ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ধর্মদর্শন

0
231
ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম
ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন, ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রেও তেমনি মনীষী শহীদুল্লাহ একাধারে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন। তিনি যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন যে, এ অঞ্চলের মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্মের প্রভাব অসামান্য। সুতরাং এখানে কি সামাজিক, কি রাজনৈতিক, যে-কোনো সংস্কারের জন্য অগ্রসর হতে হবে ধর্মপথেই। আর এ ধর্মপথেই আমাদের সরলপ্রাণ জনগোষ্ঠীকে চালিত করতে হবে যুক্তিবাদের দিকে। এ ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনি তাঁর সংস্কার কর্মে অগ্রসর হন সময় ও পরিস্থিতির আলোকে, সমাজের বিশেষত সাধারণ জনগোষ্ঠীর জ্ঞানবুদ্ধি ও গ্রহীতা শক্তিকে উপেক্ষা না করে। দেশ ও সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি ধর্মের ইহজাগতিক ও জীবন কেন্দ্রিক গুরুত্ব ব্যাখ্যার কাজে মনোনিবেশ করেন। সঙ্গত কারণেই তাঁর কাছে ধর্ম মানে নিছক তপজপ কিংবা ইবাদত-উপাসনা নয়। কেবল পরলোকে সুখ-শন্তি নয়, জীবনের সর্বস্তরে মানুষকে কল্যাণপথের সন্ধান দেওয়াই ইসলামসহ সব প্রকৃত ধর্মের লক্ষ্য। ধর্ম মানে মনুষ্যত্বের বহুমুখী বিকাশ, আর যে ধর্মে মনুষ্যত্ববোধ মানবিক মর্যাদার কদর নেই, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও আচারপূজায় ভরপুর, তা ধর্ম নয়, স্রেফ কুসংস্কার। আর সৎ জীবন বর্জিত ধর্ম কথা, সৎকর্ম বিহীন নিছক তত্ত্বজ্ঞান নিষ্ফল ও মূল্যহীন।

কিন্তু ধর্মের ইতিহাসে এই মানবতাবাদী ধারণার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে নি; বরঞ্চ দেখা যায় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে ধর্মের মহান মানবিক শিক্ষা, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে প্রায়শই দেখা দিয়েছে হানাহানি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ফলে দেখা যায় প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যতনা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে মানুষকে, আবার ধর্মকে কখনো কখনো ব্যবহার করা হয়েছে শোষণ-বঞ্চনার হাতিয়ার হিসেবে। এ প্রসঙ্গে ড. শহীদুল্লাহ দুঃখ করে বলেন, ধর্মকে আজকাল অনেকে যেভাবে দেখছেন, তা অনেকটা বাঁধন স্বরূপ। ধর্মের মর্মকথার অর্থ বোঝার চেষ্টা নেই, আছে শুধু মুখের বুলি ও আন্তরিকতা বিহীন বাহ্যিকতা। ড. শহীদুল্লাহর দৃষ্টিতে এসব যথার্থ ধর্মাচরণ হতে পারেনা; ‘‘এসব ভন্ডামি, এর চেয়ে সাফ নাস্তিক হওয়া ভাল।’’

ড. শহীদুল্লাহ ধর্মকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন এই পঙ্কিলতা থেকে এবং প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন ধর্মের মানবতাবাদী দিকটাকে তুলে ধরতে। তাই দেখা যায় স্বধর্ম প্রচারে নিষ্ঠাবান থেকেই তিনি আজীবন চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে। সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা কখনো স্পর্শ করতে পারেনি তাঁর আজীবন লালিত মানবিক ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধকে। তাই তো ধর্মানুরাগীদের প্রতি তাঁর উপদেশ: ‘‘মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ দেখবে না তুমি মুসলমান কি অমুসলমান। সে দেখবে শুধু তুমি কেমন লোক। ধর্মের উদ্দেশ্য, ধার্মিক নিজে শান্তি পাবে, আর পাবে তার হাতে সমস্ত দুনিয়া শান্তি। যা অশান্তি ঘটায়, তা ধর্ম নয়, পরম অধর্ম।” এটাও ড. শহীদুল্লাহর কেবল একটা মুখের বুলি মাত্র ছিল না, আজীবন তিনি মনন ও অনুশীলন করেছেন ধর্মের এই মানবতাবাদী মন্ত্র। আমি নিজেও এ বক্তব্যকে যুক্তিযুক্ত মনে করি; কারণ. আল্লাহ কোরআনের বাণী আরব কিংবা অন্য কোনো বিশেষ জাতির উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেননি, করেছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য। কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা: ‘‘হে মানুষ আমি তোমাদের একই নরনারী থেকে সৃষ্টি করেছি।” (৪৯:১৩)। সুতরাং সব মানুষ একই মানবজাতির অন্তর্গত, একই মানব পরিবারেরই সদস্য। তা-ই যদি হয়, তাহলে ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস অযৌক্তিক। কোরআনের বিশ্বজনীন বাণীর আলোকেই বিদায় হজে¦ মহানবী মোহাম্মদ (সা.)-এর ঘোষণা : সব মানুষ যেহেতু একই উপাদান থেকে সৃষ্টি, সুতরাং কালোর ওপর সাদার এবং সাদার ওপর কালোর, আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো প্রাধান্য নেই।

শহীদুল্লাহ চরিত্রের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, ইসলামি বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতায় একান্ত আস্থাশীল হয়েও তিনি অন্যান্য ধর্মের সৌন্দর্য ও মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরায় এতটুকু দ্বিধা করেননি; নিজে ধার্মিক হয়েও যারা ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মানব কল্যাণে বিশ্বজনীন, তাঁদের কখনো তিনি হিংসা কিংবা অশ্রদ্ধা করেননি। এদিক থেকে তিনি ধর্মপ্রাণ হয়েও প্রকৃতই ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ। তাঁর এই অসাধারণ চরিত্রগুণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল ফজল যথার্থই বলেন: “ধর্মনিপেক্ষ জ্ঞান আর ধর্ম ভিত্তিক জ্ঞান এ দুয়ের এক পরমাশ্চর্য সমন্বয় শহীদুল্লাহ সাহেব ও তাঁর জীবন। এমন দুই বিপরীত ধর্মী জ্ঞানের অপরূপ ভারসাম্য কদাচিৎ দেখা যায়।’’ ধার্মিক হয়েও ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বনের এই বিরল প্রেরণা অবশ্য তিনি পেয়েছিলেন কোরআনের ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) ও লা ইকরাহা ফিদ্বীন’। ( ধর্ম নিয়ে জোর জবরদস্তি চলে না) নীতি থেকে আর এ বিশ্বজনীন নীতিতে বিশ্ববাসী ছিলেন বলেই তিনি অতিথি হিসেবে সামিল হতেন রামকৃষ্ণ মিশন, ব্রাহ্মসমাজ, বৌদ্ধ মঠসহ বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ সেবক ও প্রচারক হয়েও হিন্দু ধর্ম নিয়ে বহু প্রবন্ধ লেখেন ‘প্রবাসী’ ও অন্যান্য আরো অনেক পত্রিকায়। বস্তুত, ড. শহীদুল্লাহ ছিলেন আন্তঃধর্মীয় ঐক্য ও অখন্ডতা এবং বিশ্ব মানবতার ব্যাপক ও স্থায়ী কল্যাণে বিশ্ববাসী। তাঁর ধ্যান-ধারণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ব্যাপক ও স্থায়ী কল্যাণ। আর তাই বিবেকবান মানুষের প্রতি তাঁর আকুল আবেদন, ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানকে তাঁরা যেন বড় করে না দেখেন, ধর্ম কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত না হয়ে মিলেমিশে সুখ-শান্তিতে বসবাসের চেষ্টা করেন।

ড. শহীদুল্লাহর জীবন চরিত ও সাহিত্য কর্মের প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধাশীল তাঁদেরও কেউ কেউ মৃদু অভিযোগের সুরে বলেছেন, এই ঋষিতুল্য কৃতী পুরুষের ধ্যান-ধারণা রক্ষণশীল ও প্রাচীন ঘেষাঁ; তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিকতা ও সমকাল-সম্পৃক্ততার চেয়ে ধর্মীয় প্রাধিকার ও প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্যই বেশি। তবে আমার কাছে এই ধারণাকে ড. শহীদুল্লাহর জীবন দর্শনের যথার্থ মূল্যায়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে হয় না। কারণ, ভাষা-সাহিত্যের কথাই বলি আর সমাজ চিন্তার কথাই বলি, কিংবা ধর্ম চিন্তার কথাই বলি এই মনীষীর ধ্যান-ধারণার সব ক’টি বলয়েই আবেগের সঙ্গে বিবেকের, বিশ্বজনীন সঙ্গে যুক্তির, আত্মকেন্দ্রিকতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠতার এবং রক্ষণশীলতার সঙ্গে প্রগতিবাদিতার এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ করা যায়। আর বিভিন্ন বিরোধী মতবাদ ও চিন্তা ধারার মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয় বিধানের মাধ্যমে জ্ঞান ও সত্যতার সামগ্রিক রূপ-স্বরূপটি তুলে ধরার তাঁর এই প্রয়াসটাকেই বিভিন্ন মহল দেখার চেষ্টা করেছে নিজ নিজ দৃষ্টি কোণ থেকে। তাই দেখা যায় রক্ষণশীল ওলেমা সমাজ তাঁকে যেখানে দেখেছেন প্রগতিবাদী হিসেবে, সেখানে প্রগতিবাদীদের একাংশ তাঁকে অভিহিত করেছেন রক্ষণশীল বলে। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, রক্ষণশীল সমাজে যেমন, প্রগতিবাদীদের মধ্যেও তেমনি রয়েছে তাঁর অজস্র গুণগ্রাহী ও অনুরাগী। এটাই বোধ করি ড. শহীদুল্লাহর মুক্তমন ও মানবতাবাদী জীবন দর্শনের এক বড় পরিচয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here