চীনে বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্য প্রবেশ করবে বিনা শুল্কে

0
280

দেওয়ানবাগ প্রতিবেদক: চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১টি পণ্যের শুল্ক মুক্ত রপ্তানির সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে চীনের বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের ৯৭ শতাংশই শুল্ক মুক্ত প্রবেশের সুবিধা পেল। আগামী ১ জুলাই থেকে এ ঘোষণা কার্যকর হবে বলে বাংলাদেশকে জানিয়েছে চীন কর্তৃপক্ষ। ১৮ জুন সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানায় চীনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক কূটনীতি চালু করেছে, এটা সেদিক থেকে  খুব বড় একটা অর্জন। চীন সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশ যত পণ্য পাঠাবে তার ৯৭ শতাংশই শুল্ক মুক্ত সুবিধা পাবে। এটাকে এক অর্থে শত ভাগ শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধাও বলা যায়। কারণ বাংলাদেশ থেকে যত ধরনের পণ্য চীনে রপ্তানি হয় তার মধ্যে মাত্র তিনটি বাদে সবই বিনা শুল্কে চীনের বাজারে ঢুকতে পারবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, অর্থনৈতিক কূটনীতি এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে আরও বড় বড় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য এ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে। এ তথ্য উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনের নেতৃত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে চীনের সঙ্গে বিনিময়পত্র বা লেটার অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘ সমঝোতার পর ১৬ জুন চীন বাংলাদেশকে শর্তহীনভাবে ৯৭ শতাংশ পণ্যে অর্থাৎ মোট ৮ হাজার ২৫৬টি এইচএসকোড শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদান করে আদেশ জারি করে। ফলে চীনের বাজারে বাংলাদেশের সব সম্ভাবনাময় পণ্য শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় একপক্ষীয়ভাবে বা ইউনিল্যাটারালি স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে এ সুবিধা প্রদান করায় বাংলাদেশকে এর বিপরীতে কোনো ছাড় দিতে হবে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করে, চীন ১৪০ কোটি জনসংখ্যার একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে এ দেশের জনগণের ক্রয় ক্ষমতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, একইভাবে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের বাজারে ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার সুবিধা পেলে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতাসম্পন্ন প্রায় সব পণ্য চীনে শুল্কমুক্ত কোটামুক্তভাবে প্রবেশের সুবিধা পাবে। ফলে চীনে রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়, যা বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ভুটান, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে পিটিএ চূড়ান্তকরণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার মার্কোসার জোটের দেশগুলো ও পূর্ব ইউরোপের বাণিজ্য জোটের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা চলছে।

চীন ১ জুলাই থেকে এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) বাজার প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদানের কথা জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, প্রাথমিকভাবে এ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশসহ ৩৩টি স্বল্পোন্নত দেশের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, তাদেরকে চীনের ৬০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়। কিন্তু চীনের দেয়া এ সুবিধা বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতার অনুকূল কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা আছে এমন অনেক পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের জন্য রফতানি সম্ভাবনাময় পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদানের জন্য চীনকে অনুরোধ করে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যদিও চীন ২০১৩ সালে শুল্কমুক্ত সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৪০টিতে উন্নীত করে। এর মধ্যে ২৪টি স্বল্পোন্নত দেশ যারা ১ জানুয়ারি ২০১৫-এর আগে চীনের সঙ্গে লেটার অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর করেছে, তারা ৯৭ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে, ১২টি স্বল্পোন্নত দেশ যারা ১ জানুয়ারি ২০১৫-এর পরে লেটার অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর করেছে, তারা ৯৫ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে এবং বাংলাদেশ ও মৌরিতানিয়া মাত্র ৬০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে এ সুবিধা পেয়ে আসছিল। বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে চীন অবহিত করে যে, লেটার অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ৯৭ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। তবে শর্তারোপ করে যে, স্বল্পোন্নত দেশকে দেয়া সুবিধা গ্রহণ করলে বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের (এপিটিএ) আওতায় স্বল্পোন্নত দেশের জন্য বিদ্যমান সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না।

এপিটিএর আওতায় শুল্ক সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য মূল্য সংযোজনের হার ৩৫ শতাংশ হলেও স্বল্পোন্নত দেশের জন্য চীনের প্রদত্ত শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় মূল্য সংযোজনের হার ৪০ শতাংশ। চীনের আরোপিত শর্ত মেনে স্বল্পোন্নত দেশের জন্য প্রদত্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করবে কিনা সে বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের মতামত গ্রহণ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের জন্য প্রদত্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণের জন্য চীনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। দীর্ঘ সমঝোতার পর গত ১৬ জুন চীন বাংলাদেশকে শর্তহীনভাবে ৯৭ শতাংশ পণ্যে অর্থাৎ মোট ৮ হাজার ২৫৬টি এইচএসকোড শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদান করে আদেশ জারি করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here