জরায়ুর মুখে ক্যানসারে আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশ বাল্যবিবাহের শিকার

0
19

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: মাত্র ৩৯ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন গাইবান্ধার কামারপাড়ার বাসিন্দা বিলকিস আক্তার। তার জরায়ুর মুখে ক্যানসার চতুর্থ স্তরে ধরা পড়ে মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তবে পরিবারের কেউ বিষয়টি আমলে নেয়নি। ফলে তিন কন্যাসন্তান রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো তাকে।


বিলকিসের কন্যারা মায়ের চলে যাওয়ার বিষয়টি মাসখানেক আগেই নিশ্চিত হয়েছিলেন। ফলে তাদের চোখের পানি অনেকটা শুকিয়ে গেছে বলে জানান বিলকিসের স্বামী মাদ্রাসাশিক্ষক আব্দুল বাকী মিয়া। তিনি বলেন, ‘১২-১৩ বছর বয়সে তাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলাম। সবকিছু নিজ হাতে শিখিয়ে-পড়িয়েছি। বিলকিস আমাদের বাড়ির শুধু বউ নয়, মেয়ে হয়ে উঠেছিল। কিন্তু নিজের সমস্যার কথা কখনো মুখ ফুটে বলত না। খুব চাপা স্বভাবের মেয়ে ছিল…।’ জরায়ুর মুখে ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের ৬৪ শতাংশই মারা যান।


ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের (আইএআরসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের পরই জরায়ু মুখের ক্যানসারের অবস্থান। প্রতি বছর এই রোগে ৮ হাজার ৬৮ জন নারী নতুন করে আক্রান্ত হন, যা নারী ক্যানসার রোগীর প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে মারা যান ৫ হাজার ২১৪ জন। জরায়ু মুখের ক্যানসারে আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। ফলে দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে সচেতনতা বাড়াতে জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে পারলেই অনেক নারীকে এই জরায়ু মুখের ক্যানসার থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


তারা আরও বলেন, বিশ্বে জরায়ু মুখের ক্যানসারে আক্রান্তের প্রধান কারণ ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)’ হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহই এই রোগে আক্রান্তের অন্যতম কারণ। জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে তিন বছর পর পর ভায়া টেস্ট করানো জরুরি। এই টেস্ট দেশের সরকারি সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিনা মূল্যে করানো হয়। তবে যারা বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে সন্তান জন্মদান করেন, তারা জরায়ু মুখে ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকেন। কিশোরী বয়সে জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন নিলে এবং নিয়মিত টেস্টের মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিকে শনাক্ত করতে পারলে রোগী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।


বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সালে গাজীপুর জেলায় ১০ বছর বয়সী প্রায় ৩১ হাজার কিশোরীকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়। সারা দেশে এই কার্যক্রম এ বছর শুরু হওয়ার কথা। ২০০৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে জরায়ু মুখের ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের যে কর্মসূচি চালু হয়, পরবর্তী সময়ে সরকার এই উদ্যোগে অর্থায়ন করে, ১৫ বছরে তা লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশের নিচে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।


বাংলাদেশের এমন পরিস্থিতিতে জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার পালিত হয়েছে জরায়ুমুখে ক্যানসার সচেতনতা দিবস-২০২২। তবে পুরো জানুয়ারি মাসে চলছে ‘আন্তর্জাতিক জরায়ুমুখে ক্যানসার সচেতনতা মাস’। এ বছর দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে-‘আপনার কিশোরী কন্যাকে এইচপিভি টিকা দিন’।

গত ৮ জানুয়ারি শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ‘জরায়ুমুখের ক্যানসার নির্মূলে বৈশ্বিক কৌশল: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ বিষয়ক আলোচনাসভা ও ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ শিরোনামে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা ও লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পালন করা হবে। জানুয়ারি মাসকে আন্তর্জাতিক জরায়ুমুখে ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালনের পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে জরায়ুমুখের ক্যানসার সচেতনতা দিবস পালন করে আসছে ‘মার্চ ফর মাদার’ (জননীর জন্য পদযাত্রা) নামের প্ল্যাটফরমটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here