দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত

1
1108

ড. মুহাম্মদ নাছিরউদ্দীন সোহেল

আজ থেকে ৩৫ বছর পূর্বে রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)-এর চির শান্তির ধর্ম মোহাম্মদী ইসলামকে জগতের বুকে প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে আমার মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুবু-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বখ্যাত এই দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠার বিশেষ পটভূমি রয়েছে। দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত নিম্নে উপস্থাপন করা হলো-

আমার মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান তাঁর স্বীয় মোর্শেদ পিরানে পির দস্তগির সুলতানুল মাশায়েখ সুলতানিয়া মোজাদ্দেদিয়া তরিকার ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (রহ.)-এর দরবারে থেকে দীর্ঘ ১২ বছর গভীর সাধনা ও রিয়াজতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর পরিচয় লাভ করেন। অতঃপর ১৯৮৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর, রহমতের সময় তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মোজাদ্দেদ’ তথা সংস্কারকের সুমহান দায়িত্ব লাভ করেন। এই মহান দায়িত্ব লাভ করার ৩ মাস ১২ দিন পর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে ২৮ মার্চ, বুধবার ইমাম হুজুর ওফাত লাভ করেন। ইমাম হুজুরের ওফাত লাভের পর সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান ১ বছর তাঁর মোর্শেদের পরিবারবর্গ, আশেকান ও জাকেরান এবং চন্দ্রপাড়া দরবার শরীফ অত্যন্ত সফলতার সাথে পরিচালনা করেন। অতঃপর তিনি জগতময় মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারের বৃহত্তর স্বার্থে ১৯৮৫ সালের ২৮ মার্চ, বৃহস্পতিবার ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় আসার পরদিন ১৯৮৫ সালের ২৯ মার্চ, শুক্রবার সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত মুরিদ সন্তান আশেকে রাসুল মরহুম মো. শফিউদ্দীন সাহেবের রতন মেটাল ভবনের ছাদে ওরস শরীফ উদযাপনের মধ্য দিয়ে মোহাম্মদী ইসলামের স্বর্ণালি অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেন। ঐ ওরস মোবারকে এতো বেশি ফায়েজ ওয়ারেদ হচ্ছিল যে, উপস্থিত প্রায় সবারই জজবাহ হয়ে যায়। সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান যখন আখেরী মোনাজাত করছিলেন, সেসময় ইমাম হুজুরের অলৌকিকভাবে উপস্থিত হওয়ার ঘটনা আশেকান ও জাকেরানের মাঝে দারুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে মোর্শেদ প্রেমিকদের বুঝতে বাকি ছিল না যে, ইমাম হুজুর রূহানিতে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের সাথে ঢাকায় চলে এসেছেন।

মোহাম্মদী ইসলামের প্রথম ওরস মোবারক সফলতার সাথে উদযাপনের পর ১৯৮৫ সালে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান ঢাকার মতিঝিলের ১৫৪ আরামবাগে মোহাম্মদী ইসলামের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ বছরই তিনি নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগে ‘বাবে জান্নাত’ নামে দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। সেদিন ছিল ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিন। উল্লেখ্য যে, ৬১ হিজরি, ১০ মহররম, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-কে দূরাচার এজিদ বাহিনী কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে নির্মমভাবে শহিদ করে। নবি দৌহিত্রকে শহিদ করার মধ্য দিয়ে মোহাম্মদী ইসলামের স্বর্ণালি সূর্যের অস্তমিত ঘটে। মহান আল্লাহর অপার দয়ায় কারবালার নির্মম ঘটনার ১৩০৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৫ সালের ১০ মহররম, সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এজিদ বিন মুয়াবিয়া-এর চক্রান্তে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মোহাম্মদী ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ জগদবাসীর নিকট তুলে ধরেন। দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান ‘দেওয়ানবাগী’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, সুমহান শিক্ষা, আদর্শ, সংস্কার, ধর্মীয় দর্শন ও মানবতাবাদী দর্শনে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত মোহাম্মদী ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসতে থাকেন। জগৎশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের প্রধান ৪টি শিক্ষা যথা-আত্মশুদ্ধি, দিলজিন্দা, নামাজে হুজুরি ও আশেকে রাসুল হওয়ার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে বহু মুক্তিকামী মানুষ হযরত রাসুল (সা.)-এর দিদার লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর মুরিদানের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রমবর্ধমান আশেকে রাসুলদের জোয়ারের সাথে সঙ্গতি রেখে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান দেওয়ানবাগ শরীফের অধীনে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা প্রচারের জন্য সর্বমোট ১১টি দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন।

সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান ১৯৮৫ সালে দেওয়ানবাগে বাবে জান্নাত প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের কমলাপুরে ১৯৮৭ সালে বাবে মদীনা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি ১৯৯২ সালে বাবে রহমত ভবন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১৫৪ আরামবাগ থেকে মোহাম্মদী ইসলামের অস্থায়ী কার্যালয় স্থায়ীভাবে বাবে রহমতে স্থানান্তরিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি-

  • ১৯৯৫ সালে রংপুরে বাবে নাজাত;
  • ১৯৯৮ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে বাবে বরকত;
  • ২০০৬ সালে চুয়াডাঙ্গায় বাবে নেয়ামত;
  • ২০০৮ সালে স্বীয় জন্মভূমির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাহাদুরপুরে বাবে মোর্শেদ;
  • ২০০৯ সালে ঢাকার মগবাজারে বাবে ফেরদৌস;
  • ২০১০ সালে চট্টগ্রামে বাবে মাগফিরাত ও গাজীপুরে বাবে জান্নাতুল মাওয়া এবং সর্বশেষ
  • ২০১১ সালে রাজশাহীতে বাবে নূর দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন।

বেলায়েতের যুগের অলী-আল্লাহগণের গৌরবময় জীবনী মোবারক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইতঃপূর্বে কোনো অলী-আল্লাহ এতগুলো দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেননি। মূলত বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যেন সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করে আশেকে রাসুল হতে পারেন, এই লক্ষ্যে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সর্বমোট ১১টি দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলের আশেকে রাসুলগণ যেন মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা নিয়মিত অনুশীলন করতে পারেন, সেজন্য তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায়, গ্রামে, ইউনিয়নে এবং শহরে শত শত খানকা শরীফ ও আশেকে রাসুল জাকের মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের মুরিদ সন্তানেরা তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদেরকে ষড়রিপুর বেড়াজাল থেকে মুক্ত করত সত্যিকারের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করছেন।

সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত হননি, তিনি গোটাবিশ্বে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও প্রসারের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর উপর অর্পিত সুমহান দায়িত্ব সফলতার সাথে পালনের লক্ষ্যে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বিশ্বের শতাধিক দেশের মানুষ মোহাম্মদী ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করে আশেকে রাসুল হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। জগৎশ্রেষ্ঠ এই মহামানব সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, জাপান, সুইডেন, ইতালি, গ্রিস, সাইপ্রাস দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র-সহ পৃথিবীর শতাধিক দেশে খানকা শরীফ ও আশেকে রাসুল জাকের মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি বহির্বিশ্বে মোহাম্মদী ইসলামের সুমহান আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে World Ashek-e-Rasul Organization প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে World Ashek-e-Rasul Conferenc অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত World Ashek-e-Rasul Conferenc-এ মেজো সাহেবজাদা ইমাম ড. আরসাম কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুর, সেজো সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. ফজল-এ-খোদা (মা. আ.) হুজুর ও কনিষ্ঠ সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা (মা. আ.) হুজুর অংশগ্রহণ করেন। সেই কনফারেন্সে তাঁদের সফরসঙ্গী হিসেবে আমারও যোগদানের সুযোগ হয়। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন প্রদেশে বেশ কয়েকটি কনফারেন্সে সাহেবজাদা হুজুরগণ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের সুমহান শিক্ষা, সংস্কার ও অলৌকিক কারামতের উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে বহু মালয়েশিয়ান নাগরিক মোহাম্মদী ইসলামের সবক গ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব আশেকে রাসুল (সা.) সম্মেলন-এ বহু সংখ্যক মালয়েশিয়ান নাগরিক অংশগ্রহণ করে থাকেন। শুধু মালয়েশিয়ায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আশেকে রাসুলগণ বিশ্ব আশেকে রাসুল (সা.) সম্মেলন-এ স্বতঃস্ফুর্ততার সাথে অংশগ্রহণ করে থাকেন। আনন্দের বিষয় এই যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা মোহাম্মদী ইসলামের বাংলা মিলাদ শরীফকে তাদের স্ব স্ব ভাষায় অনুবাদ করে নিয়মিত পাঠ করছেন। এর মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোহাম্মদী ইসলামের এক নবজাগরণ সূচিত হয়েছে।

বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘ইবর’ গ্রন্থে-এই মন্তব্য করেন- ‘‘Islam was risen in Makkah, was spread out in Madinah, was fallen sick in Kufa, was expired in Damascus and it was put into the grave in Baghdad.” অর্থাৎ- “ইসলামের অভ্যুদয় ঘটেছে মক্কায়, পরিপূর্ণতা লাভ করেছে মদীনায়, রোগাগ্রস্থ হয়েছে কুফায়, মৃত্যুবরণ করেছে দামেস্কে এবং কবরস্থ হয়েছে বাগদাদে।” আমি বিশ্বাস করি ২০০-৩০০ বছর পরে মোহাম্মদী ইসলাম নিয়ে যারা গবেষণা করবেন তখন তারা ইবনে খালদুনের এই বিখ্যাত মন্তব্যের সাথে আরেকটি বাক্য সংযোগ করে দিবেন- বাগদাদে কবরস্থ হওয়ার পর মোহাম্মদী ইসলাম পুনর্জীবন লাভ করেছে বাংলাদেশে। আর মোহাম্মদী ইসলামকে পুনর্জীবিত করেছেন বাংলা মায়ের গর্বিত সন্তান সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান।

পরিশেষে এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান বেলায়েতের যুগে সর্বাপেক্ষা সফল অলী-আল্লাহ। তিনি মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারের যে সুমহান দায়িত্ব নিয়ে জগতের বুকে প্রেরিত হয়েছেন, তা অত্যন্ত সফলতার সাথেই পালনের মাধ্যমে হেরাগুহা থেকে উৎসারিত হযরত রাসুল (সা.)-এর মোহাম্মদী ইসলামকে বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। আমিন।
[ লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here