কোরবানি প্রচলনের ইতিবৃত্ত

1
333

কোরবানি শব্দটি ‘কুরবুন’ মূল শব্দ থেকে উৎপত্তি। যার অর্থ নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য লাভ করা, উৎসর্গ করা, সান্নিধ্য লাভ করা। যেহেতু মুসলমান ব্যক্তি তার প্রিয় বস্তু আল্লাহ্র নামে উৎসর্গ করে প্রমাণ করে, সে সবকিছুর উর্ধ্বে আল্লাহ্কে বেশি ভালবাসো এবং এরই মাধ্যমে সে আল্লাহ্র নিকটবর্তী হয়, এজন্য এ ইবাদতকে কোরবানি বলে।

প্রচলিত ধর্ম বিশ^াস অনুযায়ী কোরবানি বলতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট তারিখসমূহে হালাল পশু জবেহ করাকে বুঝায়। বর্তমানে আমাদের সমাজে পাঁচজন, কিংবা সাতজনের নামে গরু কোরবানি করা হয়ে থাকে। বস্তুত কোরবানি একমাত্র আল্লাহ্র নামেই হওয়া উচিত। এর সাথে কোনো বান্দার নাম সংযোগ করে কোরবানি করলে তা শিরক বলে গণ্য হবে। সামাজিক রীতি অনুযায়ী আমরা পাঁচ কিংবা সাতজনের নাম কাগজে লিখে নিয়ে, ঐ সকল নামে কোরবানি করে থাকি। এ প্রথা এবং এ দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক নয়। মহান আল্লাহ্ বলেন- “কুল ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।” অর্থাৎ- ‘‘হে রাসুল (সা.)! আপনি বলুন- নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ- জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য।’’ (সূরা আল আন’আম ৬ : আয়াত ১৬২)

এমনিভাবে মহান আল্লাহ্ ওহির বাণী আল কুরআনে অন্যত্র এরশাদ করেন- ‘‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরাবানি বিধিবদ্ধ করে দিয়েছি, যেন তারা আল্লাহ্ তাদেরকে যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, তা জবেহ করার সময় তার উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে। আর তোমাদের উপাস্য তো একমাত্র উপাস্য আল্লাহ্। সুতরাং তোমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো।’’ (সূরা আল হাজ ২২ : আয়াত ৩৪)

প্রকৃতপক্ষে কোরবানি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নামে দেওয়া হারাম, অর্থাৎ কোরবানি বান্দার নামে নয়, বরং বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহ্র নামে করতে হয়। বিষয়টি মহিমান্বিত আল্লাহ্ ওহির বাণী আল কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে- ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, এবং সে পশুর মাংস, যেটির উপর জবেহের সময় আল্লাহ্র নাম ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে।’’ (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ১৭৩)

হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ (আ.) আল্লাহ্র নির্দেশে যখন পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করেন, তখন তিনি নিজের নামে কোরবানি করেননি, বরং তিনি আল্লাহ্র নামে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করেন। আর মুসলমান সমাজে কোরবানির যে প্রথা বর্তমানে চালু রয়েছে, এটি মূলত হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর কোরবানি থেকেই এসেছে। সুমহান আল্লাহ কোরবানিদাতার মনের অবস্থার উপর তার এই ইবাদত কবুল করে থাকেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ ফরমান- ‘‘আর আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে না এগুলোর মাংস, এবং না এগুলোর রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’’ (সূরা আল হাজ ২২ :আয়াত ৩৭)

অর্থাৎ আমাদের অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি কতটুকু কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রয়েছে, সেটিই পৌঁছায়।
এ কারণে কোরবানি নিজের হাতে করা যেমন সুন্নতে রাসুল (সা.), তেমনি আল্লাহ্র দেওয়া জন্তু নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহ্র নামে কোরবানি করা ফরজ। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘একদা আল্লাহ্র রাসুল (সা.) ধূসর বর্ণের দুই শিং বিশিষ্ট ২টি মেষ কোরবানি করেন। আর তিনি জবেহ করার প্রাক্কালে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলেন। আমি আল্লাহ্্র রাসুল (সা.)-কে স্বহস্ত মোবারকে কোরবানি করতে দেখেছি, আর তখন তাঁর কদম মোবারক জন্তুটির পাঁজরে উপর রেখেছিলেন।’’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ২২৫, ই.ফা.বা. কর্তৃক অনূদিত সুনানে ইবনে মাজাহ- ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৩, হাদীস নং ৩১২০)

সুতরাং যে কয়জন মিলে একটি গরু বা মহিষ কোরবানি করা হয়, তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ্র নামে কোরবানি করে, কোরবানি কবুল করানোর জন্য আল্লাহ্র কাছে অনুনয় বিনয় করে কোরবানি দাতাদের মনে মনে বলা উচিত- কেবল আল্লাহ্র নামে পশু জবেহ করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি আল্লাহ্র রাসুল (সা.) নিজেই উম্মতে মোহাম্মদীকে শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবের (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসুল (সা.) কোরবানির পশু জবেহ করার সময় বলতেন- “আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা ‘আন মুহাম্মাদিও ওয়া উম্মাতিহী বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার ছুম্মা যাবাহ।” অর্থাৎ ‘‘হে আল্লাহ্! (এই পশু) তোমার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং তোমারই উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত। তুমি এটি কবুল করো, মোহাম্মদের (সা.)-এর পক্ষ থেকে এবং তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে। আল্লাহ্ তোমার নামে কোরবানি করছি এবং আল্লাহ্ই মহান। অতঃপর রাসুল (সা.) জবেহ করতেন।’’ (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও দায়েমী শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ১২৮)

জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ্র নামের সাথে নিজেদের নাম সংযুক্ত করে পশু কোরবানি করা, আর পৌত্তলিকদের দ্বারা তাদের দেবদেবীর নামে পশু বলির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রকৃত অর্থে কোরবানি হচ্ছে- মানুষের আত্মা থেকে পশু প্রবৃত্তিকে দূর করে আল্লাহ্র প্রেম হাসিল করা। অর্থাৎ জীবাত্মার কুরিপুসমূহ, যথা- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ মদ ও মাৎসর্যকে পরিশুদ্ধ করা। অন্তরে আল্লাহ্র প্রেম প্রবল হয়ে চূড়ান্তরূপ ধারণ করলে পশুপ্রকৃত্তি আপনা-আপনিই দূর হয়ে যায়। তবে কোরবানির বাহ্যিক অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের কুরিপুকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে মানসিকতা তৈরি করার একটা প্রশিক্ষণ।

যথার্থ কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ হয় বলে, এই বিধান হযরত আদম (আ.)-এর সময় থেকে পালিত হয়ে আসছে। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘তুমি তাদের যথাযথভাবে শুনাও আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত। যখন তারা কোরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল করা হয়েছিল এবং অপরজনের কোরবানি কবুল করা হয়নি।’’ (সূরা আল মায়িদাহ ৫ : আয়াত ২৭)

অতঃপর মুসলিম জাতির আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ (আ.)-এর সময় থেকে কোরবানির বর্তমান প্রথা চালু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘হযরত ইব্রাহীম (আ.) বললেন- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সুপুত্র দান করুন। অতঃপর আমি তাঁকে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। তারপর সে যখন তাঁর পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহীম (আ.) বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি; এখন তুমি বলো, তোমার মতামত কী? পুত্র বলল, হে আমার আব্বাজান! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, সেটি পূর্ণ করুন। ইন্শাআল্লাহ্, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তুর্ভুক্ত পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শায়িত করলেন, তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! আপনি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালেন। আমি এরূপেই খাঁটি বান্দাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’’ (সূরা আস সাফফাত ৩৭ : আয়াত ১০০ থেকে ১০৫) এমনিভাবে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘আমি দু’জবেহকৃত পিতার সন্তান। একজন হযরত ইসমাঈল (আ.) এবং অপরজন হলেন- হযরত আবদুল্লাহ্ (আ.)।’’ (তাফসীরে কাবীর ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬০৮)

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের এ অকাট্য বাণী মোবারকই মুসলিম বিশে^র চিরায়ত ধর্ম বিশ^াস, মুসলিম জাতির আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ (আ.) স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল জবিহুল্লাহ্ (আ.)-কে আল্লাহ্র নির্দেশে কোরবানি করেন। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ্ পিতা-পুত্রের কোরবানি কবুল করে, হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা জবেহ করে দেন। পবিত্র মক্কা নগরীর মীনা প্রান্তরে সংঘটিত কোরবানির এ আদর্শ অনুসরণে হজের অনুষ্ঠানে আগত লক্ষ লক্ষ হাজিদেরকে প্রতি বছর মীনা প্রান্তরেই কোরবানি করতে হয়। আর হজের অনুষ্ঠানের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ^জুড়ে কেবল উম্মতে মোহাম্মদী তথা মুসলমানদেরকে পশু কোরবানির এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালন করতে হয়।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলিম উম্মাহর এ চিরন্তন বিধিবিধানের বিরুদ্ধে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগষ্ট, ইসলামের শত্রুরা এক গভীর ষড়যন্ত্র করে কোরবানির সত্য ইতিহাস বিকৃত করে মুসলিম উম্মার এ চিরায়ত ইবাদতকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে তথাকথিত বিশ^ শান্তি পরিষদের সভাপতি দেব নারায়ণ মহেশ^র সত্য ইতিহাস বিকৃত করার অসৎ উদ্দেশ্যে একটি রীট পিটিশন দায়ের করে। এ রীট পিটিশনে দেব নারায়ণ মহেশ^র দাবি করে- ‘‘হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্ন পুরণের জন্য তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে নয়, বরং ইসহাক (আ.)-কে কোরবানি করেছিলেন।’’ এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সূত্র ও মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিস ভিত্তিক জবাব প্রদান এবং আশানুরূপ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। এ কঠিন পরিস্থিতিতে দেওয়ানবাগ শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমি পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পবিত্র বাণী এবং পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যাবলী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোকাদ্দাস আলীর মাধ্যমে সরবরাহ করি। অতঃপর ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগষ্ট বৃহস্পতিবার, জনাকীর্ণ আদালতে মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওহাব মিঞা ও মাননীয় বিচারপতি কাজী রেজাউল হক এক ঐতিহাসিক রায়ে ‘হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করেছিলেন’ উল্লেখ করে দেব নারায়ণেল রীট পিটিশনটি খারিজ করে দেন। অধিকন্তু মিথ্যা ও ভিত্তিহীন রীট দায়ের ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপরাধে, আদালত দেব নারায়ণকে সাজাও প্রদান করেন। মহান রাব্বুল আলামিনের অপার দয়ায় আমাদের সময়োপযোগী ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বিজ্ঞ আদালতের সুচিন্তিত রায়ে মুসলিম জাতির চিরন্তন ধর্মীয় রীতি কোরবানির বিধানটি রক্ষা পায় এবং মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর ধর্ম স্বমহিমায় বিজয়ী হয়।

মুক্তি কোন পথে? গ্রন্থ থেকে সংকলিত

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here