ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভবিষ্যৎ

0
194

শিল্প অর্থনীতি ডেস্ক : করোনার আঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা যে অনেকটাই ধীর হয়ে যাবে, সে ব্যাপারে সব ধারার বিশেষজ্ঞ এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো একমত। করোনায় অর্থনীতির ক্ষতি হবেই, এটাই মেনে নিয়ে এগোতে হবে। তাই বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপরে করোনার আঘাতের পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকেই ভাবনাচিন্তা করা দরকার।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকা শক্তি। অল্প বা মোটামুটি বিনিয়োগে অধিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এই খাত। বাংলাদেশের মতো বিপুল শ্রমশক্তির দেশে বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানাগুলোতে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মোট দেশজ উৎপাদনে আরও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা এবং বৈষম্যের শিকার হয়েও বিগত কয়েক বছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আমাদের দেশে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে বিকশিত হতে শুরু করেছে। চাকরি না খুঁজে নিজের এবং অন্যের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরন্তর আহ্বান অনেক মানুষের মানসিক গঠনে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত এমনকি বিদেশ ফেরত উচ্চশিক্ষিতদের অনেকেও নিজেদের দেশের শিল্পোন্নয়নে নিয়োজিত করেছেন। তাঁদের উদ্যোগ সাধারণত শুরু হয় ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি শিল্প দিয়েই।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই; আমরা যদি খালি চোখে একটু লক্ষ্য করি, তাহলেই বুঝতে পারব সারা বিশ্বেই সিংহভাগ বড় শিল্প কারখানার শুরু হয়েছে ক্ষুদ্র বা অতি ক্ষুদ্র থেকেই। সাধারণত বৃহৎ শিল্প এক দিনে গড়ে ওঠে না। একসময়ের ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পই কালের পরিক্রমায় হয়ে ওঠে বৃহৎ শিল্প। কিন্তু এই উত্তরণের পথটা সহজ তো নয়ই বরং অত্যন্ত দুরূহ। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল এই পথকে আরও দুরূহ করে দিয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতাকে সময়োপযোগী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থের অপ্রতুল জোগান, কঠোর নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে কঠিন করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড অনীহা ও অবহেলা চোখে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য যে ঋণ সুবিধা দিতে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা খুব কম ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হয়েছে। সাধারণত বৃহৎ শিল্প কারখানা যেমন এক দিনে গড়ে ওঠে না, তেমনি রাতারাতি অনেক শিল্প কারখানাই রপ্তানিকারক হয়ে উঠতে পারে না। তাই বলে দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এ ধরনের ভাবনাজনিত বৈষম্যের শিকার। সবকিছুর পরও অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো কথা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এসএমই নীতি অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৪ পর্যন্ত এই নীতি বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম এই নীতির ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন দেখার জন্য।

এটা জানা কথা যে ক্ষুদ্র ও অবকাঠামোগতভাবে দুর্বলেরাই যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে এই মতামতই উঠে আসছে যে করোনা মহামারিতে বড়-ছোট সব শিল্পকারখানাতেই প্রভাব পড়লেও তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলো অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। ওইসিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দ্রুত পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে দুর্বলতা করোনা মহামারিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here