চাল কতটুকু ছাঁটা যাবে বেঁধে দেবে সরকার

0
102


দেওয়ানবাগ প্রতিবদেক: চাহিদার কারণে চাল অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশ করে চিকন বানিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে চালের পুষ্টিগুণ। এই প্রেক্ষাপটে চালের কত অংশ ছাঁটাই করা যাবে তা বেঁধে দিতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য একটি নীতিমালা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ ও সরবরাহ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাজা আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ছাঁটাই নীতিমালার খসড়া প্রণয়নে কাজ করছে।
কৃষিবিজ্ঞানীসহ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাল ছাঁটাই ও পলিশ করে ‘মিনিকেট’ এবং ‘নাজিরশাইল’ করা হয়। ‘মিনিকেট’ ও ‘নাজিরশাইল’ নামে কোনো ধানের জাত নেই। ‘মিনিকেট’ ও ‘নাজিরশাইল’ বানাতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চাল ছাঁটাই করা হচ্ছে। এসব চাল খেয়ে পুষ্টিবঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।


১০ শতাংশের বেশি চাল ছাঁটাই করা উচিত নয় বলেও জানিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।
একই সঙ্গে চালের বস্তায় ধানের জাতের নাম লেখা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও ভাবছে সরকার। এ বিষয়টি ছাঁটাই নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, ‘আমরা চাল ছাঁটাই নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছি। অন্য দেশে ছাঁটাই নীতিমালা আছে কি না কিংবা তারা কতটুকু চাল ছাঁটাই করে, তা দেখা হচ্ছে। ব্রিসহ (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা নীতিমালা তৈরির কাজ করছে। যেটা লজিক্যাল, তারা সেটা করবেন।’


নীতিমালা করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাজা আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। যারা ধান নিয়ে কাজ করেন এমন এক্সপার্টরাও রয়েছেন কমিটিতে।’
তিনি বলেন, ‘ধান বিজ্ঞানীরা বলছেন, ৮ শতাংশ পর্যন্ত চাল ছাঁটাই করলে চালের পুষ্টি উপাদান থাকবে। বেশি করলেই পুষ্টি কমে যাবে। আমরা দেখেছি ঢেঁকিতে ছাঁটা চাল বেশি দিন রাখা যায় না, পোকায় ধরে। তাই সবদিক রক্ষা করেই ছাঁটাই নীতিমালাটি করা হবে।’
‘আমরা ১০ জেলায় একটা স্টাডি করিয়েছিলাম, সেখানে দেখা গেছে মিনিকেট ধানের জাতের চাষ হয়নি কিন্তু মিল ও বাজারে মিনিকেট চাল পাওয়া গেছে। কোনো কোনো জায়গার কৃষকেরা বলেছেন, আমরা মিনিকেট ধান চাষ করেছি। এক মিটিংয়ে একজন বলেছেন, সম্পা কাটারির জাতও তো ব্রি আবিষ্কার করেনি, এটা দেশীয় জাত। ভারতের বর্ডার এলাকায় মিনিকিট করে যে বীজ এসেছিল, স্থানীয়ভাবে সেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে মিনিকিট বা মিনিকেট। স্থানীয় কিছু লোকজন বলছেন, মিনিকেট ধানের জাত আছে, আমরা চাষ করি। কিন্তু মিনিকেট নামে আমাদের ব্রি উদ্ভাবিত কোনো জাত নেই।’
খাদ্য-সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু ব্রি উদ্ভাবিত জাতেরই চাষ হয় না। ট্রাডিশনালি চাষ হয় এমন অনেক জাতও রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে কৃষকরা মিনিকেট জাতের চাষ করে, সেই জাতটা ব্রি উদ্ভাবিত নয়। এটা ভারত থেকে এসেছে।’
নাজমানারা খানুম আরও বলেন, ‘তবে মিনিকেট ধানের জাত থেকে থাকলেও এর চাষ হয় খুবই কম। কিন্তু বাজারে ব্যাপকভাবে মিনিকেট পাওয়া যায়। ওই পরিমাণ তো বাংলাদেশে চাষ হয় না। ধরে নিলাম, ৫ শতাংশ মিনিকেট ধানের চাষ হয় কিন্তু বাজারে চালের ৫০-৬০ শতাংশই মিনিকেট। নিশ্চয়ই অন্য জাতের চালকে মিনিকেট নামে চালানো হচ্ছে।’


তিনি বলেন, ‘চালের ব্র্যান্ড নাম যাই হোক, আমরা চাই বস্তায় ধানের জাতের নামটা থাকুক। কিন্তু একটা সমস্যাও আছে। কৃষক অনেক সময় ধানের কোনো নির্দিষ্ট জাত সংরক্ষণ করে না। মোটা, চিকন ও মাঝারি- এই তিন ধরনের ধান আলাদা আলাদা করে রাখেন। কিন্তু জাতভেদে অনেক সময় রাখেন না। তখন মিলাররা এই ধান কিনে বস্তায় জাতের নামটা কীভাবে লিখবেন? আমরা কৌশল বের করছি, কীভাবে কী করা যায়।’
চাল অতিরিক্ত ছাঁটাই করার কারণে আমরা সবাই ভুগছি মন্তব্য করে খাদ্য-সচিব বলেন, ‘মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। আমরা বিদেশ থেকে পুষ্টিচাল এনে খাওয়াচ্ছি। আমি যদি আমার চালের পুষ্টিটা ধরে রাখতে পারি, তাতে আমাদের অনেক উপকার হবে।’
ছাঁটাই নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘একটা বিষয় নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে- আমরা মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে চাল খাচ্ছি কিন্তু এ নামে কোনো ধানের জাত নেই। মূলত আমাদের যে জাতগুলো আছে, সেগুলো কেটে-ছেঁটে বা পলিশ করে চাল করা হচ্ছে। এতে আমাদের চালের যে পুষ্টির পরিমাণ তা কমে যাচ্ছে বা থাকছে না। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘ছাঁটাই নীতিমালায় আমরা বলে দেবো, আপনি কতটুকু ছাঁটাই করবেন। আমরা বলছি, সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশের বেশি চাল ছাঁটাই করা যাবে না। এটা মেইনটেইন করা গেলে চালের স্বাদ ও পুষ্টি ঠিক থাকবে।’


শুধু আমাদের দেশেই নয়, ভারতেও মিনিকেট নামে কোনো জাত নেই দাবি করে ব্রির মহাপরিচালক বলেন, ‘মিনিকেট হলো একটা টুল, ভারতে চালু হয়েছিল। এ ধরনের কোনো জাত বাংলাদেশে অতীতেও ছিল না। বাজারজাতকরণের জন্য তারা বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি দিয়ে একটা কিট চালু করেছিল। সেই অনুসারে এটা মিনিকেট। এখন ওই নামেই একটা চাল ব্র্যান্ডিং করে ফেলেছে। মূলত ব্রি-২৮, ব্রি-২৯সহ অন্যান্য চাল কেটে মিনিকেট করা হয়।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here