ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর শিক্ষাদর্শন

0
346

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম

এখানে ড. শহীদুল্লাহর শিক্ষাদর্শনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করি। তাঁর মতে, নিছক বিদ্যাচর্চা কিংবা উঁচুমানের সনদ পাওয়াই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার সবটুকু নয়। শিক্ষার লক্ষ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞানবান, চরিত্রবান ও সৎমানুষ করা। তাঁর ভাষায়; ‘‘কেবল বহুসংখ্যক লোককে অক্ষরজ্ঞানবিশিষ্ট করলেই তারা মানুষ হলো না। মানুষের মধ্যে পাশব স্বভাব আছে, আবার ঐশ্বরিক গুণও আছে। পাশব স্বভাবকে দমন করে যদি তার ঐশ্বরিক গুণকে ফুটিয়ে তোলা যায়, তবেই তাকে প্রকৃত মানুষ করা হলো। আর শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানুষ করার এ কাজে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষকের কাজ ‘মানুষ করা’, এই লেজ-শিং-বিহীন পশুকে মানুষ করা।’ আর তাই যদি করতে হয়, তা হলে দায়িত্বশীল শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে আমাদের কেবল শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের খোরাক দিলেই চলবে না, তাদের দেহ, মন ও অন্তরাত্মার সার্বিক বিকাশের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, তাদের সুনাগরিক ও সৎমানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর তা যদি করতে হয় তা হলে ‘শিক্ষক ও মুরব্বীদের’ নিজেদের প্রথমে “আদর্শ চরিত্র হওয়া চাই। নয়ত তাঁদের উপদেশ হবে কাঁকড়ার উপদেশ তার বাচ্চাদের সোজা হয়ে চলবার জন্য।”

ড. শহীদুল্লাহর এই বাস্তবমুখী ও সুনীতিমূলক শিক্ষাতত্ত্বকে আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়, বিশেষত আমাদের শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান অনভিপ্রেত ঘটনাপ্রবাহ তথা বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা ও অশান্তির বর্তমান অস্বস্তিকর পরিবেশের প্রেক্ষাপটে। একদিকে আজ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জয়জয়কারের সুউচ্চ ধ্বনি, অন্যদিকে এক সর্বব্যাপী অস্থিরতা ও অশান্তি। সমগ্র মানবতা আজ সত্যিই দিশেহারা। এমতাবস্থায় আমরা অবশ্যই শিক্ষাঙ্গনে অব্যাহত জ্ঞানচর্চা প্রত্যাশা করি, কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে চাই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক চরিত্র পরিগঠনের যাবতীয় আয়োজন। মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং পরমত সহিষ্ণুতার মানসিকতা সৃষ্টি তথা সুষ্ঠু মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করবে আমাদের শিক্ষাঙ্গন। আর তা-ই যদি করতে হয়, তা হলে একদিকে যেমন প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্যা, নন্দনতত্ত্ব সহ মানববিদ্যার বিভিন্ন শাখার ওপর আরোপ করতে হবে সমান গুরুত্ব। অন্যথায় ঈপ্সিত বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের পরও আমরা ব্যর্থ হব ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করতে, বৈষয়িক সমৃদ্ধির মধ্যেও তখন দিকে দিকে বাজতে থাকবে দুঃখের এক করুণ সুর। বলা বাহুল্য, এ ধরনের এক নৈতিক ও মানবিক সংকটাবস্থায়ই আজ হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশ-সহ সমগ্র পৃথিবী। মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ জীবনের পূর্বশর্ত হিসেবে শিক্ষার মাধ্যমে হৃদয়বান মহৎপ্রাণ মানুষ তৈরির এই প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতে গিয়েই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা:অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে।
নির্মল কর, উজ্জ্বল কর, সুন্দর কর হে।

শিক্ষাবিস্তারে যুবসমাজের যে একটা মস্তবড় ভূমিকা আছে, একথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন ড. শহীদুল্লাহ এবং এ ব্যাপারে যুবসমাজের উদ্দেশ্যে তিনি তার অভিমত ব্যক্ত করেন ১৯২৮ সালে কলিকাতা আলবার্ট হলে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গীয় মুসলিম যুবক সম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে। মূর্খতা ব্যাধি প্রভৃতি আপদ দূর করায় এগিয়ে আসার জন্য ছাত্রদের আহ্বান করতে গিয়ে তিনি উদ্ধৃত করেন মহামতি টলস্টয়ের এই উক্ত: To civilize the people three things are necessary- schools, schools and schools. অর্থাৎ জনগণকে সভ্য করতে হলে তিনটি জিনিসের দরকার- বিদ্যালয়, বিদ্যালয় এবং বিদ্যালয়। তিনি যুবকদের বলেন : যে নিজে শিক্ষিত হয়ে অপরকে শেখায় না, সবচেয়ে বড় কৃপণ এ অর্থে যে, টাকাকড়ি দান করলে যেখানে কমে, সেখানে বিদ্যা ‘যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।” একই ভাষণে তিনি ছাত্রদের রাজনীতি শিক্ষার সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, আমাদের মতো একটি দরিদ্র দেশে যেখানে শিক্ষিতের হার এত কম, সেখানে অন্যান্য বিষয় শিক্ষার পাশাপাশি রাজনীতি শিক্ষাও অতি প্রয়োজনীয়- এত প্রয়োজনীয় যে, “দরকার হলে চাই কি তাদের (ছাত্রদের) সব পড়াশুনা ছেড়ে দেশের জন্য কোমর বেঁধে লেগে যেতে হবে।” কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনি ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিরোধী; কারণ তাঁর মতে “ছাত্রজীবনে রাজনীতি শিক্ষা (political training) এক কথা, আর রাজনীতি ক্ষেত্রে অংশ নেওয়া (active participation in politics) আর এক কথা।” তাঁর এমনটা ভাবার পক্ষে যুক্তি; “এই শেষ জিনিসটায় (রাজনীতিতে অংশগ্রহণ) এমন একটা নেশা আছে যে, তাতে মাতলে আর সব ভুল হয়ে যায়। ছাত্রদের পক্ষে সেটা মস্ত ক্ষতি; দেশের পক্ষেও সেটা মস্ত ক্ষতি।” পরিশেষে ছাত্রদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন; “মনে রেখো ছাত্রদল, রাজনীতিতে হাতে-কলমে যোগদানের জন্য সমস্ত জীবন পড়ে আছে, কিন্তু পড়াশুনার জন্য বেশী সময় নেই।”
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here