ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ

0
182

অনলাইন ডেস্ক: করোনায় কাজ হারিয়ে ঢাকা ছাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। একদিকে বাসা ভাড়া, অন্যদিকে খাদ্য ও নিত্যপণ্য জোগাড়ই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই কেউ কেউ পরিবার-পরিজনকে পাঠাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে। সে কারণে খালি হচ্ছে বহু বাসা, ফ্ল্যাট। এখন রাজধানীর বেশিরভাগ বাড়িতেই ‘বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে (টু-লেট)’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া খুঁজতে মহল্লার দোকানদারদের অনুরোধ করছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণাতেও মানুষের কাজ হারানোর চিত্র উঠে এসেছে।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর ঘুরে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঝুলছে বাড়ি ভাড়ার সাইনবোর্ড। গলির মোড় টু-লেট সাঁটানো বিজ্ঞাপনে ভরা। মোহাম্মদপুরের এক বাড়িওয়ালা জানান, তার বাসায় কখনও ফ্ল্যাট খালি থাকে না। অথচ তিন মাস ধরে তার একটি ফ্ল্যাট খালি। তিনি বলেন, আমাদের এ এলাকায় বাসা খুব কমই ফাঁকা থাকে। কিন্তু করোনার কারণে দৃশ্য পাল্টে গেছে।

বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরিরত শেওড়াপাড়ার এক ভাড়াটিয়া বলেন, বেতন নিয়মিত পাচ্ছি না। তাই বড় বাসা ছেড়ে ছোট বাসা খুঁজছি। তিনি বলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে ঢাকায় আছি, এবারের মতো দেখিনি- যখনই কোনো টু-লেট সাইনবোর্ড থেকে মোবাইল নম্বর নিতে গেছি, তখনই পাশ থেকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, ‘ভাই কেমন বাসা নেবেন? কয় রুমের, কয় তলায়?’ইত্যাদি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এদের অধিকাংশই বাড়ির মালিক।

রামপুরায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া থাকতেন কাকরাইলের একটি আবাসিক হোটেলের এক কর্মী। তিন মাস বেতন না পাওয়ায় ২৭ জুন পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন।

শেওড়াপাড়ার একটি ফার্মেসির মালিক আবদুল করিম জানান, তার পরিচিতি অনেক কাস্টমারকেই এখন দেখা যাচ্ছে না। তারা চলে গেছেন গ্রামে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী পোশাক কারখানায় যারা কাজ করতেন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি ‘ফাইন্ডিংস ফ্রম এ লার্জ অনলাইন সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেন সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ। এতে উঠে এসেছে- করোনার আগে কর্মহীন পরিবার ছিল ১৭ শতাংশ। এখন তা ৩০ শতাংশে ঠেকেছে। এর মধ্যে শ্রম শক্তিতেই নেই এমন পরিবার ১১ শতাংশ। ওই গবেষণায় উঠে আসে- মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে ছিল এমন পরিবারের আয় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। ১৫ হাজার টাকার নিচে উপার্জনকারীর আয় কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ৩০ হাজারের নিচে উপার্জনকারীর আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

‘শর্ট টার্ম ইফেকটস অব ইকোনমিক স্লোডাউন অ্যান্ড পলিসি রেসপন্স থ্রো সোসিয়াল প্রোটেকশন’ শীর্ষক আরেকটি গবেষণা করেছেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন। এতে উঠে আসে, চলতি বছর শেষে দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশ হতে পারে। যেটা বছরের শুরুতে ছিল ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে তা হবে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম সোমবার বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে এখনও অনেকেই দোকানপাট খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রায় বন্ধই আছে। এছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করতেন (যেমন দর্জি দোকানের কর্মচারী, বিভিন্ন দোকানের সেলসম্যান, বিউটি পার্লার, রেস্টুরেন্টের কর্মী, ড্রাই ক্লিনার্সের কর্মী ইতাদি) তারা করোনার শুরুতেই কাজ হারিয়েছেন। ফলে তারা বাধ্য হয়েই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। বেসরকারি অনেক চাকরিজীবীও তাদের পরিবারকে গ্রামে রেখে আসছেন। আবার গ্রামে ফিরেও শান্তিতে নেই। সেখানে হঠাৎ করেই তারা কৃষিতে লাগতে পারছেন না। কেননা অভ্যস্ত নয়। এরকম পরিস্থিতি একটা বাস্তবতা। করোনায় অর্থনীতি যে স্থবির তারই সাক্ষ্য বহন করছে। তবে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যদি অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা যায় ও সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করে তাহলেই আবার সবাই হয়তো ঢাকায় ফিরবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি মো. গোলাম রাহমান বলেন, এ সময় পরিস্থিতি অনেকটাই কঠিন হয়ে গেছে। ঢাকায় টিকে থাকতে না পেরে অনেকেই গ্রামে যাচ্ছেন। তবে বাড়ির মালিকদের উচিত সহানুভূতিশীল হওয়া। ভাড়াটিয়াদের কোনো কিছুতে বাধ্য না করা। তিনি আরও বলেন, সরকার নিম্ন আয়ের ভাড়াটিয়াদের জন্য বাড়ি ভাড়া বিষয়ক একটি স্কিম নিয়ে চিন্তা করতে পারে। তবে এর ব্যবস্থাপনা অনেক কঠিন হবে। কিন্তু মানুষকে টিকিয়ে রাখতে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here