ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষা ও সাহিত্য দর্শন

0
293
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম
আগেই উল্লেখ করেছি, ড. শহীদুল্লাহর পান্ডিত্য বিস্তৃতি ছিল ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিসহ জীবনের বিবিধ অংগনে। বিশেষত বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর মমত্ববোধ এবং এই ভাষার উন্নতির ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল অপরিসীম। বস্তুত, যাঁদের মহামূল্য ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ঐকান্তিক সেবা-যত্নের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ক্রমশ পরিপুষ্ট হয়েছে এবং সেই ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করে প্রথমে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় এবং আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আসনে অভিষিক্ত হতে পেরেছে, তিনি ছিলেন সেই বরেণ্য ব্যক্তিদেরই একজন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিঞ্চিদধিক একবছর পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের মূল সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘এই সোনার বাংলাকে কেবল জনে নয়, ধনে-ধান্যে, জ্ঞানে-গুণে, শিল্প-বিজ্ঞানে পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশের সমকক্ষ করতে হবে। তাই কেবল কাব্য ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব প্রভৃতি জ্ঞানবিজ্ঞানের সকল বিভাগে বাংলাকে উচ্চ আসন নিতে ও দিতে হবে। তার জন্য শিক্ষার মাধ্যম স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আগাগোড়া বাংলা করতে হবে। অনুরূপ দৃপ্ত কণ্ঠে এবং সুস্পষ্ট ভাষায় তিনি আবার বলেন, ‘‘এ কথা অবশ্য বলিব যে সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ উন্নতি সেইদিন হইতে আরম্ভ হইবে যেদিন আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সর্ববিধ শিক্ষার মাধ্যমে হইবে। সত্বরে কিংবা বিলম্বে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হইবেই। কতকগুলি অসাহিত্যিক গোঁড়া রাজনৈতিক বাংলা অক্ষর এবং ভাষাকে গায়ের জোরে বা আইনের জোরে রাতারাতি বদলাইতে চাহিলেও বাংলাভাষা প্রবল নদী প্রবাহের ন্যায় নিজের মরজিমত আপনার গতিপথ বাছিয়া লইবে। বাহিরের কোনো শক্তিই তাহাকে বাধা দিতে পারিবেনা। ভাষা পরিবর্তনশীল; সুতরাং পরিবর্তন আসিবেই। কিন্তু তাহা ভাষাতত্ত্বের নিয়ম অনুসারে, কাহারো হুকুম বা ইচ্ছানুসারে নয়। ভাষার রীতি (style) ও গতি কোনো নির্দিষ্ট ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন হতে পারে না। … ঘসে-মেজে রূপ আর ধরে বেঁধে পীরিত যেমন, নিয়মে বেঁধে ভাষার রীতি শেখানও তেমন।’’

লক্ষ করার বিষয় এই যে, তারও বহু আগে সেই ১৯১৭ সালে (১৩২৪ বঙ্গাব্দে) অনুষ্টিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে এই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা মনীষী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন: ‘‘সেদিন অতি নিকট যেদিন বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভাষার স্থান অধিকার করিবে। বিদেশীয় ভাষার সাহায্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার সৃষ্টি ছাড়া প্রথা কখনও টিকিতে পারে না।’’ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার শক্তি ও কার্যকারিতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে অন্যত্র (নিখিল বঙ্গীয় মুসলিম যুবক সম্মেলন, কলিকাতা আলবার্ট হল, ১৯২৮) তিনি আক্ষেপ করে বলেন: ‘‘হায়! এই পোড়া ভারত ছাড়া আর কোথায় শিক্ষার এমন সৃষ্টি ছাড়া প্রথা আছে, যেখানে বিদেশী ভাষার ঘাড়ে চড়ে সমস্ত জ্ঞান কুড়ানো হয়? এখন দেশী ভাষাকে শিক্ষার বাহন করলে কোনই ন্যায্য আপত্তি হতে পারে না। দেশী ভাষার সাহায্যে যে সব চেয়ে উঁচু শিক্ষা লাভ করা সম্ভব, তার নজির হচ্ছে হায়দরাবাদের উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের রাজনীতিকেরা চেষ্টা করুন দেশে স্বরাজ্য আনতে, আর আমরা চেষ্টা কারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বরাজ্য আনতে।’’

বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার মূলেও যে ড. শহীদুল্লাহর অগ্রণী ভূমিকা ছিল তার আভাসও পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে। তাঁর সেদিনের প্রস্তাব: ‘‘আমাদের একটি একাডেমী … গড়তে হবে, যার কর্তব্য হবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য বিষয়ে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাবলির অনুবাদ বাংলায় প্রকাশ।’’ এই একই ধারণা আরো স্পষ্ট ১৯৫৩ সালে সিলেট সাংস্কিৃতিক সম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর সাহিত্য বিভাগের সভাপতির ভাষণে। এই ভাষণে তাঁর বক্তব্য: ‘‘এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে একটি Bengali Academy… স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু …. সরকারের ষোল আনা সাহায্য ব্যতীত এইরূপ প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়া অসম্ভব।’’

মাতৃভাষা বাংলার বিকাশ-বর্ধন ও উৎকর্ষ-সাধনে মহামতি শহীদুল্লাহর যে কী পরিমাণ আগ্রহ ছিল এসব দৃষ্টান্ত থেকে তা সহজেই অনুমেয়। তবে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার ওপর এই গুরুত্বারোপের অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ড. শহীদুল্লাহ শিক্ষাব্যবস্থায় বিদেশী ভাষার, বিশেষত ইংরেজির গুরুত্ব অস্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে নিখিল বঙ্গীয় মুসলিম যুবক সম্মেলনে (আলবার্ট হল, কলিকাতা, ১৯২৮) তিনি বলেন: ‘‘ইংরেজি ভাষা আমাদের শেখা দরকার, খুবই দরকার। ইংরেজি বাদ দিলে ফারসি কি জার্মান ভাষা শিখতে হবে। মোটকথা, হাল জগতের সঙ্গে যোগ রাখতে এ ভাষাগুলি নেহাত দরকার। জার্মানিতে সকল ছাত্রকেই বাধ্য হয়ে ইংরেজি নয় ফারসি শিখতে হয়। হল্যান্ডে ইংরেজি ও জার্মান দুই-ই জরুরি।’’ এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় ড. শহীদুল্লাহ মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন বটে; কিন্তু আন্তর্জাতিক ভাব ও জ্ঞানের আদান-প্রদানে অন্তত একটি বিদেশী ভাষা শিক্ষার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। তাঁর বক্তব্য : ‘‘ইংরেজি শেখা এক কথা আর ইংরেজিতে সব শেখা আর এক কথা।’’

সাহিত্যের স্বরূপ ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কেও ড. শহীদুল্লাহর ধ্যান-ধারণা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। শিক্ষাতত্ত্বে যেমন সাহিত্য তত্ত্বের তেমনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি উদার, বাস্তববাদী ও জীবনমুখী। তাঁর মতে, সাহিত্য কেবল চিৎপ্রকর্ষের মাধ্যম নয়, জীবনের দর্পণস্বরূপ। ধনৈশ্বর্য কিংবা রণ সম্ভার নয়, সাহিত্যেই একটি জাতির উন্নতির মাপকাঠি, তার গৌরবের পরিচায়ক। প্রকৃত সাহিত্য মানবতাবাদী বিশ্বজনীন সাহিত্য। সাহিত্যের উদ্ভব একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী থেকে বটে; কিন্তু এর ব্যাপ্তি ও আবেদন বিশ্বব্যাপী। সুতরাং এতে সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। সাহিত্যের মাধ্যমেই সাম্প্রদায়িকতাকে বিদায় দিতে এবং মানবতাবোধকে স্বাগত জানাতে হবে। ‘‘আমাদের ঘর ও পর, আমাদের সুখ ও দুঃখ, আমাদের আশা ও ভরসা, লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে যে সাহিত্য, তাই আমাদের সাহিত্য। এই সাহিত্যের ভিতর দিয়েই বাংলার হিন্দু মুসলমানদের চেনা-পরিচয় হবে। চেনা হলেই ভাব হবে।’’ তিনি দুঃখ করে বলেন, হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ এই উপমহাদেশের এক ঘোরতর অভিশাপ। সুতরাং সাহিত্যের মাধ্যমে এই অভিশাপ মোচন করতে হবে, মিলনের বাণী প্রচার করতে হবে; এই সাহিত্য দিয়েই হিন্দু মুসলমানের মধ্যে ঐক্য সংস্থাপন করতে হবে। এ কথা ঠিক যে, হিন্দু সাহিত্যের প্রেরণার উৎস বেদান্ত ও গীতা, হিন্দু জীবনী, অন্যদিকে মুসলমান সাহিত্যের প্রেরণার উৎস কোরআন ও হাদিস, মুসলিম ইতিহাস ও মুসলিম মনীষীদের জীবনী। কিন্তু তাই বলে তাদের কারো সাহিত্যই সাম্প্রদায়িক সাহিত্য নয়।

যেদিন বাংলার হিন্দু সাহিত্য ও মুসলমান সাহিত্য গঙ্গা-যমুনার মত মিলিত হয়ে উভয়ের হৃদয়ের মিলন ঘটাবে, সেই দিনই পূর্ণ হবে বাংলা সাহিত্য। তিনি তাঁর এই উদার অসাম্প্রদায়িক সাহিত্য ভাবনার সমর্থনে ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের এই উক্তিটি উদ্ধৃত করেন: ‘‘যদি মুসলমানগণ তাঁদের সমাজের উন্নত চরিত্রগুলি সুন্দর মহিমান্বিত বর্ণে চিত্রিত করিয়া বাঙ্গালা সাহিত্যে উপস্থিত করেন, তবে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে তাহাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হইবেন।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here