ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ: কারণ, লক্ষণ এবং করণীয়

1
406

ডা. স্নিগ্ধা সরকার

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ কি?:
ডিমেনশিয়া শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘Demetare’ হতে; যার অর্থ হচ্ছে ‘পাগল করে দেওয়া’ সোজা বাংলায় আমরা ‘ভুলে যাওয়া রোগ’ বলে থাকি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের মস্তিস্কের কোষের (নিউরন) সংখ্যাও কমতে থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবে বয়স্ক মানুষের স্মৃতিশক্তি পূর্বের চেয়ে কিছুটা কমে যেতে থাকে। কিন্তু এই ভুলে যাওয়ার সমস্যা যখন খুব বেশি হয় তখনই আমরা একে ডিমেনশিয়া রোগ হিসেবে ধারণা করি।
সারা বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মানুষের গড় আয়ু যেমন বেড়েছে, সেই সাথে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত ৬৫ বছরের পর যে কেউ স্মৃতিভ্রংশ জনিত সমস্যায় ভুগতে পারে। তবে নারীদের চেয়ে পুরুষদের আক্রান্তের হার বেশি।

ডিমেনশিয়ার কারণ :
আলঝেইমার্স রোগ: ডিমেনশিয়ার কারণগুলোর মধ্যে আলঝেইমার্স বা মস্তিষ্কের ক্ষয়রোগ অন্যতম। আলঝেইমার্স রোগের প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা যায় মস্তিষ্কের এ্যামাইলয়েড প্লাক, টডি প্রোটিন জমা হবার কারণে রাসায়নিক প্রকৃয়ায় বিঘ্ন ঘটে। এছাড়া ৫-১০% ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

ভাসকুলার ডিমেনশিয়া: বাংলাদেশে ভাসকুলার ডিমেনশিয়ায় ভোগা রোগীর পরিমাণ বেশি। বারবার স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ জায়গায় রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। সেজন্য কিছু নিউরন কর্মক্ষমতা হারায়। উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস ভাসকুলার ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

ডিমেনশিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ : মস্তিষ্কের আঘাত, রক্তক্ষরণ, পারকিনসন্স ডিজিজ লিউ বডি ডিমেনশিয়া, ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতি, হাইপো থাইরয়েড, কিছু ইনফেকশন যেমন-সিফিলিস, এইডস রোগ, অ্যালকোহলে আসক্তি এইসব ডিমেনশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

রোগের লক্ষণ :
ডিমেনশিয়ায় স্মৃতিশক্তির পাশাপাশি বুদ্ধি, বিচক্ষণতা এবং ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। এই ঘটনাটা ধীরে ধীরে ঘটে। মাস থেকে বছর সময় লাগে। প্রথম দিকে সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা ভুলে যাওয়া এবং পরের দিকে পূর্বের স্মৃতিগুলো লোপ পায়। আক্রান্ত ব্যক্তি একই প্রশ্ন বারবার করে। কোনো সাধারণ হিসাব বা গননা করতে ভুল হয়। শপিং বা বিল দিতে গিয়ে সমস্যা হয়। কোনো কাজের পরিকল্পনা করতে অসুবিধা হয়। এইসব কারণে তার দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাত ঘটে। এক সময় দিন, তারিখ ভুলে যাওয়া, পরিচিত মানুষকে চিনতে না পারা এমনকি বাসার রাস্তা, ঠিকানাও ভুলে যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায়ই কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পায় না। ডিমেনশিয়া রোগীরা কিছু মানসিক সমস্যাতেও ভোগে। যেমন- হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, নিজের ওপর রাগ করা, বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতায় ভোগা, অযথা ভয় পাওয়া, অলীক কিছু বিশ্বাস করা (হ্যালুসিনেশন)

রোগ নির্ণয় :
ডিমেনশিয়া নির্ণয়ের জন্য সুনিশ্চিত কোনো পরীক্ষা নেই। ক্লিনিক্যালি মেমোরি টেস্টের জন্য কিছু প্রশ্ন করে, ছবি দেখিয়ে স্কোরিং করা হয়। সেই সাথে প্রয়োজন হলে ব্রেইনের এমআরআই/সিটিস্ক্যান করা যেতে পারে। সেই সাথে এইচআইভি, সিফিলিস, থাইরয়েড হরমোন, ভিটামিন বি ১২ লেভেল দেখা যায়।

চিকিৎসা :
ডিমেনশিয়া সম্পূর্ণ প্রতিকারের জন্য কোনো ঔষধ নেই। তবে Donepezil, Nemantidine এ ধরনের কিছু ঔষধ রোগের প্রকোপ কমিয়ে চিন্তাশীলতা ও শনাক্তকরণ ক্ষমতা কিছুটা বাড়ায়।

ডিমেনশিয়া রোগীর যত্ন ও করণীয়:
আমাদের সমাজে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের রোগীরা অনেকটা অবহেলিত। রোগের শুরুর দিকে বয়সজনিত ভুলে যাওয়া কারণ বা ‘ভীমরতি’ মনে করে রোগীরা উপেক্ষিত থাকে।

রোগটি শনাক্ত হবার সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। রোগীর প্রাত্যহিক জীবনের মান বাড়ানো যেমন চশমা, জামা-কাপড় নির্দিষ্ট স্থানে রাখা, যথাযথ সঙ্গ দেওয়া, তার দৈনন্দিন কাজের তালিকার সমন্বয়- রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি কমিয়ে আনে।

সেইসাথে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে নানারকম সামাজিক কাজে নিজেকে নিযুক্ত রাখতে হবে। অবসরে বই পড়া, শব্দ ভেদ বা পাজল খেলা, দাবা খেলা, ধাঁধার সমাধান, সৃজনশীল কাজ করতে হবে। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান-মদ্যপান পরিহার, সুষম খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে মাছের ওমেগা থ্রি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

[লেখক: এমডি, রেসিডেন্ট (ফেইজ বি); নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here