ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নারী দর্শন

0
147

ড. আমিনুল ইসলাম
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বেশভূষা ও চালচলনে প্রাচীনপন্থী গোছের এবং আচার-আচরণে ধর্মীয় ভাবাপন্ন হলেও চিন্তার ক্ষেত্রে যে তিনি পুরোদস্তুর যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল ছিলেন তার এক অভ্রান্ত প্রমাণ নারী অধিকার ও নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর উদার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। একথা অবিদিত নয় যে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের সমাজে মুসলমান নারীদের যখন বিভিন্ন বাধা-নিষেধের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হতো, পুরুষের সঙ্গে নারীদের এক কাতারে অবস্থান এবং সমানাধিকারের দাবি-উত্থাপনের যখন তেমন কোনো সুযোগই ছিল না, সেই শ্রুবাসরুদ্ধকর পরিবেশে ধর্মনেতাদের বিরাগভাজন হয়েই ড. শহীদুল্লাহ দুঃসাহসিক ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত মহিলাদের জামাতে ইমামতি করেছিলেন। তাঁর যুক্তিটা ছিল এরকম: ‘‘খোদার আলোয়, জলে ও বাতাসে সকল মানুষের, সকল স্ত্রী-পুরুষের সমান অধিকার। তেমনি ধর্ম যদি খোদার হয় তবে তাহাতেও সকলের সমান অধিকার থাকিবে।’’ একই প্রবন্ধে তিনি আরো বলেন: ‘‘বর্তমান যুগের উলেমা যাহাই বলুন না কেন, এখনও মুসলিম রাজ্যসমূহে নারীরা পুরুষের সহিত ইসলামের বিধান অনুযায়ী ঈদের ময়দানে ও মসজিদে নামাজে যোগদান করিয়া থাকেন। বাঙ্গালার প্রাচীন রাজধানী গৌড় ও পাণ্ডুয়ার মসজিদে এখনও নারীদের জন্য পৃথক গ্যালারী দৃষ্ট হয়।’’ ড. শহীদুল্লাহর প্রশ্ন নামাজ, রোজা প্রভৃতি ইসলামের সব অবশ্য পালনীয় কর্তব্যে যখন নারী পুরুষের অবস্থান একই, হজের সময় লক্ষ লক্ষ পুরুষের সঙ্গে নারীর যখন অনাবৃত মুখে পুরুষের সঙ্গে কাবা প্রদক্ষিণ করতে পারে (রাসুলুল্লাহর স্ত্রীরাও তা করতেন) তাহলে এই বিংশ শতাব্দীতে আমাদের দেশের মেয়েদের ঈদের জামাতে শামিল হওয়ায় বাধা কোথায়? ধর্মীয় বিধানের সমর্থনে এ এক অকাট্য যুক্তি বটে!

ইসলামের নবি মোহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজে ঘোষণা করেছিলেন, স্বামী-স্ত্রীর অধিকারে বৈষম্য করার কোনো অবকাশ নেই। সুতরাং স্ত্রীর ওপর স্বামীর যে অধিকার, স্বামীর ওপরও স্ত্রীর সেই একই অধিকার। ড. শহীদুল্লাহ এই সমানাধিকার মন্ত্রের মনেপ্রাণে বিশ্বাসী ছিলেন; আর তাই তিনি বলেন, ‘‘নারী পুরুষের ভোগের জিনিস নয়, তার আদরের পুতুল নয়, পুরুষের সহযাত্রিনী।’’ কিন্তু তারপরও যদি কেউ বলেন: নারী পুরুষের দাসী, তাহলে ড. শহীদুল্লাহর সমুচিত জবাব: ‘‘নারী যদি পুরুষের দাসী হয় তবে পুরুষও নারীর দাস- ইসলামের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে এইরূপ।’’

ড. শহীদুল্লাহর এই সংস্কারমুক্ত সাহসী চিন্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় উপমহাদেশের অপর এক মহামনীষী বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের (১৮৬২-১৯০২) প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণার কথা। কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়েও তিনি ঘোষণা করেছিলেন : আমি একজন সমাজতন্ত্রী এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নিখুঁৎ ব্যবস্থা বলে নয়, বরং এজন্য যে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ (half a loaf is better than no bread)। ড. শহীদুল্লাহ ছিলেন অনুরূপ এক সমাজতন্ত্রী, এবং অনেকটা এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, আমরা যদি উন্মুক্ত মনে ইসলামের বিধিগুলো বিচার করি, তাহলে সমাজতন্ত্রই হবে আমাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও আদর্শ। তাঁর দৃষ্টিতে যাকাত হজ ভ্রাতৃত্বনীতি প্রভৃতি এভাবে যৌক্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন তার নাম তিনি দিয়েছেন যুক্তিবাদী সমাজতন্ত্র (rational socialism)।
’বাংলাদেশে দর্শন ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ থেকে সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here