ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যখন নারী

0
17


নারী ডেস্ক: সীমান্ত পাহারা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যবসা, কৃষিসহ শ্রমনির্ভর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তারা পুরুষের সঙ্গে সমান ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ প্রতিটি দপ্তরেও রয়েছে নারীর সরব পদচারণা। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে নারীদের অবদান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী মানেই ভাবা হতো- তারা বাড়িতে রান্নার কাজ ও সন্তানদের দেখভাল করবেন। সময়ের পরিক্রমায় নারী এখন আর শুধু ঘরকন্নার দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নেই। ঘর-সংসার সামলে সমানতালে বাইরেও রেখে চলেছেন সফলতার স্বাক্ষর।


বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষায় সীমান্তে অস্ত্র হাতে পাহারার পাশাপাশি, বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির পণ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ, দু’দেশের মাঝে যাতায়াতকারী পাসপোর্ট যাত্রীদের তথ্য ও ব্যাগেজ তল্লাশি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নারী চোরাকারবারি ও নারী অপরাধী আটকের পাশাপাশি দিন-রাত রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় পুলিশের অফিসার হিসেবে নারীর সংখ্যা বাড়ছে, যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশনাল দায়িত্বের পাশাপাশি প্রায় সব ইউনিটে নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত মেয়ে পুলিশে আসছেন এবং ভালো করছেন।


নারীদের জন্য এখন আলাদা ডেস্ক রয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগী নারীরা সহজেই থানায় এসে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে প্রথমে কোনো নারী সদস্যই ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো পুলিশ বাহিনীতে ১৪ জন নারী পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেন। তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর, সাতজন কনস্টেবল। ১৯৮৬ সালে বিসিএস ক্যাডারে প্রথম নারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই থেকে পুলিশে নারীর পথচলা শুরু, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের মোট জনবলের ৭.৯ শতাংশ নারী এবং নারী পুলিশের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৬৩। তবে অংশগ্রহণ বাড়লেও পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বের শিখরে নারী অনেকটাই কম।


পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ বাহিনীতে ক্রমেই নারী সদস্যের সংখ্যা বাড়ছে। যোগ্যতা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন তারা। শুধু তাই নয়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও পুলিশের নারী সদস্যরা উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছেন। কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিক সফলতা দেখিয়ে বর্তমানে নারী ডিআইজি রয়েছেন দু’জন, অ্যাডিশনাল ডিআইজি তিনজন, পুলিশ সুপার ৭১ জন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ১০৯ জন ও সহকারী পুলিশ সুপার রয়েছেন ১০০ জন। এ ছাড়া নারী ইন্সপেক্টর রয়েছেন ১০৯, এসআই ৭৯৭, সার্জেন্ট ৫৮, এএসআই এক হাজার ১০৯, নায়েক ২১১ এবং কনস্টেবল ১২ হাজার ৫৯৪ জন।


নারী সদস্যরা পুলিশিংয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করে চলেছেন বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন অনেক নারী উন্নয়ন সংস্থার নেতারা। নারী পুলিশ নিয়ে গঠিত পূর্ণাঙ্গ নারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও উইমেন অ্যান্ড ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে কর্মরত নারীরা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো নির্যাতিত নারী ও শিশুদের একান্ত নির্ভরতা ও আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
এদিকে, দেশের অর্থনীতিতেও কর্মজীবী নারীর অবদান অপরিসীম। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতায় কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী জাগরণের এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। দেশে চিকিৎসক, শিক্ষক ও ব্যাংকার হিসেবে কর্মরত নারীর সংখ্যা অগণিত। তবে গতানুগতিক পেশার বাইরেও সাহসী দায়িত্ব পালনেও নারী যে পারদর্শী তার প্রমাণ দিয়েছেন নারী নাবিক, সৈনিক, খেলোয়াড়, সাংবাদিক, আইনজীবী, বাইক রাইডার ও নিরাপত্তা কর্মীরা। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং কাজে নারীর অংশগ্রহণে পেশাগত লিঙ্গবৈষম্য নারীর অগ্রযাত্রাকে এখন আর আটকাতে পারছে না। সে কারণে এখন সংসারের হাল ধরতে একজন নারী বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় ক্যারিয়ার গড়ছেন।


সাংবাদিকতায় নারীর অবস্থান প্রসঙ্গে নারী নেত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশের মেয়েরা খুবই মেধাবী। এ জন্য সাংবাদিকতার মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারী তার দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এগিয়ে যাচ্ছে। নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী বলেন, টিভি সাংবাদিকতায় নারীদের যত অংশগ্রহণ আশা করেছিলাম, তত করেনি। ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায় নারীদের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।


এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, ব্যাংক, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, পোশাক কারখানা ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে নারীরা নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, এটিএম বুথ, বড় মাপের বিভিন্ন অফিস-অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ সিকিউরিটি গার্ডের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে নারীরা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় শপিংমলে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন। একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত আয়েশা আক্তার জানান, অনায়াসেই তিনি এ কাজ করছেন। দায়িত্ব পালনকালে কখনও তার মনে হয়নি নারী হিসেবে প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ পেশায় যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হয়, তেমনি কিছু কিছু বিষয় ছাড়ও দিতে হয়। যেমন বেশি সময় ডিউটি করতে হয়, তুলনামূলক ছুটি অনেক কম, পুরুষের তুলনায় মজুরি কম।’


স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশে অর্থনীতির পটপরিবর্তনে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। এই পাঁচ দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের সফলতায় বড় অবদান রেখেছেন নারীরা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ, যা পাকিস্তানে ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে নারী ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এই হার ১৯৮০ সালের দিকে ৮ শতাংশ ও ২০০০ সালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠে। তবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ২০১০ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশ হয়। ২০১৩ সালে অবশ্য কিছু কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামে। বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে নারী হিস্যা ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন। মোট শ্রমশক্তিতে ৪ কোটি ২২ লাখ পুরুষ আর নারী ১ কোটি ৮৭ লাখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here