চাকরি হারাতে পারেন কয়েক লাখ প্রবাসী

2
491

দেওয়ানবাগ প্রতিবেদক : বিশ্বে করোনাভাইরাসের কারণে কমপক্ষে ৮২টি দেশে সম্পূর্ণ বা আংশিক লকডাউন কার্যকর রয়েছে। লকডাউনের ফলে এসব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো থেকে শুরু করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এর মধ্যেই পূর্বাভাস দিয়েছে, সারা বিশ্বে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশেই ৭৫ ভাগ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি প্রবাসীর মধ্যে মাত্র ২ ভাগ আছেন পেশাজীবী। অর্থাৎ ২ লাখ প্রবাসীর নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে আছেন শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। শ্রমিকদের মধ্যে একটি বড় অংশই চুক্তিহীন। অর্থাৎ তারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শ্রমিকরা পড়েছেন মারাত্মক সংকটে। এখন কাজ না থাকায় প্রতিষ্ঠান থেকেও বেতন পাচ্ছেন না। ওই দেশের সরকারগুলো বা বাংলাদেশ সরকারও তাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মন্দায় অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যয় কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাটাই করতে যাচ্ছে। অনেক প্রবাসী ব্যবসায়ীর ব্যবসা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে কয়েক লাখ প্রবাসী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিমান যোগাযোগ শুরু হলে হয়তো এসব শ্রমিকদের খালি হাতে দেশে ফিরে আসতে হবে।

ওমান থেকে আবু জাফর নামের একজন বাংলাদেশি শ্রমিক বলেছেন, ‘‘লকডাউন শুরুর পরেই মালিক জানিয়ে দিয়েছে, তাদের আর লোক লাগবে না, আমাদের দেশে যেতে বলেছে। অনেক টাকা খরচ করে গতবছর মাত্র এই দেশে এসেছি। এখনো তো দেনাও শোধ হয়নি।’’

সৌদি আরবে ফ্রি ভিসায় গিয়েছিলেন আবু হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই তার কোনো কাজ নেই, তাই কোনো আয়ও নেই। এই মাসে পরিবারের কাছে কোনো টাকাপয়সা পাঠাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘‘এখানে অবস্থা খারাপ দেখছি। অনেক মানুষের কাজ নেই। অনেক কোম্পানি লোক ছাটাই করছে। এখন যে আমরা কিভাবে চলবো, তাই বুঝতে পারছি না।’’

শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় না, ইতালি, ফ্রান্স, সাইপ্রাস, স্পেনের মতো ইউরোপের দেশগুলোয় থাকা অনেক অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিক মানবেতর অবস্থায় পড়েছেন চলমান লকডাউনে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে যাওয়া শ্রমিকরাও ছাটাইয়ের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাংলাদেশি সাংবাদিকরা।

ইতালির ভেনিসে একটি আবাসিক হোটেলের মালিক আবেদ আল মামুন, যার প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন বাংলাদেশি চাকরি করেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে তার প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্রবাসীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, লকডাউন উঠে যাওয়ার পর ব্যবসা বাণিজ্যে একটা মন্দা দেখা দেবে। তখন হয়তো কর্মী ছাটাইয়ের একটা প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তার বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপরে।
লকডাউনের মধ্যেই ওমান থেকে ২০০ বাংলাদেশি কর্মীকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুতির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনও।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) একটি প্রতিবেদনে বলছে যে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আগামী দুই মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছে। এতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় চাকরি হারাতে যাচ্ছে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ।
বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খণ্ডকালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের পেশা কোন না কোনভাবে কোভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশি সংস্থা রামরুর চেয়ারপার্সন তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, বিভিন্ন দেশে ফর্মাল সেক্টরে যারা কাজ করছেন, যাদের সংখ্যা সামান্য, তাদের হয়তো ততোটা সমস্যা হবে না। কিন্তু যারা ফ্রি ভিসায় গেছেন, ছোটখাটো ব্যবসা করেন, ছোট চাকরি করেন, অনিয়মিত শ্রমিক, তারা এখন চরম সংকটে রয়েছেন। আমরা জানতে পেরেছি, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অনেক বাংলাদেশির কোনো কাজ নেই। তাদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে, খালি হাতে দেশে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে। এদের অনেকে মসজিদে গিয়ে থাকছেন, দাতব্য সংস্থার ওপর নির্ভর করে রয়েছেন। এদের ভেতর আবার অনেককে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here