খানকাহ ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য

0
342

খানকাহ ফার্সি শব্দ। এ শব্দের অর্থ পিরের অবস্থানস্থল, বৈঠকখানা, অলী-আল্লাহগণের আবাসস্থল, উপাসনাস্থল, ইত্যাদি। প্রচলিত অর্থে মারেফাতপন্থীদের সম্মিলিত সাধনার স্থানকে ‘খানকাহ’ বলে। এ স্থানে মূলত আধ্যাত্মিক তথা আল্লাহ প্রাপ্তির বিষয়ে বাস্তব শিক্ষা দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “ত্বালাবুল ‘ইলমি ফারীদ্বাতুন ‘আলা কুল্লি মুসলিমিন।” অর্থাৎ- “আল্লাহ্ প্রাপ্তির বিদ্যা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান (নর ও নারীর) উপর ফরজ।” (ইবনে মাজাহ ও বায়হাকীর শু‘আবুল ঈমানের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৪)
এমনিভাবে হযরত হাসান (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “এলেম হলো দু’প্রকার। যথা (১) ক্বালবী এলেম, আর এ এলেমই হচ্ছে পরম উপকারী এলেম, (২) মুখের এলেম তথা কিতাবী এলেম; আর এ এলেমই মাখলুকাতের উপর আল্লাহর দলিল।” (তাফসীরে দুররে মানছুর ২২নং খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১)
মাদরাসা আরবি শব্দ। অভিধানে শব্দটির অর্থ বিদ্যালয়, শিক্ষাঙ্গন, স্কুল। যেমন- ‘মাদরাসাতুন ইবতিদাইয়্যাহ’, অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে- প্রাথমিক বিদ্যালয় (প্রাইমারি স্কুল)। তবে আমাদের দেশে যে স্থানে সম্মিলিতভাবে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা করা হয়, এরূপ প্রতিষ্ঠানকে মাদরাসা বলে। এটি প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠান, যেখানে পুঁথিগত বিদ্যা ও জাহেরি আমল শিক্ষা দেওয়া হয়।
খানকাহ’র শিক্ষা পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে। খানকাহ’র মাধ্যমে মোর্শেদ কেবলাজানের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়। আল্লাহ বলেন- “ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূত্তাক্বুল্লাহা ওয়াকূনূ মা’আস সাদিক্বীন।” অর্র্থাৎ- “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গ (সহবত) লাভ করো।” (সূরা আত তাওবাহ ৯ : আয়াত ১১৯)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এ নির্দেশের আলোকে সাধক যখন খানকাহ শরীফে গমন করে, তখন মোর্শেদের ক্বালব থেকে আপন ক্বালবে খেয়ালের মাধ্যমে ফায়েজ হাসিল করে তার দিলের কুরিপুসমূহ দূরীভূত হয়। আল্লাহর নুরে দিল উদ্ভাসিত হয়, এভাবে আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর সাথে মানুষের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ফলে সাধক ইবাদতসহ অন্য যে কোনো কাজ করুক না কেন, তা আল্লাহ এবং রাসুলের পছন্দমত হচ্ছে কিনা, সেটি নিজেই অনুভব করতে পারে। এজন্য তার পক্ষে শুদ্ধভাবে ইবাদত করা সম্ভব হয়। পরিণামে এরূপ ইবাদত তার উচ্চ মর্যাদা লাভের কারণ হয়। অর্থাৎ তার আধ্যাত্মিক উন্নতি অব্যাহত থাকে। আল্লাহ বলেন, “তিনিই মু’মিনদের ক্বালবের মাঝে পরম প্রশান্তি দান করেন, যেন তারা তাদের ইমানের সঙ্গে আরো ইমান বৃদ্ধি করে ইমানকে দৃঢ় করে নিতে পারে।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮ : আয়াত ৪)
পক্ষান্তরে মাদরাসা শিক্ষা পুস্তকভিত্তিক ও বাহ্যিক আমল সর্বস্ব হওয়ায় মানুষের আত্মায় এর কোনো প্রভাব পড়ে না। উপমাস্বরূপ বলা যায়, ডাক্তার প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র পাঠ করলে যেমন রোগ-ব্যধি আরোগ্য হয় না, বরং ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ঔষধ সেবন করতে হয়, তদ্রুপ কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মোর্শেদের সহবতে গিয়ে সাধনায় মগ্ন হলেই ইবাদতের সুফল আত্মায় পৌঁছে থাকে।
এজন্য দেখা যায়, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেও অধিকাংশ লোক উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয় না। অর্থাৎ নিজেকে কুরিপুর প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারে না, যে কারণে প্রকাশ্যে ও গোপনে নানাবিধ পাপ কাজ করে থাকে। আল্লাহ্ বলেন, “যাদের তাওরাত (কিতাব) অনুযায়ী আমল করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তদনুযায়ী আমল করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধা, যেটি পুস্তক বহন করে।” (সূরা আল জুমু’আহ ৬২ : আয়াত ৫)
প্রকৃতপক্ষে মাদরাসায় পাস করেও খাঁটি অলী-আল্লাহর সহবত ও বিশুদ্ধ আমলের অভাবে তাদের আধ্যাত্মিক কোনো উন্নতি লাভ হয় না, মুখে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর নাম হাজার জপ করলেও, নিজেদের ইবাদতের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে কিনা, তাও তারা বুঝতে পারে না। ফলে তারা অন্ধের ন্যায় পথ চলতে থাকে। আল্লাহ বলেন, “বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের বক্ষদেশের ক্বালবের চক্ষু।” (সূরা আল হাজ্জ ২২ : আয়াত ৪৬)
এ সকল লোক এই বলে অন্যদের সান্ত্বনা দিতে থাকে যে, যাবতীয় ইবাদতের প্রতিফল মৃত্যুর পর লাভ করা যাবে। অথচ মারেফাতপন্থী সাধক ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিদান ও প্রতিক্রিয়া নিজের আত্মায় অনুভব করেন।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তির নির্দেশে যখন ধর্ম করা হয়, তৎক্ষণাৎ ইবাদতের ফলাফল ক্বালবে উপলব্ধি করা যায়। বিষয়টি সুমহান আল্লাহ তাঁর পাক জবানেই সুস্পষ্ট করেছেন, এরশাদ হচ্ছে, “হে রাসুল (সা.)! অবশ্যই আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সš‘ষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করল, আর তাদের ক্বালবে যা ছিলো আল্লাহ তা জানতেন। অতঃপর তিনি নাযিল করলেন তাদের ক্বালবে পরম প্রশান্তি এবং তাদের দান করলেন একটি নিকটবর্তী বিজয়।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮ : আয়াত ১৮)
মোট কথা কেবলমাত্র (পুস্তক নির্ভর) মাদরাসা শিক্ষা মানুষের গোমরাহী দূর করতে পারে না এবং আত্মার উন্নতিও দিতে পারে না।
এ প্রসঙ্গে হযরত যিয়াদ ইবনে লবীদ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল (সা.) একটি বিষয় আলোচনা করছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, “এটি এলেম বিলুপ্ত হওয়ার সময় সংঘটিত হবে। তখন আমি বললাম- হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! এলেম কি করে বিলুপ্ত হবে, অথচ আমরা নিজেরা কুরআন শিক্ষা করছি এবং আমাদের সন্তানদেরও শিক্ষা দিচ্ছি? অতঃপর আমাদের সন্তানগণ তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা দিতে থাকবে, এভাবে (বংশ পরস্পরায়) কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন যিয়াদ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! এতদিন তো আমি তোমাকে মদীনার একজন জ্ঞানী লোক বলেই মনে করতাম। (তুমি কি লক্ষ্য করোনি) এই ইহুদী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় কি তাওরাত ইঞ্জিল কিতাব পড়ছে না? অথচ তারা এ কিতাবের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করে না।” (মুসনাদে আহমদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, তিরমিযী ও দারেমী শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৮)
সুতরাং বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, কিতাবী বিদ্যায় শিক্ষিতসহ অন্য যে কোনো বিদ্যায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের আত্মা শুদ্ধ করতে নবুয়তের যুগে নবি এবং বর্তমান বেলায়েতের যুগে অলী-আল্লাহর সহবতে যাওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি মাদরাসায় শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য একই উদ্দেশ্যে অলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়া অবশ্য কর্তব্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here