কোভিড-১৯ ও আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য

0
501

ডা. স্নিগ্ধা সরকার
বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে বিস্তারের জন্য কোভিড-১৯ রোগটিকে ইতিমধ্যেই মহামারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি লক্ষণ ও উপসর্গগুলো সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা সবাই কমবেশি জানি। তবে এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সৃষ্ট মানসিক সমস্যাগুলো বরাবরের মতই উপেক্ষিত।

অনেক সচেতনতা এবং সতর্কতার পরেও প্রতিনিয়ত বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়ছে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর। তাই এড়িয়ে না গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি।

করোনাকালে মানসিক সমস্যার উপসর্গ:

  • যারা ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বা যাদের আপনজন বা পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়েছেন অথবা মারা গিয়েছেন তাদের অনেকে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এদের অনেকেই মানসিকভাবে নিগৃহীতও হয়েছেন। তাই এসব কারণে মৃত্যু ভয় ছাড়াও তাদের মধ্যে বিষাদগ্রস্ততা থাকতে পারে। এমন অবস্থায় ভুক্তভোগী অনেকেই এই আঘাত পরবর্তী এক ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন যাকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার।
  • লকডাউন বা কোয়ারেন্টাইন এর জন্য যারা দীর্ঘদিন গৃহবন্দী হয়ে আছেন তাদেরও কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, হঠাৎ করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া বা যাকে বলা হয় প্যানিক অ্যাটাক।
  • দীর্ঘদিনের নিয়মিত রুটিন বা অভ্যাস বদলে যাবার জন্য বিষন্নতা।
  • ঘুমের সমস্যা বিশেষ করে অনিদ্রা অথবা ঘুমের সময় পাল্টে যাওয়া।
  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য ওজন বৃদ্ধি।
  • আয় উপার্জন কমে যাওয়ায় বা অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
  • এদের মধ্যে যারা আগে থেকেই এ্যাংজাইটি বা ডিপ্রেশন এর মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তাদের অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। আর এই দুর্যোগে যেসব নারী গর্ভবতী বা মা হয়েছেন তাদের মধ্যেও অতিরিক্ত উদ্বেগ দেখা যেতে পারে।

মানসিক চাপ কমাতে আমাদের করণীয়:

  • করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা থাকতেই পারে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে অতিরিক্ত ভয়-ভীতি খারাপ অবস্থাকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। তাই রুটিন মেনে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে হবে।
  • মানসিক প্রশান্তির জন্য যোগ ব্যায়াম, ধ্যান বা ইবাদত বিশেষ সহায়ক।
  • ঘরে বসে সৃজনশীল কাজকর্মে মনোনিবেশ করা যেতে পারে। সেই সাথে বাড়ির সবাই মিলে সাংসারিক কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেন। যেমন: রান্না করা, ঘর গোছানো ইত্যাদি।
  • প্রতিবেশী কেউ আক্রান্ত হলে তাদের সাথে বিদ্বেষমূলক আচরণ করা উচিত নয়। আমাদের একে অপরের প্রতি সদয় বা সহায়ক হতে হবে। মনে রাখবেন, সংকট কেটে গেলে এদের সাথেই আপনার সামাজিক অবস্থান হবে।
  • যারা এই কোভিড-১৯ কে জয় করেছেন তাদের অভিজ্ঞতা জানুন। তা মনে সাহস জোগাবে।
  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সর্তকতা অবলম্বন করুন। কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অতিরঞ্জিত বা ভুল তথ্য রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ খবর জানুন। নিজেও অসমর্থিত গুজবের পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকুন এবং আতঙ্ক ছড়ায় এমন ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করুন।
  • প্রয়োজনে অনলাইনে কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা টেলিমেডিসিনের সাহায্য নিন।

এই সময় শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য:

  • শিশুরা যেহেতু তাদের মনোভাব ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তাই তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণে অতিরিক্ত কান্নাকাটি বা বিরক্তভাব প্রকাশ করতে পারে। তাই পরিবারের শিশু সদস্যদের প্রতি একটু বিশেষ যত্নবান হতে হবে। পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে যতটুকু সম্ভব তার উপযোগী করে বুঝিয়ে বলতে হবে। তবে কখনোই ভয় দেখানো বা গায়ে হাত তোলা যাবে না।
  • যেহেতু স্কুল বন্ধ; তাই বাসায় লেখাপড়া, ছবি আঁকা, নাচ-গান অনুশীলন করাতে হবে।
  • গৃহবন্দী থেকে যেন মোবাইলে আসক্তি বেড়ে না যায় সেব্যাপারে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। পিপিই বা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা পোশাক সম্পর্কে শিশুকে অবহিত করতে হবে যেন কখনো প্রয়োজন হলে সে এটা দেখে আতঙ্কিত না হয়ে যায়।
  • অনেক ক্ষেত্রে দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের মধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করার সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। বাবা-মাকে এসব ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে বারবার বুঝিয়ে বলতে হবে।

[ লেখক : এমডি (নিউরোলজি), ফেজ-বি রেসিডেন্ট; নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here