কোরবানি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলে হাইকোর্টের রায়

0
279

মাসুদ করিম
মুসলিম উম্মাহর চিরন্তন বিধান কোরবানির বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট ইসলামের শত্রুরা এক গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে। কোরবানির সত্য ইতিহাস বিকৃতি করে মুসলিম উম্মাহর এই চিরায়ত ইবাদতকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় তারা মেতে ওঠে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে তথাকথিত বিশ^ শান্তি পরিষদের সভাপতি দেব নারায়ণ মহেশ^র সত্য ইতিহাস বিকৃিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে।

এই রিট পিটিশনে দেব নারায়ণ মহেশ^র দাবী করে- “হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্ন পূরণের জন্য তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নয়, বরং হযরত ইসহাক (আ.)-কে কোরবানি করেছিলেন। এদিকে রিট পিটিশনের পর বিভিন্ন সূত্র ও মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা এই বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে জবাব প্রদান এবং আশানুরূপ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। এই কঠিন পরিস্থিতিতে মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেব্লাজানের পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বাণী সম্বলিত প্রকাশিত পত্রিকায় তথ্যাবলি সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোকাদ্দাস আলীর মাধ্যমে হাইকোর্টে উত্থাপন করা হয়।

হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্ন পূরণের জন্য তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নয়, বরং হযরত ইসহাক (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন মর্মে বিগত ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে বিশ^ শান্তি পরিষদের সভাপতি দেব নারায়ণ মহেশ^র। এই রিটের সংবাদ পরদিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে তা দেওয়ানবাগ শরীফ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দেব নারায়ণের এহেন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবীকে পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে খণ্ডন করে দেওয়ানবাগ শরীফের পক্ষ হতে স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে পাঠানো হয়। বিবৃতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের ৪ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয় পাতায় একটি কলাম হিসেবে প্রকাশ করে। ফলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতি ও বিজ্ঞ আইনজীবীগণের দৃষ্টি গোচর হলে তারা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলিল হতে কোরবানির প্রকৃত ঘটনা অবগত হন। বিগত ৫ আগস্ট ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে বৃহস্পতিবার জনাকীর্ণ আদালতে মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওহাব মিঞা ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হক এক ঐতিহাসিক রায়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করেছিলেন উল্লেখ করে দেব নারায়ণের রিট পিটিশন খারিজ করে দেন। এমনকি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন রিট দায়ের ও মুসলমানদের স্পর্শকাতর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপরাধে তাকে সাজা প্রদান করা হয়।

গত ৪ আগস্ট ২০১০ খ্রিষ্টাব্দ, বুধবার দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত কলামটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্ন পূরণের জন্য তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নয়, বরং হযরত ইসহাক (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন মর্মে গত ১লা আগস্ট হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন বিশ^শান্তি পরিষেদের সভাপতি দেব নারায়ণ মহেশ^র। রিট আবেদনের বিষয়বস্তু ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আগামীকাল এই বিষয়ে শুনানী হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ আল কুরআন এবং মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় বিশ^াস জড়িত থাকায় রিট আবেদনটি ব্যাপক চাঞ্চল্য ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
পবিত্র কুরআনের বাণী সূরা আস সাফফাতের ৯৯ নম্বর আয়াত থেকে ১১১ নম্বর আয়াতকে উদ্ধৃত করা হয়। পবিত্র কুরআনের আয়াতে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্রের জন্য প্রার্থনা করার পর আল্লাহ্ তায়ালা তাকে যে সন্তান দান করেছিলেন তাকেই তিনি কোরবানি দিয়েছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার জীবনের ৮৬ বছর বয়সে প্রার্থনায় লাভ করেছিলেন হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে। পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) তাঁর মা হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাথে মক্কায় নির্বাসিত হওয়ার পর যখন ৬/৭ বছর বয়সে উপনীত হলেন, তখন মহান আল্লাহর নির্দেশে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁকে কোরবানির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। এ কারণেই তাকে ইসমাঈল জবিহুল্লাহ্ বলা হয়।

এদিকে হযরত ইসহাক (আ.)-এর জন্ম হয় হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর ১০০ বছর বয়সে। ফেরেশতারা হযরত লুত (আ.)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করতে যাওয়ার সময় অপ্রত্যাশিতভাবে হযরত ইসহাক (আ.)-এর জন্মের সুসংবাদ দিয়ে যান। সুতরাং কোরবানির ঘটনার ৭/৮ বছর পর হযরত ইসহাক (আ.)-এর জন্ম হয়। যেহেতু কোরবানির ঘটনার সময় হযরত ইসহাক (আ.)-এর জন্ম হয়নি, সেহেতু তিনি কোরবানি হয়েছেন, তা বলা যায় না। এতে প্রমাণিত হয়, হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর জ্যেষ্ঠপুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কোরবানি করা হয়েছে।

এছাড়া কোরবানির ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল পবিত্র মক্কার মীনা উপত্যকায়। ঐ স্মৃতি অনুসরণ করে আজও প্রতি বছর হজের সময় হাজিগণ মিনায় গিয়ে শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ করে পশু কোরবানি করেন। মক্কা হলো- বিবি হাজেরা (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর আবাসভূমি। অন্যদিকে বিবি সারার পুত্র হযরত ইসহাক (আ.) বসবাস করতেন মক্কা হতে হাজার মাইল দূর হেবরন শহরে। এমতাবস্থায় হযরত ইসহাক (আ.) মক্কায় এসে কোরবানি হয়েছেন এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। হযরত ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর পথে কোরবানি হয়েছিলেন বলেই তার বংশধররা আজও কোরবানির বিধান মেনে চলেন। অথচ হযরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধর ইহুদি-খ্রিষ্টানরা কখনো কোরবানি করে না। এতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করা হয়েছিল। তাছাড়া হযরত রাসূল (সা.) নিজেই বলেছেন, আমি দুই জবেহকৃত পিতার সন্তান। একজন হযরত ইসামঈল (আ.) এবং অপরজন হযরত আবদুল্লাহ্ (আ.) [তাফসীরে কাবীর ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬০৮]

হযরত ইসমাঈল (আ.) কোরবানি হয়েছিলেন এই প্রসঙ্গে আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অতএব হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর কোরবানি হওয়ার বিষয়ে পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিল থাকার পরও তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে মুসলমানদের ধর্মের উপরে আঘাত হানার অপচেষ্টা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্কে কটাক্ষ করা ধৃষ্টতা বৈ কিছু নয়।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের এ অকাট্য বাণী মোবারকই মুসলিম বিশে^র চিরায়ত ধর্ম বিশ^াসের ভিত্তি, মুসলিম জাতির আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ (আ.) স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল জবীহুল্লাহ্ (আ.)-কে আল্লাহ্র নির্দেশে কোরবানি করেন। মহান আল্লাহ্ পিতা-পুত্রের কোরবানি কবুল করে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা জবেহ্ করে দেন। পবিত্র মক্কা নগরীর মিনা প্রান্তরে সংঘটিত কোরবানির এই আদর্শ অনুসরণে হজের অনুষ্ঠানে আগত লক্ষ লক্ষ হাজিদেরকে প্রতি বছর মিনা প্রান্তরেই কোরবানি করতে হয়। আর হজের অনুষ্ঠানের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ^জুড়ে কেবল উম্মতে মোহাম্মদী তথা মুসলমানদেরকে পশু কোরবানির এই মহান ইবাদত পালন করতে হয়। মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেব্লাজানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিজ্ঞ আদালতের সুচিন্তিত রায়ে মুসলিম জাতির চিরন্তন ধর্মীয় রীতি কোরবানির বিধানটি রক্ষা পায় এবং মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর ধর্ম স্বমহিমায় বিজয়ী হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here