গর্ভবতী মায়ের খাদ্যাভ্যাস

0
123

গর্ভবতী মায়ের খাদ্যাভ্যাস
ডা. ফারহানা শারমীন অভি

একজন গর্ভবতী মায়ের খাবার কেমন হবে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে প্রায়ই। গর্ভবতী মায়ের খাদ্যাভ্যাস তার নিজের ও গর্ভের সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজকের আলোচনাতে এই ব্যাপারে আলোকপাত করবো।

গর্ভকালীন খাদ্যাভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
(ক) এসময় এমন খাদ্য গ্রহণ করতে হবে যা একই সাথে মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও গর্ভের সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রদান করবে। এছাড়াও এই ডায়েট মাকে সন্তানের জন্ম প্রক্রিয়া অর্থাৎ ডেলিভারির সময় যে শক্তির প্রয়োজন তার উৎস হিসেবে কাজ করবে। এমনকি সন্তান জন্মদানের পর বুকের দুধ ঠিকঠাক মতো আসার জন্য যে পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন তা এই খাদ্যাভাসের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।
(খ) একজন গর্ভবতী নারীর বিশেষ করে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ভাগে প্রতি দিন প্রায় ২৫০০ কিলো ক্যালরি প্রয়োজন এবং সন্তানের জন্মের পর যদি মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান তবে অতিরিক্ত ১০০ কিলো ক্যালরি অর্থাৎ ২৬০০ কিলো ক্যালরি দরকার। প্রশ্ন হতে পারে,এই ক্যালোরির উৎস কি হতে পারে? উৎস হবে, আমিষ, চর্বিজাতীয় খাবার ও শর্করা।

গর্ভবতী মায়ের খাবার কেমন হতে হবে?
(ক) এসময় খাবার হতে হবে সহজপাচ্য ও পুষ্টিগুণে ভরপুর। সেই সাথে মায়ের পছন্দ অপছন্দকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আবার মায়ের ও তার পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখেই খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা উচিত।
(খ) আমিষ জাতীয় খাবার যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একথা তো আমরা জেনেও গেলাম, তবে এই আমিষের সিংহভাগ কিন্তু হতে হবে প্রাণীজ আমিষ। প্রতিদিন একজন গর্ভবতী মাকে মূল খাবারের পাশাপাশি আধা লিটার থেকে এক লিটার দুধ খেতে হবে। মনে রাখতে হবে এক লিটার দুধ থেকে এক গ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যাবে। এছাড়াও দুধের তৈরি খাবার, মাংস, কলিজা ও ডিম খেতে হবে। নদী বা পুকুরের মাছের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ খেতে কোনো নিষেধ নেই। এছাড়া বিভিন্নরকম ডাল ও বাদাম খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
(গ) আমিষের মতো চর্বির উৎসও হতে হবে প্রাণীজ। এনিমেল ফ্যাটে থাকে মা ও সন্তান উভয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ এবং ডি।
(ঘ) আমিষ ও চর্বির আধিক্যে শর্করাকে অবহেলা করা যাবে না। খেতে হবে বেশি বেশি শস্য জাতীয় খাবার। আর সেই সাথে মাকে দিতে হবে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ লবণে ভরপুর খাবার, সবুজ শাকসবজি, রঙিন ও টক মিষ্টি মৌসুমী ফলমূল। তবে পাতে অতিরিক্ত লবণের কোনো প্রয়োজন নেই। খাবার সুস্বাদু করার জন্য পরিমিত লবণই যথেষ্ট। আর কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রক্ষা পাবার জন্য আঁশজাতীয় খাবার ও শাক সবজীর পাশাপাশি প্রচুর পানি পান করা উচিত।

কেউ কেউ বলেন খাবার থেকে পুষ্টি পাবার পর কি আলাদা করে ভিটামিন ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে হবে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তবে কেন?
(ক) গর্ভধারণের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সন্তানের কিছু জন্মগত জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ফলিক এসিড গ্রহণ করতে হবে যা গর্ভধারণের পরেও প্রথম ১৬ সপ্তাহ পর্যন্ত জরুরি।
(খ) অপরদিকে খাবারের সাথে যে আয়রন পাওয়া যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। একজন গর্ভবতী নারীকে তাই ১৬ সপ্তাহের পর থেকে আয়রন ফলিক এসিড, জিঙ্ক ট্যাবলেট দিতে হবে। যেহেতু বেশিরভাগ ভিটামিনই পানিতে দ্রবণীয় এবং রান্নার সময় অনেক খাবারের ভিটামিন গুণ নষ্ট হতে পারে, তাই ২০ সপ্তাহের পর থেকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট ও দিতে হবে।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে আমি যে সঠিক পরিমাণ খাবার খাচ্ছি তা বুঝবো কিভাবে? ওজন বৃদ্ধির সাথে কি এর সম্পর্ক আছে?
মায়ের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি ওজন বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

বলা হয় যে, একজন স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের অধিকারী নারীর গর্ভধারণের পর ১১ কেজি এবং স্থূলাকায় নারীর ক্ষেত্রে ৭ কেজি বা তার কম ওজন বৃদ্ধি হতে হবে। অপরদিকে আগে থেকেই উক্ত ক্ষীণ স্বাস্থ্যের অধিকারিণীকে প্রয়োজনবোধে ১৮ কেজি ওজন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পুষ্টিহীনতার মতো অতিরিক্ত ওজনও মা এবং সন্তান উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। প্রতি মাসে গড়ে দুই কেজি বা প্রতি সপ্তাহে গড়ে আধা কেজি ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে বলব, গর্ভাবস্থায় একজন নারীর তার নিজের শারীরিক সুস্থতার জন্য এবং সন্তানের বেড়ে ওঠার কথা চিন্তা করে যেমন খাদ্যাভ্যাস তার করতে হবে তেমনি স্বামী ও পরিবারের সবারই তার খাবারের ব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত।
[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); এমএস (গাইনি অ্যান্ড অবস) ফেজ-বি রেসিডেন্ট, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here