খোশ আমদেদ মাহে রমজান

4
429

খোশ আমদেদ মাহে রমজান। রোজা মানুষের আত্মিক উন্নতি বিধানের ক্ষেত্রে অনন্য ভুমিকা পালন করে। মানুষের আত্মার কুপ্রবৃত্তি গুলোকে দুর্বল করে মানব প্রকৃতি বিকাশ লাভের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করত মহান আল্লাহ্র প্রতি সর্বাত্মক আত্মসমর্পণের শিক্ষাই রোজার উদ্দেশ্য। হযরত রাসুল (সা.) ফরমান, ‘‘যারা পরিপূর্ণভাবে রোজা পালন করে, তারা রমজান শেষে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় পুতঃপবিত্র হয়ে যায়।’’ হাদিস শরীফে হযরত রাসুল (সা.) আরো বলেন, “প্রতিটি জিনিসের একটি দরজা আছে, আর ইবাদতের দরজা হচ্ছে সিয়াম বা রোজা।’’এজন্য আদিকাল থেকে আল্লাহ্ পাকের হুকুমে খোদা ভীরুগণ রোজা পালন করে আসছেন। শুদ্ধভাবে রোজা পালনকারী ব্যক্তি তার নফসের কু-রিপুগুলো দমন করতে সক্ষম হয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে বিধায় তার চরিত্রে মানবীয় গুণাবলির প্রকাশ পায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, বছরের পর বছর নিয়মিত রোজা পালন করা সত্তে¦ও আমাদের অনেকের আত্মশুদ্ধি অর্জন বা চরিত্রের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়না।

রমজান মাসকে হযরত রাসুল (সা.) তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম দশ দিন রহমতের, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতের এবং তৃতীয় দশ দিন নাজাতের বা দোযখ থেকে মুক্তির। বস্তুত মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কোনো ইবাদত করতে পারেনা। রমজানের বিশেষ ফায়েজ মানুষের মাঝে ইবাদতের স্পৃহা জাগ্রত করে। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে আল্লাহর ইবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার মাঝে আল্লাহর দয়া ও নৈকট্য লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। রমজানের দশ দিন এভাবে অতিবাহিত করার পর তার মাঝে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি হয়। এ প্রেমের প্রভাবে সে তার জীবনের কৃত অপরাধসমূহ ও আল্লাহর নাফরমানির জন্য অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হতে থাকে, কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং পাপ কাজের প্রতি তার ঘৃণার উদ্রেগ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন মানুষ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুযোগ পেয়ে থাকে। মহান আল্লাহ্ যখন মানুষকে ক্ষমা করে দেন, তখন আল্লাহ্র দয়া লাভ করে মানুষের আত্মায় অনাবিল শান্তি অনুভব হতে থাকে। আর আত্মার প্রকৃত শান্তিই দোজখ থেকে মুক্তি লাভের পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘‘রোজা আমার জন্য এবং আমি তার প্রতিদান।’’ যে রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি অর্জন করত আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভে সক্ষম হয় উহাই প্রকৃত রোজা বা হাকিকতে সিয়াম।

দেহের রোগ-ব্যাধি দূর করতে যেমন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হয়, তেমনি আত্মার ব্যাধি দূর করতে আত্মিক ইবাদত করা প্রয়োজন আর রোজাই হচ্ছে আত্মিক ইবাদত। অন্তরের ব্যাধি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।’’ (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ১০)
রোজা হচ্ছে এমন একটি ইবাদত, যার দ্বারা ব্যাধিগ্রস্ত আত্মা সুস্থ হয়। রোজা শুধু বান্দা ও স্রষ্টার সাথে সম্পর্কযুক্ত। বান্দা যা করছে আল্লাহ্ তা দেখছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন তিনি (আল্লাহ্) তোমাদের সাথে আছেন। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তা দেখেন।’’ (সূরা হাদীদ : আয়াত ৪) আল্লাহ্ তায়ালা আরও বলেন, ‘‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি (রিপু) তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটতর।’’ (সূরা ক্বাফ: আয়াত ১৬) আল্লাহ্ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা যা করছি তিনি তা দেখছেন। কুরিপু দ্বারাই যে মানুষ বিপদগামী ও আত্মা কুলষিত হয় এবং আল্লাহ্ যে শাহ রগের চেয়েও নিকটতর এসব বিষয়গুলোই আয়াতদ্বয়ে ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই কুলষিত আত্মা পরিশুদ্ধ করার ইবাদত রোজা পালন করে যেন আমরা আত্মশুদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করি।

রোজা মানুষকে ‘সংযমশীল’ হওয়ার শিক্ষা দেয় বলে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সংযমশীল’ অর্থ- নিজকে নিয়ন্ত্রণে আনা তথা আত্মশুদ্ধি লাভ করা। কিন্তু দেখা যায়- রমজান মাসে আমরা অনেকেই অসংযমী হয়ে পড়ি অর্থাৎ- নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। এ মাসে আমরা যদি সংযমশীল হই এবং অন্যান্য মাসের মতো স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করি, তাহলে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির কোনই কারণ নেই এবং দ্রব্য মূল্য কমে যাবে। অপচয়কারীকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না। পবিত্র হদিস শরীফে উল্লেখ আছে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই। কৃচ্ছ্রতা ও আত্মসংযমের পবিত্র মাসে অযথা কেনাকাটা করে আমরা যেন শয়তানের ভাই না হই। আমরা রোজা পালনের মাধ্যমে যদি সংযমশীলতা তথা আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারি, তাহলে সমাজের অশান্তি দূর হবে। এই সংযমশীল তথা আত্মশুদ্ধি অর্জনের অন্যতম উপায় হচ্ছে আল্লাহর বন্ধুদের নির্দেশে রোজা পালন করা। এতে সহজেই আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয়। রোজা পালনের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ আত্মাকে সংযমশীল তথা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন কোন কাজ নয়। এবারের রোজা পালনে আত্মশুদ্ধি অর্জন হোক আমাদের লক্ষ্য এবং সেই সাথে সংকটময় করোনা পরিস্থিতি থেকে মহান আল্লাহ্ আমাদের পরিত্রাণ দান করুন। আমিন।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here