই চুক্তি যথেষ্ট নয়, এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ন্ত্রণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই, এই চুক্তি শেষের যে সময়সীমা রয়েছে, সেটি পর্যাপ্ত নয়, আর এই চুক্তিতে আঞ্চলিক বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে ইরান যে বিভিন্ন সহায়তা করে, সেগুলো বিবেচনায় রাখা হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে ইউরোপিয় মিত্র ও অন্যান্য স্বাক্ষরকারী পক্ষের বিরোধিতা সত্ত্বেও বেরিয়ে যায় এবং ইরানকে নতুন আরো কঠোর চুক্তিতে আবদ্ধ করতে ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতি গ্রহণ করে। ইরানের উপর একের পর এক নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইরানের তেল রপ্তানি-সহ প্রায় সকল অর্থনৈতিক খাতকে কালো তালিকাভুক্ত করে। জবাবে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইরান চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পালন থেকে বিরত থাকতে শুরু করে এবং পুনরায় ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু করে।
নির্বাচনী প্রচারণাকালে বাইডেন বারবার বলেছেন, তিনি ইরানের সাথে পুনরায় চুক্তিতে ফেরত যেতে চান। তবে শর্ত হল, যদি ইরান চুক্তির শর্ত সঠিকভাবে পালন করে তবেই কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফেরত যাবে এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চিন্তা করবে। চুক্তিতে ফেরত যেতে বাইডেন অবশ্যই তার ইউরোপিয় মিত্রদের সমর্থন পাবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব-আমিরাত ব্লক ও ইসরায়েলের বিরোধিতার মুখে পড়বেন, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া সমর্থন করেছিল। অন্যদিকে ইরান এই পদক্ষেপকে কতোটা স্বাভাবিকভাবে দেখবে, সেটা দেখার বিষয়। একটা বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে এককভাবে বেরিয়ে যাওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকে আবার বিশ্বাস করা ইরানের জন্য কষ্টকর হবে। ইরান ইতোমধ্যেই চুক্তিতে ফেরত যেতে নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। প্রবল অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান চাইবে এটা নিশ্চিত। তবে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচী ও মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের ভুমিকা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে ইরান কতটা আগ্রহী হবে, সেটা দেখার বিষয়। নতুন কোনো চুক্তিতে ইরান আগ্রহ নাও দেখাতে পারে।
ইরাক-আফগানিস্তান ও সিরিয়া
ট্রাম্পের সময়কালে ইরাক ও আফগানিস্তান ও সিরিয়া থেকে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা কমানো হয়েছে। বাইডেনও এই একই নীতি নিতে পারেন। বাইডেন যদিও ইরাক ও আফগান হামলাকে সমর্থন করেছেন, বাইডেনের সময়কালে নতুন কোনো সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জড়ানোর সম্ভাবনা কম। বরং এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও বেশি সংখ্যায় সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে মার্কিন ভাষায় ‘সন্ত্রাসবাদ ও আল কায়েদা’ মোকাবিলায় কিছু মার্কিন সৈন্য সেখানে মোতায়েন থাকবে। অবশ্য মিত্রদের সাথে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে শূন্যতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া-চীন-তুরস্ক সুবিধা নিতে না পারে।
সৌদি আরব
সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রে মোহাম্মদ বিন সালমান আসার পর থেকেই নানারকম পদক্ষেপ ও কেলেংকারীতে জড়িয়ে রাজতন্ত্রটির কূটনৈতিক অবস্থানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভিক্ষ, তুরস্কের সৌদি দুতাবাসে জামাল খাসোগীকে হত্যা ইত্যাদি মার্কিন, ইউরোপিয় মুলুক-সহ সারা দুনিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব বিষয়ে কিছু বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি।
বাইডেন বিভিন্ন সময়ে জামাল খাসোগী হত্যা ও ইয়েমেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে সৌদি আরবকে নতুন বাইডেন প্রশাসন বিশেষ কোনো শাস্তির আওতায় আনবে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তারা যেমন বিশেষ সুবিধা পেত, সেটা পাবে না। মানবাধিকার বিষয়ে ও খাশোগি ইস্যুতে নতুন প্রশাসন শক্ত অবস্থানে যাবে, যাতে ভবিষ্যতে মোহাম্মদ বিন সালমান সাবধান হয়ে যান। তাছাড়া ইমেয়েন যুদ্ধ সমাপ্ত করার বিষয়ে সৌদির উপর চাপ বাড়তে পারে। নতুন প্রশাসন সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা মানবাধিকার বিষয় জুড়ে দিতে পারে। বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে সৌদি আরব ব্লকের চেয়ে ইরান ইস্যু বেশি গুরুত্ব পেতে পারে, এটা নিশ্চিত।
ইসরায়েল ফিলিস্তিন
ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে ক্ষতিসাধন করেছেন ইসরায়েল ফিলিস্তিন ইস্যুতে। দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন অবস্থান থেকে বেরিয়ে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থাপন করেছেন, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের দাবিকে সমর্থন দিয়েছেন, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিকে ইসরায়েলে অন্তর্ভুক্ত করার গ্রিন সিগনাল দিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য ও সাহায্য সংস্থার জন্য আর্থিক সাহায্য বন্ধ করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি লিবারেশন অর্গানাইজেশন পিএলও-এর অফিস বন্ধ করে দিয়েছেন। ইসরায়েলের সাথে আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সুদানের সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করেছে। যেসব পদক্ষেপ ফিলস্তিনিদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে।
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসেবে বাইডেন এসব পদক্ষেপ পরিবর্তন করতে চাইবেন না। বাইডেন ইসরায়েলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ডেমোক্রেট দলের বাম অংশের চাপে তার প্রশাসন সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের মতো ইসরায়েলপন্থী কোন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকবে। বাইডেন প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে যেমন, ফিলিস্তিনিদের জন্য জেরুজালেমে আলাদা কন্সুলেট চালু করা, যুক্তরাষ্ট্রে পিএলও অফিস আবার চালু করার ব্যবস্থা করা, ফিলিস্তিনিদের আর্থিক সাহায্য আবার চালু করা ইত্যাদি। তার প্রশাসন দুই রাষ্ট্র নীতির প্রতি তাদের সমর্থন পুনঃব্যক্ত করতে পারে, তবে অন্যান্য মার্কিন প্রশাসনের মতই এই বিষয়ে বাস্তবে পদক্ষেপ খুবই কম দেখা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় অনেক কিছুই ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় চলবে, তবে মিত্রদের সাথে নিয়ে ইরান ইস্যুতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। চার বছরে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক পরিবর্তন এসেছে, এই আলোকে বিভিন্ন সময়ে বলা বাইডেনের নীতিগুলো কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, এটাই এখন দেখার বিষয়।
[লেখক: উপজেলা কৃষি অফিসার, তিতাস, কুমিল্লা]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here