জীবন রক্ষাকারী খাবার স্যালাইন যেন আপনার শিশুর জন্য বিপদের কারণ না হয়!

0
109

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
পাতলা পায়খানার চিকিৎসায় খাবার স্যালাইনের ভূমিকা অপরিসীম। পাতলা পায়খানায় শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে পানি শূণ্যতা দেখা দেয়। এই পানি শূণ্যতা পূরণ না হলে বিপদ হতে পারে। তাই শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পরে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হয়। একটা সময় ছিল যখন মানুষ এই খাবার স্যালাইনের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতো না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ এখন বেশ সচেতন হয়েছে। শিশুদের পাতলা পায়খানা হলে যে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এখন বেশিরভাগ বাবা-মা সেটা জানে। আর খাবার স্যালাইন এখন এতটাই সহজলভ্য হয়েছে যে ঔষধের দোকানের পাশাপাশি বাড়ির পাশের মুদির দোকানেও এখন এই খাবার স্যালাইন পাওয়া যায়।


তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে এই খাবার স্যালাইন এক ধরনের ঔষধ। দোকান থেকে কিনে আনা এই ঔষধ যেহেতু বাড়িতে পানির সাথে মিশিয়ে তৈরি করতে হয় তাই এই স্যালাইন তৈরির ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। অনেকেই খাবার স্যালাইন বানানোর সঠিক নিয়ম না জানার কারণে ভুলভাবে এই স্যালাইন তৈরি করে শিশুকে খাওয়ান। এর ফলে শিশুর জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং এই ভুল পদ্ধতিতে তৈরি করা খাবার স্যালাইন শিশুর মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে।


খাবার স্যালাইন বানানোর সঠিক নিয়ম কী?
পুরো এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে একবারে ঢেলে দিতে হবে। স্যালাইন পানিতে পুরোপুরি না মিশে যাওয়া পর্যন্ত তা চামুচ দিয়ে নাড়তে হবে। একবার তৈরি করার পর সেই স্যালাইন ৭ থেকে ৮ ঘন্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। এর মধ্যে সেই স্যালাইন শেষ না হলে তা ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন বানাতে হবে।


অবিভাবকরা সচরাচর যে ভুলগুলো করে থাকেন!
পানিতে স্যালাইন গোলানোর সময় পানির পরিমাণ আধা লিটারের কম বা বেশি করা যাবে না। শিশু ছোটো হলে অনেক সময় বাবা-মা মনে করেন যে এত স্যালাইন তো বাচ্চা খেতে পারবে না। তাই তারা অল্প পানিতে, যেমন এক গ্লাস বা এক কাপ পানিতে পুরো এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন একবারে মিশিয়ে সেটা বাচ্চাকে খাওয়ান। আবার অনেকে প্যাকেটের স্যালাইন পুরোটা একবারে না মিশিয়ে অল্প অল্প করে বারবার পানিতে মিশিয়ে শিশুকে খাওয়ান। এটা মারাত্মক ভুল। এটা কোনোভাবেই করা যাবেনা। এতে শিশুর রক্তে লবণের আধিক্য হয়। ফলে তখন শিশুর খিচুনি হতে পারে। শিশু অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিশুর বুদ্ধি-বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।


পাতলা পায়খানা হলে শিশুকে কতটুকু পরিমাণ স্যালাইন খাওয়াতে হবে?
বাচ্চাকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পরপর স্যালাইন খাওয়াতে হবে। মনে রাখার সহজ হিসাব হলো আপনার বাচ্চার ওজন যতটুকু, প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ঠিক তত চামুচ পরিমাণ খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। ধরা যাক, বাচ্চার ওজন ১০ কেজি। তাহলে তাকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ন্যূনতম ১০ চামুচ পরিমাণ স্যালাইন খাওয়াতে হবে। মনে রাখবেন, খাবার স্যালাইন একটি ঔষধ যা পাতলা পায়খানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এটাকে কখনোই খাবারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অনেক মা তার শিশুর ডায়রিয়া হলে সব খাবার বন্ধ করে দিয়ে সারাদিন কেবল খাবার স্যালাইন খাওয়ান। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ স্যালাইন খেলে শিশুর রক্তে লবণের মাত্রা বেড়ে গিয়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে। শিশুকে ফিডারে করেও কখনো স্যালাইন খাওয়ানো যাবে না। কারণ, প্রতিবার পাতলা পায়খানার পরে কতটুকু খাবার স্যালাইন শিশু খাবে তার হিসাব ঠিক থাকবে না।
অনেক সময় মায়েদের অভিযোগ থাকে যে ‘বাচ্চাকে স্যালাইন খাওয়াচ্ছি কিন্তু ডায়রিয়া তো কমছে না?’

অনেক সময় মায়েদের অভিযোগ থাকে যে ‘বাচ্চাকে স্যালাইন খাওয়াচ্ছি কিন্তু ডায়রিয়া তো কমছে না?’
প্রথমেই একটি বিষয় জানা জরুরি যে এই খাবার স্যালাইন পায়খানা বন্ধের কোনো ঔষধ না। এটা কেবল পানি শূণ্যতা প্রতিরোধ বা পানি শূন্যতা পূরণ করার ঔষধ। শিশুর পাতলা পায়খানা হলে শরীর থেকে প্রচুর পানি এবং লবণ বের হয়ে যায়। এই পানি এবং লবণের ঘাটতি পূরণ করার জন্যই কেবল শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হয়।


অনেক সময় মায়েরা অভিযোগ করেন যে ‘স্যালাইন খাওয়ানোর জন্য বাচ্চার ঠান্ডা লেগেছে’। এরকম অভিযোগের যৌক্তিকতা কতটুকু?
এটা একটা ভুল ধারণা যে স্যালাইন খেলে বাচ্চাদের ঠাণ্ডা-কাশি হয়। কিছু ভাইরাস আছে যা একই সাথে বাচ্চাদের ডায়রিয়া ঘটায় আবার শ্বাসনালীর প্রদাহ ঘটিয়ে ঠাণ্ডা-কাশির উপসর্গ তৈরি করে। সুতরাং, সেরকম ভাইরাস দিয়ে (যেমন: এ্যাডেনো ভাইরাস) এই ডায়রিয়া রোগ হলেও পাতলা পায়খানার পাশাপাশি কখনো কখনো শিশুর সর্দি-কাশি হতে পারে। আবার অন্য কোনো কারণেও সর্দি কাশি হতে পারে। স্যালাইন খাওয়ানোর সাথে শিশুর এই সর্দি-কাশি হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।


নবজাতকের ডায়রিয়া হলে কি তাকেও খাবার স্যালাইন খাওয়ানো যাবে?
নবজাতকের ডায়রিয়া হলেও তার শরীর থেকে পানি ও লবণ বেড়িয়ে গিয়ে পানি শূণ্যতা তৈরি করতে পারে। তাই নবজাতকের খেত্রেও একই নিয়মে খাবার স্যালাইন দিতে হবে।


তবে একটা বিষয় জানা জরুরি যে মায়ের বুকের দুধ পান করা নবজাতকের পায়খানা সাধারণত নরম বা সামান্য পাতলা হতে পারে। সেটা দেখে অনেক মা-বাবা তাকে ডায়রিয়া বলে ভুল করেন। সুতরাং, এটা নবজাতকের ডায়রিয়া রোগ, নাকি স্বাভাবিক পায়খানা তা প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে আগে নিশ্চিত হতে হবে। তারপর প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন দিতে হবে।

বাচ্চার ডায়রিয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মা যদি স্যালাইন খায় তাহলে কি তার বুকের দুধ পান করা শিশুর কোনো উপকার হবে?
না। বাচ্চার ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইন শিশুকেই খাওয়াতে হবে। এক্ষেত্রে মা খাবার স্যালাইন খেলে শিশুর কোনো লাভ হবে না।


[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here