দূতিয়ালিতে দ্যুতিময় নারী

0
15


মিজানুর রহমান: কারও দয়া বা অনুগ্রহে নয় বরং আপন আলোয়, নিজ মেধা-যোগ্যতায় কূটনীতিতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান করে নিয়েছেন নারীরা। ক’বছর ধরে গড়ে ৭-৮ জন রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার বহির্বিশ্বে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। শুধু তা-ই নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩ সচিব পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী কূটনীতিক। নেপালে বিমান দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে বহু ঝঞ্ঝা-ঝামেলা ঠেলে প্রায় ৫ বছর দেশটিতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী কূটনীতিক মাশফি বিনতে শামস চলতি বছর থেকে মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) হিসেবে কাজ করছেন।


অতীতে সচিব পদমর্যাদায় অনেকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করলেও হেড কোয়ার্টারে সচিব পদে কোনো নারীর নিয়োগ সম্ভবত এটাই প্রথম। যদিও গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে অহরহ নারীদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে ‘পররাষ্ট্র সচিব’ পদে এখনো কোনো নারী কূটনীতিককে দেখা যায়নি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে পেশাদার কূটনীতিক ইসমত জাহানের সিনিয়র সচিবের মর্যাদা পাওয়ার ঘটনাটি ছিল বেশ যুগান্তকারী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ডিপ্লোমেসিতে নারী-পুরুষের বিভাজন এখন আর তেমন নেই বললেই চলে।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও দুনিয়ার দেশে দেশে নারী রাষ্ট্রদূত পাঠানো শুরু করেছে। বাংলাদেশ তো অবলীলায় মধ্যপ্রাচ্যে নারী কূটনীতিক পাঠাচ্ছে, এমনকি মিশন প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও। রাজা-বাদশাদের দপ্তরের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পদায়নের রেকর্ড পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট যে, চ্যালেঞ্জিং হলেও কূটনীতিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মর্যাদার আসন করে নিয়েছেন। দূতিয়ালিতে দ্যুতিময় অবস্থান তাদের। পরিসংখ্যান মতে, বিদেশে ৮ জন নারী কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন, আছেন একজন কন্সাল জেনারেল, ৫ জন উপ-রাষ্ট্রদূত বা মিনিস্টার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। কাউন্সেলর এবং দূতালয়ের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সচিব মিলে ডিপ্লোমেসির কোর দায়িত্বে রয়েছেন আরো অন্তত ৩০ নারী কূটনীতিক। দুনিয়ার দেশে দেশে কূটনীতিক অ্যাসাইনমেন্ট করে ঢাকায় ফিরেছেন কিংবা পোস্টিং পারফর্ম করার ট্রেনিং বা প্রস্তুতিকর্ম সম্পন্ন করে হেড কোয়ার্টারে কর্মরত আরো ৫৩ জন নারী কূটনীতিক। যার মধ্যে সচিব (পূর্ব) ছাড়াও আছেন মহাপরিচালক পদে ৪ জন, পরিচালক পদে ১৩ জন, সিনিয়র সহকারী সচিব পদে ৯ জন এবং সহকারী সচিব এবং ট্রেইনি মিলে আরো ২৮ জন নারী কর্মকর্তা। রেকর্ড বলছে, হেড কোয়ার্টার এবং মিশন মিলে ৩ শতাধিক কূটনীতিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশই এখন নারী। দু’একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া ফরেন সার্ভিসে পুরুষের তুলনায় নারী কর্মকর্তাদের রেকর্ড সমুজ্জ্বল।


তবে মন্দ ঘটনা বিশেষত শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অসদাচরণ এবং দুর্নীতিতে কতিপয় নারী কর্মকর্তার বেপরোয়া ভাব অন্য নারী সহকর্মীদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। কূটনৈতিক অ্যাসাইনমেন্টে থাকা অবস্থায় এমনটি ঘটলে দেশের ভাবমূর্তিতে টান পড়ে। অবশ্য সরকার এসব বিষয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলে। যার কারণে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এমনও ঘটনা আছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক কূটনীতিককে (নারী) দুনিয়ার পশ্চিমপ্রান্ত থেকে পূর্বপ্রান্তে নিয়ে আসতে হয়েছে! মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তার মূল্যায়ন অবশ্য ভিন্ন। তার মতে, নারী বা পুরুষের বিচারে নয়, অপরাধী অপরাধীই। তাছাড়া মন্দ খবর চাউর হয় বেশি। সেই খবরের সঙ্গে কোনোভাবে নারী সম্পৃক্ততা থাকলে তা হয়ে যায় হেডলাইন! তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে ইতিবাচক অনেক খবর বিশেষত নারীদের অর্জন যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা চোখে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই কর্মকর্তার মতে, পররাষ্ট্র সার্ভিসে থাকা পুরুষ সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে।


বাংলাদেশের সমাজেও নারীর প্রতি অবহেলার মনোভাবের বদলে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তিন দশকে অনেক কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। প্রাসঙ্গিকভাবে পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে ৮০-এর দশকে সার্ভিসে আসা নাসিম ফেরদৌসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার তীর্যক মন্তব্যকে স্মরণ করেন ওই নারী কূটনীতিক। বলেন, সেদিন ঊর্ধ্বতনের মন্তব্য তাকে অবাক করেছিল। বিবিসি’র সঙ্গে আলাপে তিনি নিজেই সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। সেদিন তাকে বলা হয়েছিল, আপনি কেন এসেছেন একজন পুরুষের জায়গা নষ্ট করতে? আপনি তো বিয়ে করার পর বাচ্চা হলে আর অফিসে আসবেন না, তখন জায়গাটা নষ্ট হবে!


ঊর্ধ্বতনের কথা ভুল প্রমাণ করে নাসিম ফেরদৌস তার ক্যারিয়ারে রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত হয়েছিলেন। ১৯৭৭ পাবলিক সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিয়ে (দু’বছর পর) প্রথম নারী হিসেবে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন নাসিম ফেরদৌস। ওই বছরে মোট ১০ জন নারী সিভিল সার্ভিসে চান্স পেয়েছিলেন। একমাত্র তিনিই ছিলেন ফরেন সার্ভিস, বাকিরা অন্য ক্যাডারে। ’৭৯ সালে পররাষ্ট্র সার্ভিসে প্রথমবারের মতো নারী কূটনীতিকের অন্তর্ভুক্তির তিন দশক পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন কূটনীতির মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা পুরুষের চেয়ে মেধা-দক্ষতায় পিছিয়ে আছে এমনটা বলার কোনো অবকাশ নেই। গৌরবোজ্জ্বল সেই রেকর্ডের ধারাবাহিকতায় অচিরেই নারী পররাষ্ট্র সচিব পাওয়ার আশা করছে সেগুনবাগিচা।
নারী কূটনীতিকদের মধ্যে আলোকিত যারা-


বর্তমানে যে আটজন পেশাদার কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার হিসেবে বিদেশে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন তারা হলেন- জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা, লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনীম, পোল্যান্ডে সুলতানা লায়লা হোসেইন, মরিশাসে রেজিনা আহমেদ, দক্ষিণ কোরিয়াতে আবিদা ইসলাম, জর্ডানে নাহিদা সুবহান, ভিয়েতনামে সামিনা নাজ এবং ব্রুনাই দারুস সালামে নাহিদা রহমান সুমনা। এ ছাড়া একমাত্র কনসাল জেনারেল হিসেবে নিউ ইয়র্কে দু’বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন কূটনীতিক সাদীয়া ফয়জুন্নেছা। ওয়াশিংটনে মিশন উপ-প্রধান হিসেবে আছেন ফেরদৌসি শাহরিয়ার, ব্যাংককে মিনিস্টার পদে দায়িত্বপালন করছেন কূটনীতিক শাহনাজ গাজী, ইন্দোনেশিয়ায় কাজী আনারকলি, জেনেভা মিশনে সঞ্চিতা হক এবং নেপালে মিনিস্টার পদে আছেন ইসরাত জাহান।


স্মরণ করা যায়, পেশাদার কূটনীতিক না হয়েও রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রথম নারী হাইকমিশনার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তাহমিনা খান ডলি। শ্রীলঙ্কাতে প্রায় দু’বছর (১৯৮০-৮১) তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্য থেকে প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন মাহমুদা হক চৌধুরী। তিনিও পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না। মিজ চৌধুরী ১৯৯৬ থেকে ’৯৮ অবধি ভুটানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত আরও অন্তত ৩ জন বাংলাদেশি নারী রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন- নেদারল্যান্ডস প্রবাসী রাজনীতিবিদ শেলী জামান (১৯৯৯-২০০১ স্পেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) শিক্ষাবিদ সেলিনা মোহসিন এবং ইয়াসমিন মোর্শেদ। ’৭৯ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেয়া প্রথম নারী কূটনীতিক নাসিম ফেরদৌসকে ২০০২ সালে রাষ্ট্রদূত করে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। পেশাদার কূটনীতিক থেকে রাষ্ট্রদূত হওয়া প্রথম নারী তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে অনেক ক্যারিয়ার ডিপ্লোমেট রাষ্ট্রদূত বা হাই কমিশনার হয়েছেন এবং হচ্ছেন। যার অন্যতম নাসিমা হায়দার এবং মাজেদা রফিকুন্নেছা। তবে সম-সাময়িকদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছিল রাষ্ট্রদূত ইসমাত জাহানের। ’৮২ ব্যাচের ওই কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় নিউ ইয়র্ক এবং ব্রাসেলসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরবর্তীতে সরকারের কাছ থেকে ছুটি (লিয়েন) নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ওআইসি’র দূত হিসেবে কাজ করেন তিনি।
সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here