জাতীয় শিক্ষক দিবসের ইতিকথা

1
244

আবুল কালাম আজাদ খান

শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস যা বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পৃথিবীর ১০০টি দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হয়। এদিন শিক্ষকদেরকে তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়। শিক্ষক আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষক ছাড়া যোগ্য সমাজ ও উজ্জ্বল জীবন কল্পনাতীত।     

পেশাজীবন কেবল একটি চাকরির ক্ষেত্রে সীমিত হলেও, একজন মানুষের জীবনে আদর্শবান শিক্ষকদের গুরুত্ব অপরিসীম।

শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে কিছু অনুপ্রেরণীয় উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

* একটি শিশুকে শিক্ষিত করে তোলা একটি বড়ো কাজ এবং সঠিকভাবে বলতে গেলে, একটি রাষ্ট্র শাসনের চেয়েও বড়ো কাজ। – উইলিয়াম এলারারি চ্যানিং, প্রচারক এবং ধর্মতত্ত্ববিদ

* বেশিরভাগ লোককে বড়োজোর ৫ থেকে ৬ জনের বেশি স্মরণ করে না, কিন্তু একজন শিক্ষককে হাজার হাজার মানুষ আজীবন স্মরণ করে। – এ্যান্ডি রনি, সাংবাদিক

* ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষকদের প্রতি লোকেরা সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায় তাদের প্রতি, যারা আমাদের মানবিক অনুভূতিকে স্পর্শ করে। পাঠ্যক্রমটি নিতান্তই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, কিন্তু আন্তরিকতা একটি ক্রমবর্ধমান উদ্ভিদ এবং একটি শিশুর আত্মার জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।- কার্ল জং, সুইস মনোবিজ্ঞানী

* আপনি যদি কাউকে পছন্দের তালিকায় রাখতে চান, তাহলে শিক্ষকদের রাখুন, তারা সমাজের নায়ক।

-গাই কাওয়াসাকি, সিলিকন-উপত্যকা ভিত্তিক একজন লেখক, স্পিকার, উদ্যোক্তা এবং ধর্মপ্রচারক

উল্লিখিত উক্তিগুলোর মাধ্যমে সমাজে একজন আদর্শবান শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। তাই শিক্ষক দিবসকে বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের ১০০টি দেশে পালিত হয়ে থাকে।

প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্ব^র ভারত শিক্ষক দিবস পালন করে এবং সেই দিনেই ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬২ সালে ছাত্রদের অনুরোধে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রথম শিক্ষক দিবস অনুষ্ঠান পালন করার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান ব্যক্তি ও উপদেষ্টা। ভারতবর্ষের সকল বিদ্যার্থী তাকে সম্মান জানানোর জন্য আজকের দিনে শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে।

রাধাকৃষ্ণাণ স্বাধীন ভারতের  প্রথম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৫২-১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি (১৯৬২-৬৭) ছিলেন। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। ড. রাধাকৃষ্ণাণ [৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৮-১৭ এপ্রিল, ১৯৭৫] তামিলনাডুর তিরুট্টানিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইংরেজি শিক্ষা ও স্কুলে যাওয়ার বিরোধী ছিলেন। ড. রাধাকৃষ্ণাণের বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পুরোহিত হোক। মেধাবী রাধাকৃষ্ণাণ নিজের অধিকাংশ পড়াশোনাই ছাত্রবৃত্তির সাহায্যে পুরো করেছিলেন। রাধাকৃষ্ণাণ পড়ুয়াদের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তার কলকাতা যাওয়ার সময় তাকে ফুলে সাজানো গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেল স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রখ্যাত অধ্যাপক এইচ. এন. স্পেলডিঙ্গ ড. রাধাকৃষ্ণাণের ভাষণে এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জন্য চেয়ার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব যোগদানের জন্য ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে।

একাধারে রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও অধ্যাপক এই শান্ত মানুষটি ছাত্রজীবনে অতি মেধাবী ছিলেন। জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে তার ছাত্র জীবন এগিয়ে চলে। ১৯০৫ সালে তিনি মাদ্রাজ খ্রিষ্টান কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার বিষয়টি ছিল ‘বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা’। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না। দূর সম্পর্কের এক দাদার কাছ থেকে দর্শনের বই পান এবং তখনই ঠিক করেন তিনি দর্শন নিয়ে পড়বেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার জন্য তিনি ‘বেদান্ত দর্শনের বিমুর্ত পূর্বকল্পনা’ বিষয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন। তিনি ভেবেছিলেন তার  গবেষণামূলক প্রবন্ধ দর্শনের অধ্যাপক বাতিল করে দেবেন। কিন্তু অধ্যাপক অ্যালফ্রেড জর্জ হগ তার প্রবন্ধ পড়ে খুবই খুশি হন। এই প্রবন্ধ যখন ছাপানো হয় তখন রাধাকৃষ্ণাণ এর বয়স ২০ বছর। বিশ্বের দরবারে তিনি অতি জনপ্রিয় দার্শনিক অধ্যাপক হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩১ সালে তাকে ‘ব্রিটিশ নাইটহুড’-এ সম্মানিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে ভারতরত্ন উপাধি পান।

প্রথম জীবনে তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন (১৯১৮)। এসময় তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় লিখতেন। সে সময়েই তিনি লেখেন তার প্রথম গ্রন্থ ‘The Philosophy of Rabindranath Tagore’। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘The Reign of Religion in Contemporary Philosophy’ প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশে শিক্ষা দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশে কোনো বিখ্যাত শিক্ষক কিংবা উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জনকে উপলক্ষ্য করে এই দিবস পালন করা হয়। যেমন-২০০৩ সালে ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তৎকালীন সরকার এ দিবসটি চালু করে। এগারোটি দেশ ২৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে যথা- মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, জর্ডান, সৌদি আরব, ইয়েমেন, বাহরাইন, সুদান ও ওমান। ১১ সেপ্টেম্বর ডোমিনো ফসটিনো সার্মেন্তোর মৃত্যু দিবসে আর্জেন্টিনা শিক্ষক দিবস পালন করে।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর মতো ৫ অক্টোবর বাংলাদেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। জার্মানি, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়ার মতো কয়েকটি দেশে সেই দিনে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। তাছাড়া বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে পৃথক পৃথক তারিখে শিক্ষক দিবস পালিত হয়। শিক্ষকদের অবদানকে সম্মান জানাতে ১৯৪৪ সালে আমেরিকার মৈটে ওয়ায়েটে উডব্রিজ সর্বপ্রথম শিক্ষক দিবসের পক্ষে দাবি জানান। পরে ১৯৫৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস তাতে সায় দেয়। ১৯৮০ সাল থেকে ৭ মার্চ শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। কিন্তু পরে মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার এটি পালিত হতে থাকে। সিঙ্গাপুরে সেপ্টেম্বরের প্রথম শুক্রবার শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। আফগানিস্তানে ৫ অক্টোবরই এই দিনটি পালিত হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালন শুরু করে ইউনেস্কো।

সর্বমোট একুশটি দেশ ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবস পালন করে যথা- আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বুলগেরিয়া, কানাডা, অ্যাস্তোনিয়া, জার্মানি, লিথুনিয়া, মেসিডোনিয়া, মালদ্বীপ, মরিশাস, প্রজাতন্ত্র মোল্দাভিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, রাশিয়া, সার্বিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্য। একই সাথে সারা বিশ্বে পালিত না হয়ে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে শিক্ষক দিবস পালিত হওয়ার এটি একটি মুখ্য কারণ।

এ বছর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রক্ষার্থে প্রতিবছরের ন্যায় এবার অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ক্ষেত্রেও সন্দেহ থেকে যায়। তবে অতি মহামারির প্রভাবে স্বাভাবিকভাবে ভার্চুয়াল সেলিব্রেশন করা যেতে পারে। তাতে কোনও বাধা নেই। ভার্চুয়াল সেলিব্রেশনের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রতি নিজের  কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারেন।

 লেখক: শিশু সংগঠক, চাঁদের হাট

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here