চীনা সাহিত্যের উৎস কথা

0
36


শাহাজাদা বসুনিয়া
চীনা সাহিত্য বৈচিত্র্যময়। চীনের কলিযুগে প্রায় পাঁচটি বংশ যেমন-চীন, হ্যান, তাঙ, সুঙ এবং মিঙ হচ্ছে খাঁটি স্বদেশি বংশ। তবে মিঙ বংশের পূর্বে মোগল বংশ এবং পরে মাঞ্চু হলো বিদেশি বংশ। ওই দুই আমলে চীনারা বিজিত জাতি ছিল। তাই চীনা রাজবংশগুলোর মধ্যে পাঁচটি স্বদেশি এবং দুটি বিদেশি বংশ চিরস্মরণীয়। এ ছাড়া উপজাতিগুলো তো রয়েছেই। যা হোক, সমগ্র চীনে কর্তৃত্ব করা কোনো বংশেরই নৃপতির পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে বহুবার চীন ভেঙেছে, চীনের ভেতর অসংখ্য ঘরোয়া লড়াই হয়েছে, বিদ্রোহ-দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটেছে। অখন্ড চীনের সাম্রাজ্য-ভোগ বেশিসংখ্যক নরপতির কপালে জোটেনি। তবে চীন, হ্যান ও তাঙ-ওই তিন বংশের কয়েকজন সম্রাট সত্যসত্যই চীনেশ্বর ছিলেন এবং তাদের রাজকবি ও রাজলেখকও ছিল। যারা চলমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা সাহিত্যে তুলে ধরেছিলেন।


চীনা সভ্যতার বিকাশ মূলত দ্বাদশ শতাব্দীর সুঙ আমলেই দৃশ্যনীয়। চীনের দ্বাদশ শতাব্দী অগস্টান বা স্বর্ণযুগ হিসাবে পরিচিত। পাঁচটি বংশের মধ্যে চীন বংশ হোয়াং হো এবং ইয়াংসি নদীদ্বয়ের মধ্যবর্তী সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছিল। হ্যান বংশ চীনের সব বিভাগে শ্রীবৃদ্ধি করেছিল। ফলে চীনারা অনেক সময় নিজেদের হ্যান-সন্তান বলতে গর্ববোধ করেন। তাঙ ও সুঙ আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ঝড় উঠেছিল। ওই যুগ মাৎস্যন্যায় নিবারিত হয়েছিল। শি-হোয়াংতি এবং হ্যান-উতির গৌরবময় যুগ ফিরে এসেছিল। সমগ্র চীনমন্ডল অখন্ড সাম্রাজ্যে পরিচিত হয়েছিল।


পরম্পরা ও পরিবর্তনের জন্য চীন সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়গুলো ভিন্নতর। ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ হলো চীনের হৃৎপিন্ড। ঐতিহ্য, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র-এই তিনটি দিক বিভিন্ন রূপে চীন সাহিত্যে বিধৃত। উল্লেখ্য, চীনারা বিশ্বাস করে যে, চীনই বিশ্ব সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু, চীন থেকেই সভ্যতার আলো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বিদেশনীতির পরম্পরায় চীনে এসেছিল পশ্চিমা অভিঘাত, বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন। যেমন-তাই-পিং বিপ্লব, অহিফেন যুদ্ধ থেকে বকসার বিদ্রোহ পর্যন্ত চীনে যে ইতিহাস প্রসারিত, ওটাকে পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাব ও চীনা প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্যাপক পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হয়েছিল।


উনিশ শতকের শেষার্ধে চীনের সামগ্রিক আচরণ অনুধ্যেয়। সামগ্রিক আচরণের মধ্যে তাই-পিং বিদ্রোহ, সংস্কার আন্দোলন, খ্রিষ্টান মিশনারিবিরোধী আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। বংশ পরম্পরায় সুদূর অতীত থেকে চীনে বিভিন্ন ধরনের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে; কখনো বিদেশি, আবার কখনো আঞ্চলিক। কারণগুলো মূলত আমলাতন্ত্রের মধ্যে দুর্নীতি, কর আদায়ের চাপ, মাত্রাধিক খাজনা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অবিচার এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা। অহিফেন যুদ্ধোত্তর চীনে অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। ছড়িয়ে পড়েছিল অরাজকতা। উনিশ শতকে চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে চীনাদের লড়তে হয়েছিল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। অরাজকতা ও অস্থিরতায় নতুন রাজবংশ নেতৃত্ব দিয়েছিল। তারা ছিলেন তিয়েন-ওয়াং। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নারীদেরও সমানভাবে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। আইনের মাধ্যমে মেয়েদের পা বেঁধে রাখা, গণিকাবৃত্তি ও পুরুষদের একাধিক স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল ব্যক্তিগত সম্পদ-সম্পত্তি। ওই বিপ্লব মূলত তাই-পিং বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ। বিদ্রোহীরা আকৃষ্ট হয়েছিল খ্রিষ্টধর্মে। ওই আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল খ্রিষ্টান মিশনারি আন্দোলন। চার্চ পুড়িয়ে দেওয়া, আবাসন ধ্বংস করা, দেশি-বিদেশি খ্রিষ্টান নিধন করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।


রাজনৈতিক অবস্থা থেকেই চীনারা বিদেশি-বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব তৈরি করেছিল। শিক্ষিত চীনাদের মনে জেগেছিল ঘৃণা-মিশ্রিত বিদেশি বৈরিতা। শঙ্কা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল। চীনাদের মধ্যে এবং জাতীয় আন্দোলনের পথ হয়েছিল প্রশস্ত। চীন প্রজাতন্ত্রের বিদেশি প্রভাবে সার্বভৌমত্ব বহুলাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। সর্বত্রই বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের প্রতাপ ছিল অলঙ্ঘনীয়। ফলে জাতীয়তাবোধের চেতনা চীনাদের সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছিল, যেহেতু স্বাধীনতা বা জাতীয়তাবাদের মূল কথা জাতিগত ঐক্যে বিধৃত ছিল।


প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লব ১৯১১। যার ফলে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলো। চিং রাজবংশের পতন ঘটল। চীনে শহর, জেলা, প্রদেশ ও জাতীয় স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিমূলক সংগঠন সৃষ্টি হয়েছিল। ওই বিপ্লবে বিপ্লবীরা শুধু মাঞ্চু রাজবংশবিরোধী সংগ্রামেই নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। ফলে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ওই সংগ্রাম নিভে গিয়েছিল। বিপ্লবীদের স্বতন্ত্র মতবাদ ও পন্থার প্রয়োজনীয়তাও থাকল না। অর্থাৎ কোনো সমস্যার সমাধান হলো না। কিন্তু বিশৃঙ্খল অশান্ত পরিবেশ বিপ্লবীরা অনেক শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। তার পর ‘মে ফোর্থ’ আন্দোলনের জন্য চীনের জাতীয় জীবনে দিনবদলের পালা শুরু হয়েছিল।


১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের সরাসরি প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। জাতীয় শিল্পের বিকশিত রূপ পরিলক্ষিত হয়েছিল। জাতীয় বুর্জোয়া ও শ্রমিকশ্রেণির আবির্ভাব ঘটেছিল। ওই সময়কে মূলত শ্রমিক আন্দোলনের সূচনাকাল বলা হতো। চীনা বুর্জোয়া নেতৃত্বেই শ্রমিক আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। গণসমর্থন পেয়েছিল চীনা বুর্জোয়ারা। ওই সময় সাংস্কৃতিক আত্মগরিমায় চীনের ছাত্রসমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে তাদের নিবিড় পরিচয় ঘটেছিল। টলস্টয়, বারনার্ড শ, ইবসেন প্রভৃতি সাহিত্যিকের গ্রন্থাবলি তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল।


উল্লেখ যে, ‘মে ফোর্থ’ আন্দোলনে পিকিংয়ে ছাত্ররা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, ছোটো বড়ো শিল্পপতি আর শ্রমিকশ্রেণি। সত্যিকার অর্থে ‘মে ফোর্থ’ আন্দোলনকে চীনের যুগ সন্ধিক্ষণ বলা হয়। ওই কালসন্ধিই ছিল চীনের আধুনিক যুগ এবং ওই আধুনিক যুগের প্রধান স্তম্ভই ছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। ব্যক্তিমালিকনা উচ্ছেদের স্লোগান মুখরিত হলো যা মানুষের মনকে স্পর্শ করেছিল, ধনতন্ত্রের সর্বশেষ স্তর পরিলক্ষিত হয়েছিল এবং সাংহাইয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল। চীনের বিখ্যাত সাহিত্যিক কুয়ো মো-জো মন্তব্য করেন যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রচার সাহিত্য সাধনার মহৎ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। চীনারা তখন জাপানবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ছিল। মার্কসবাদ-লেলিনবাদ নয় বরং চীনারা জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ছিল। তারপর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘লং মার্চ’। লং মার্চের সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী ও সাম্যবাদী আদর্শের মহামিলন ঘটেছিল। শুধু চীনা ইতিহাসে নয় বরং চীনা সাহিত্যে লং মার্চ চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পথ প্রসারিত হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে চীনের রূপান্তর যেমন চমকপ্রদ ছিল, তেমনই বিতর্কমূলক। অধিকাংশ কমিউন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, পারিবারিক খেত-খামার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খোলাবাজার গড়ে তোলা হয়েছিল।


চীনের সিংহভাগ অঞ্চল পাহাড়-পর্বতে ভরা, পাথরের উপরিভাগে জনবসতি রয়েছে। নদ-নদীর তীরে এবং উপত্যকাগুলোয় জনগণ বাস করত। সে জন্যই চীন দেশের সভ্যতাকে নদ-নদী ও উপত্যকা সভ্যতা বলা হয়ে থাকে। ইয়াংসী নদী, ওই নদীতে নৌকা চলত বিপুলসংখ্যক। চীনের উপত্যকা অঞ্চলে বিশেষ করে লিয়াংশান পর্বতমালায় উপজাতিরা বাস করতেন। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সিচুয়ান ও ইউনান প্রদেশের দুর্গম পর্বতমালায় ইয়ে এবং নকশি উপজাতির বসতি।


উল্লিখিত রাজবংশ, সাম্রাজ্যবাদ, সমাজতন্ত্রবাদ, সামন্তবাদ, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত-উপত্যকা, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহ, আন্দোলন-প্রতিবাদ, সমাজতন্ত্রের হেরফের, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সংস্কার, বঞ্চিত চীনাদের হাহাকার, দাসপ্রথার কশাঘাত ও সামাজিক প্রথার প্রভাব ইত্যাদি বিষয়াদি চীনা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাহাড়ের শোভা, বাঁশের সারি বা ঝোপ চীনারা পছন্দ করতেন। মাছ ধরা এবং শিকার করার শখ চীনা জীবনের বড়ো খেয়াল। শরতের পদ্ম ও কুমুদ, সূর্যাস্তের গোলাপি রং, জলাশয়ে গিরিশৃঙ্গের প্রতিবিম্ব, রাতে পেঁচার ডাক, নদীতে নৌকার সারি ইত্যাদি চীনা সাহিত্যে প্রস্ফুটিত হয়েছে। চীনাদের প্রেমসাহিত্য মধুময় ছন্দে লিখিত। চীনা সমাজে বিবাহ নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতো। কারণ প্রেমে অবাধ গতি ছিল না। যে কোনো বংশের পুরুষ যে কোনো বংশের কন্যাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে পারত না। ভালোবাসার টানে গোত্র ভিন্ন প্রেম বা বিবাহ সম্পন্ন হলে বিষাদ, আত্মহত্যা, পলায়নসহ অনেক বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটত। অর্থাৎ বিভ্রাটের ট্র্যাজেডি ঘটত।


চীনা সাহিত্য বহুবিধ ধারায় প্লাবিত। হয়তোবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চীন ভ্রমণের স্মৃতি নিম্নরূপে তার কবিতায় প্রকাশ করেছেন :
একদা গিয়েছি চীন দেশে,
অচেনা যাহারা
ললাটে দিয়েছে চিহ্ন তুমি আমাদের চেনা বলে।
খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের দেশ;
দেখা দিয়েছি তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ,
অভাবিত পরিচয়ে
আনন্দের বাঁধ দিল খুলে।
ধরিনু চীনের নাম, পরিনু চীনের বেশবাস
একথা বুঝিনু মনে,
যেখানে বন্ধু পাই সেখানেই নবজন্ম ঘটে।


চীনা সাহিত্যের মূল্যায়ন এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, বিদেশি ভাষায় চীনা সাহিত্য খুব কম অনূদিত হয়েছে। সাহিত্য হিসাবে চীনা সাহিত্যে যেসব উপজীব্য বিষয় বিধৃত রয়েছে তা আর্থ-সামাজিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নিঃসন্দেহে। পৃথিবীজুড়ে নকড়াছকড়া সাহিত্যিকদের নিয়ে প্রচার-প্রসারে কতই না মাতামাতি, অথচ চীনা সাহিত্যে লীপো-তুঁফুকে নিয়ে মাতামাতির ভীষণ অভাব, তবে চীন সরকার তাদের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। বিশ্ব সাহিত্যে আজ না হোক, কাল অবশ্যই চীনা সাহিত্য মূল্যায়িত হবে নিঃসন্দেহে। চীনা সাহিত্যের বিজয় অনিবার্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here