গুগল-ফেসবুক-অ্যাপলের ব্যাংকিং : বদলে যাবে প্রচলিত ধারা

0
169

প্রযুক্তি ডেস্ক : গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল ও আমাজনের মতো টেকজায়ান্টদের প্রযুক্তি দুনিয়ায় ছিলো একটা সুনির্দিষ্ট পরিসর। কিন্তু এরা সকলেই নিজেদের চেনা গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরে পা রাখতে শুরু করেছে ইতোমধ্যেই। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ ব্যাংক খাতকে। স্পস্টতই লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিজেদের ব্যবসাকে সর্বব্যাপী বিস্তৃত করতে চাইছে এসব বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল ও আমাজন এরই মধ্যে খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে।

গত জুনে আমাজন কেনাকাটার জন্য নিয়ে এসেছে একটি বিশেষ ক্রেডিট কার্ড। গত আগস্টে অ্যাপল চালু করেছে নিজস্ব ক্রেডিট কার্ড। গত নভেম্বরের ১২ তারিখ ফেসবুক ঘোষণা করেছে যে গ্রাহকদের জন্য নতুন লেনদেন ব্যবস্থা নিয়ে আসছে তারা। তার ঠিক পরদিনই গুগল ঘোষণা দেয়, শিগগিরই গ্রাহকদের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট বা চেকিং অ্যাকাউন্ট) সুবিধা দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে এই সুবিধা পাবেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকেরা।

অবশ্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এসব উদ্যোগ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার হিসেবে বড়সড় কোনো বিষয় নয়। তবে তাদের এই আগ্রহ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আগামী দিনে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ আর্থিক কর্মকাণ্ডের ব্যবসাকে নতুন মাত্রা দেবে। এমনকি বাণিজ্যের ধারাও তাতে বদলে যেতে পারে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের মতে, অনেক দিন ধরেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাজারে নজর ছিল গুগল-ফেসবুকের। এবার ব্যাংকের মতো অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও গ্রাহকদের দিতে চাইছে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তবে এটা লক্ষনীয় যে, ব্যাংকের নানা কাজ করতে চাইলেও ঠিক ব্যাংক হতে চাইছে না গুগল-অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে চাইলে মানতে হয় নানা কঠোর নিয়মকানুন। সেই বিধিনিষেধের বেড়াজালে নিজেদের আটকাতে চাইছেন না টেক জায়ান্টরা।

মূলত ভার্চ্যুয়াল লেনদেনে নজর দিতেই অ্যাপল পে ও গুগল পে চালু করা হয়েছে। এই দুটি মূলত ডিজিটাল ওয়ালেট। তবে কার্ডের ডিজিটাল ভার্সন সংরক্ষণ করলেও গুগল-অ্যাপল লেনদেন প্রক্রিয়াজাতকরণ করে না। মূলত গ্রাহকের সব তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে তারা। ওদিকে ফেসবুকের বিশেষ লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যাবে মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপেও। উবারের লেনদেন ব্যবস্থা উবার মানি চালকদের পাশাপাশি অ্যাপ ব্যবহারকারীদেরও কাজে দেবে।

অন্যদিকে আমাজন পে কিছুটা বাকিদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি লেনদেন প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজটিও আমাজন করে থাকে। কিন্তু অন্যরা লেনদেনের কাজটি দিয়ে দিয়েছে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের হাতে। অ্যাপল যেমন লেনদেনের দায়িত্ব দিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকসের হাতে। গুগলের পাশে আছে সিটিগ্রুপ। আর আমাজনকে সংগত করছে আমেরিকান এক্সপ্রেস।

তবে কি এক্ষেত্রেও চীনের অনুসরণ?
পশ্চিমা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মূলত চীনের তৈরি উদাহরণে উৎসাহিত হয়েছে, এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। চীনে ‘উইচ্যাট পে’ ও ‘আলি পে’ ব্যাপক জনপ্রিয়। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে লেনদেন প্রক্রিয়ায় এই দুই অ্যাপের প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। চা কেনা থেকে শুরু করে ট্যাক্সির বিল পরিশোধ সবই করা যায় এই দুই অ্যাপে কিউআর কোড স্ক্যান করে। চীনে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রাহক ১০০ কোটির বেশি। চীনে মোট ভোগ্য ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ এসব অ্যাপের মাধ্যমে হয়।

তবে চীনের এই মডেল আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জন্য কার্যকর হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকিংস’-এর কর্মকর্তা অ্যারন ক্লেইন বলছেন, উন্নত ও ধনী বিশ্বের দেশগুলোতে এরই মধ্যে একটি পরিপূর্ণ ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থা চালু আছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অ্যাপভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা বেশ কঠিন। কারণ, প্রচলিত ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের ছিনিয়ে আনতে অনেক মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ দিতে হবে। এ ছাড়া মানতে হবে দেশভিত্তিক স্থানীয় নানা নিয়মকানুন।

ব্যাংক না হয়েও কেন ব্যংকিংএ আগ্রহী তারা?
কিন্তু এত সব প্রতিবন্ধকতার পরও কেন টেকজায়ান্ট কোম্পানিগুলো ব্যাংক খাতে আসতে চাইছে? মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ওয়্যারড-এর বিশ্লেষণ হচ্ছে, নগদ নারায়ণ ছাড়াও আরেকটি কারণে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতে ঢুকতে আগ্রহী হয়েছে। সেটি হলো, গ্রাহকদের তথ্য। যদি গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন ও কেনাকাটার অভ্যাস সংশ্লিষ্ট তথ্য গুগল-ফেসবুকের হাতে চলে আসে, তবে সেটি হবে এক অমূল্য সম্পদ। এর ফলে গ্রাহকদের ব্যয়ের ধরন বোঝা যাবে এবং সেগুলো আবার বিভিন্ন মূল ধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে। কোনো গ্রাহককে কোনো বিজ্ঞাপন দেখাতে হবে, সেটিও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যাবে। আর ঠিক এ কারণেই ব্যাংক না হয়েও ব্যাংকের মতো কাজ করতে আগ্রহী হয়েছে গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল ও আমাজন।

টেক জায়ান্টরা ব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, নাকি সহযোগী?
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ফরচুন বলছে, ব্যাংকিং খাতের বৈশ্বিক বাজার বিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন আসছে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে এসব কোম্পানি। বিনিময়ে তাদের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা সামলাবে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে না; বরং একে অপরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাটি বদলে ফেলা হচ্ছে।

আগে হারাতে হবে বিটকয়েনকে ?
এদিকে ফোর্বস বলছে, বর্তমানে নতুন করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব আরেক অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসায় মন্দা আসার শঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গুগল, ফেসবুক ও অ্যাপলের মতো টেকজায়ান্টরা ব্যাংকের মতো করে আর্থিক কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার অনেক দিনের অভিপ্রায়কে আবার পুনর্জীবিত করার চেষ্টায় আছে। এ কারণেই সম্প্রতি গুগল স্মার্ট ডেবিট কার্ড তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এমন অভিলাষে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বিটকয়েন। গত অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল বিটকয়েন। এবার ব্যাংকের মতো হতে চাইলে গুগল-ফেসবুককে আগে বিটকয়েনকে পরাজিত করতে হবে।

এই উদ্যোগে কতটা ঝুঁকি আছে?
অনেকেই বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় টেকজায়ান্টরা আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। মানুষের জীবনের সবকিছুতেই তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। বাড়বে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় মানুষের সময় কাটানোর হার। কিন্তু গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা যেহেতু অহরহ ঘটছে, তাই থাকছে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা। এমনকি বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে পড়তে পারে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও।

পরিষেশে বলা যায় বৈশ্বিক অর্থিনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসা সময়ের ব্যপার মাত্র । যদি ব্যাংকখাত ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পরস্পর সহযোগী হিসেবে কাজ করে তবে তাঁরা প্রচলিত অর্থনৈতিক বাণিজ্যের ধারাকেই বদলে দেবে নিঃসন্দেহে। সকল জায়ান্টদেরই এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়েই টিকে থাকতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here