চাঁদের সাথে মানুষের জীবন, সভ্যতা, ধর্ম ও সংস্কৃতির অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে

0
516

মো. মাসুদুর রহমান
বিভিন্ন ধর্মমতের সাথে চাঁদ ও পূর্ণিমার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ইসলাম ধর্মেও চাঁদের উপর নির্ভর করেই পবিত্র রমজান ও ঈদ উদযাপিত হয়; যা ব্যাবিলনীয় ক্যালেন্ডার থেকে আলাদা (প্রচলিত ভাষায় ব্যাবিলনীয় ক্যালেন্ডার, ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসেবে আমাদের দেশে প্রচলিত; যা সূর্য ঘূর্ণনের সাথে সম্পর্কযুক্ত)। নব চাঁদ বা হিলালের (চাঁদের অংশ দেখার) উপর নির্ভর করেই ইসলামিক চান্দ্র মাসের বর্তমান কাঠামো সাজানো। ইসলাম ধর্মের সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত (সমস্ত নবি-রাসুলের বেলায়েত লাভকারী) মহান সংস্কারক যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান কর্তৃক প্রণীত অষ্টবর্ষ চন্দ্র পঞ্চিকা যা সূর্য ঘূর্ণনের ক্যালেন্ডার থেকে বেশি নির্ভুল। এই চন্দ্র পঞ্জিকা চাঁদের অংশ বা হিলাল-এর উপর নির্ভর করে প্রণয়ন করা হয়নি। বরং চাঁদের ঘূর্ণনের উপর নির্ভর করে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি নির্ভুল ক্যালেন্ডার হিসেবে বিবেচিত। সেই সময় বেশি দূরে নয়, যখন এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা তাদের নির্ভূল বৈজ্ঞানিক সময় ব্যবহারকল্পে (উঁৎধঃরড়হ ড়ভ ঃরসব ঃধনষব সধপযরহব) অষ্টবর্ষ চন্দ্র পঞ্জিকা ব্যবহার করবে।

নৃতাত্ত্বিক প্রায় সব ধর্মেই চাঁদের প্রতিকী ব্যবহার পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, মায়া সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, আব্রাহামিক ধর্মেও চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই বাংলায়ও পূর্ণিমার বিভিন্ন নাম আছে, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আবহমান কাল থেকে বাংলার জীবন বৈচিত্রে যুগ যুগ ধরে বহমান রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত জুন মাসের পূর্ণিমাকে এই বাংলার চিরায়িত ভাষায় আষাঢ়ী পূর্ণিমা বলা হয়, কেউ কেউ এই পূর্ণিমাকে ‘গুরু পূর্ণিমা’ও বলে। পাশ্চাত্য দর্শনে এই পূর্ণিমাকে স্ট্রবেরি মুন (ঝঃৎধনিবৎৎু গড়ড়হ) বলা হয়। পাশ্চাত্যে ইংরেজি বিভিন্ন মাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পূর্ণিমারও ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসের পূর্ণিমাকে ওলফ মুন (ডড়ষভ গড়ড়হ), ফেব্রুয়ারি মাসে স্নো মুন (ঝহড়ি গড়ড়হ), মার্চ মাসে ওয়ার্ম মুন (ডড়ৎস গড়ড়হ), এপ্রিল মাসে পিংক মুন (চরহশ গড়ড়হ), মে মাসে ফ্লাওয়ার মুন (ঋষড়বিৎ গড়ড়হ), জুন মাসে স্ট্রবেরি মুন (ঝঃৎধনিবৎৎু গড়ড়হ), জুলাই মাসে বাক মুন (ইঁপশ গড়ড়হ), আগস্ট মাসে স্টারজন মুন (ঝঃঁৎমবড়হ গড়ড়হ), সেপ্টেম্বর মাসে কর্ন মুন (ঈড়ৎহ গড়ড়হ), অক্টোবর মাসে হারভেস্ট মুন (ঐধৎাবংঃ গড়ড়হ), নভেম্বর মাসে বিভার মুন (ইবধাবৎ গড়ড়হ) এবং ডিসেম্বর মাসে কোল্ড মুন (ঈড়ষফ গড়ড়হ) নামকরণ করা হয়। এছাড়াও রয়েছে ব্লাড মুন, সুপারমুন, ব্লু মুন যা পূর্র্ণিমার অসংখ্য রূপ। প্রত্যেকটি রূপে রয়েছে আলাদা আলাদা কার্যকারীতা, যা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে প্রণিধানযোগ্য।

মেক্সিকান আদিবাসীরা আরোগ্যের জন্য ‘মুন ড্যান্স’ উদযাপন করে। সনাতন ধর্মেও আনন্দ ও সমৃদ্ধির জন্যে পূর্র্ণিমার রাতে সমবেত হয়ে প্রার্থনার প্রথা রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক পৌত্তলিক ধর্মেও চন্দ্রদেবীর পূজা হতো। তাছাড়া পূর্র্ণিমার রাতে জন্ম হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ যে ধর্মের বিশ্বাসী, সেই বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের। গৌতম বুদ্ধের গৃহত্যাগ, বোধিলাভ, ধর্মোপদেশ, সব কিছুই পূর্র্ণিমার চাঁদের উপর নির্ভর করে আবর্তিত হয়েছে। বোধিজ্ঞান (ঊহষরমযঃবহবফ) প্রাপ্ত হওয়ার পর গৌতম বুদ্ধ এই আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় তিনি প্রথম বোধিত্ব লাভ করেন।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ মানুষের মনের অন্ধকারকে দূর করে অন্তরে আলো জ্বালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে যিনি অন্ধকার থেকে শিষ্যকে আলোর পথে নিয়ে যান তাঁকেই গুরু বলা হয়। যাকে ইসলামি পরিভাষায় মোর্শেদ (ঝঢ়রৎরঃঁধষ এঁরফব) বলে। যিনি মনের অন্ধকারকে দূর করে শিষ্যকে আলোর পথ দেখান। সেই গুরুকে মনের গহীনে উপবিষ্ট করে আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করতে হয় আষাঢ় মাসের পূর্ণিমাতে। তাই আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে ‘গুরু পূর্ণিমা’ বলা হয়।

বর্তমান যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের সান্নিধ্যে এসে সাধারণ মানুষ হৃদয়ে আল্লাহর নুর প্রজ্বলিত করে আদর্শ চরিত্রবান হওয়ার শিক্ষা অর্জন করছেন। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করলে মহান আল্লাহ ও হযরত রাসুল (স.)-কে পাওয়ার জন্য কাউকে গৃহত্যাগ করতে হয় না। বরং এই সমাজে বসবাস করেই তাঁর নির্দেশিত শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে আলোকিত হওয়া সম্ভব।

পানির প্রবাহের উপর চাঁদের নিয়ন্ত্রণের কথা প্রাচীন ভারতীয় বিশ্বাসেও (অন্যান্য বিশ্বাসও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত) আছে। আধুনিক বিজ্ঞানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা নদী প্রবাহ ইত্যাদির উপর চাঁদের প্রভাব আধুনিক বিজ্ঞান-সহ সর্বমহলে স্বীকৃত। এমনকি মানুষের উপরেও চাঁদের প্রভাবের কথা প্রচলিত আছে। আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা এই কথা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার দ্বারা সমুদ্রের জোয়ার ভাটা নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষ, বিভিন্ন প্রাণী এমনকি উদ্ভিদের উপরেও পূর্ণিমার প্রভাব পড়ে। জোয়ার ভাটার মতো মানুষের মন মানসিকতা পূর্ণিমার জোৎস্না দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। এর কারণ হলো- মানুষের শরীরের প্রায় ৭০ ভাগ জলীয়। পূর্ণিমার সময়ে মানুষের শরীরের এই জলীয় দ্রবণ মুক্তভাবে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে পূর্ণিমার সময়ে মানুষের প্রাণ চাঞ্চল্যতা বৃদ্ধি পায়। পূর্ণিমার প্রভাবের কারণে মানুষের শরীর এবং মনেও শুরু হয় জোয়ার ভাটা। আশ্চর্য ব্যাপার হলো পূর্ণিমার সময়ে অনেক শস্যের ভালো ফলন হয়। তাছাড়া মানুষের আত্মিক মুক্তির সাথে চাঁদের তথা পূর্ণিমার একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। অনেক দেশে অমাবশ্যা- পূর্ণিমায় সাধারণ ছুটি পালিত হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানের পালনের নিমিত্তে।

আবহমান কাল হতে সাহিত্যের একটি বড়ো অংশ আবর্তিত হয়েছে এই পূর্ণিমার চাঁদকে নিয়ে। বিশ্ব সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদের সাথে জীবন-মৃত্যু, প্রেম ভালোবাসা এবং মান ও অভিমানের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যা বিভিন্ন সময়ে প্রতিফলিত হয়েছে এই বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি সাহিত্যিক কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাসের লেখায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র হুমায়ুন আহমেদের লিখনিতেও তা প্রস্ফুটিত হয়েছে। এছাড়া এদেশের গ্রাম বাংলার মায়েরা এক সময় একটি কবিতা আবৃত্তি করে কোমলমতি শিশুদের ঘুম পারাতো। কবিতাটি হলো- “আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা”। চাঁদের এই স্নিগ্ধ আলোর কথা বলে নিষ্পাপ শিশুদের ঘুম পাড়ানো হতো। স্নিগ্ধ ও স্বর্গীয় এই পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মাঝে আছে একটি যাদুকরী ক্ষমতা-যা মানুষকে এনে দেয় স্নিগ্ধ ও শান্ত একটি ভাব। যদিও বিজ্ঞানের ভাষায় যখন সুর্য আর চাঁদ বিপ্রতীপ অবস্থানে থাকে তখন পূর্ণিমা হয়। চাঁদ যেহেতু পৃথিবীর খুব কাছের উপগ্রহ, তাই তার প্রভাব এই পৃথিবীর উপর খুব বেশি। তাই সাধারণ মানুষের জন্য পূর্ণিমার জ্যোৎস্না, এক অবোধ্য চন্দ্রাহত হাতছানি।

বর্তমান বিংশ শতাব্দির প্রথম লগ্নে অর্থ্যাৎ ১০ অক্টোবর, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা- ২৫ আশ্বিন, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ আরবি- ৮ শাওয়াল, ১৪২৯ হিজরি) শুক্রবার দিবাগত রাতে এই বিশ্ববাসী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অবলোকন করেছেন পূর্ণিমার চাঁদে। ঐ দিন রাতে মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের জ্যোতির্ময় চেহারা মোবারক পূর্নিমার চাঁদে প্রকাশ পায়, যা অদ্যাবধি সারা বিশ্বের মানুষ অবলোকন করে ধন্য হচ্ছেন। এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণাকালে দলিল হিসেবে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনে ২টি আয়াত পাওয়া যায় এবং তারই ব্যাখ্যায় হযরত রাসুল (সা.)-এর ৩০টি হাদিস পাওয়া যায় (তথ্য সূত্র: তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী)। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে- চাঁদের মাঝে এই মহামানবের চেহারা মোবারক দেখিয়ে সমগ্র বিশ্বের কাছে মহান সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিন কী প্রমাণ করতে চেয়েছেন? বা আমাদের কাছে কী বার্তা দিতে চাচ্ছেন? তার উত্তরে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মহান রাব্বুল আলামিন এই জগতবাসীকে জানিয়ে দিতে চাচ্ছেন যে, তোমরা যদি আমাকে পেতে চাও তবে পূর্ণিমার চাঁদের মাঝে যাকে দেখছো তাঁর সান্নিধ্যে যাও। তাঁর দীক্ষা গ্রহণ করো। তবেই তোমরা শান্তি পাবে। তবেই তোমরা মুক্তি পাবে।

পরিশেষে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রকৃত স্বরূপ এই ধরাতলে প্রকাশের কারণে পুরস্কারস্বরূপ প্রতি পূর্ণিমার চাঁদে সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান-এর চেহারা মোবারক চাঁদের মাঝে প্রকাশ করে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এই বার্তা দিতে চাচ্ছেন যে, “হে পৃথিবীর মানুষেরা! তোমরা যদি ধর্মের পরিপূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করতে চাও; সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম শিখতে চাও, সমস্ত বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণ পেতে চাও, দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি পেতে চাও তবে শান্তির দূত মুক্তির কান্ডারী হাদিউল ইমাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করো। তাহলেই ধর্মের প্রকৃত স্বাদ লাভ করা সম্ভব। আল্লাহ যেন আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here