দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভের পানি

0
36

রাজশাহী সংবাদদাতা: স্ত্রী চানমনির কোলে শিশু কন্যা আঁখি সরেন। আর সরল সরেনের (২৭) কাঁধে খাওয়ার পানির ভার। এক কিলোমিটার দূর থেকে এই পানি কিনে আনছেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর তানোরের উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের আলপথ বেয়ে এভাবেই তাঁদের পানি নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়। ১০ বছর ধরে গ্রামের হস্তচালিত নলকূপগুলো অচল। সাবমার্সিবল পাম্প থেকে পানি তুলে গ্রামবাসীর কাছে বিক্রি করা হয়।


সম্প্রতি পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) ভূগর্ভস্থ পানির জরিপ করে উচ্চাডাঙ্গায় ভয়াবহ চিত্র পেয়েছে। এ খবর এখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে। ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচকাজ চালাচ্ছে। এর ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। প্রতিবছর যে পরিমাণ নিচে নেমে যাচ্ছে, তা আর পুনর্ভরণ হচ্ছে না। রাজশাহী বিভাগে এখনো তাদের ৮ হাজার ৮২৬টি নলকূপ চালু রয়েছে।


ওয়ারপো জনমতের ভিত্তিতে রাজশাহীর তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলার ১২৫টি ইউনিয়নের ৫০টি জায়গায় এই জরিপ চালিয়েছে।


গত ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে ওয়ারপোর পক্ষ থেকে তানোর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ মূল্যায়ন খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এই কর্মশালা থেকে জানা যায়, তানোরে সব ইউনিয়নেই পানির স্তর অনেক নিচে। তার মধ্যে বাধাইড় ইউনিয়নের উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের পানির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এখানে মাটির নিচে মোটা বালু, চিকন বালু ও মিহি বালুর স্তরে পানি থাকে। মোটা বালুর স্তরের পানি আহরণ করা যায় এবং তা পানযোগ্য। উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের ১২০ থেকে ১২৬ ফিট পর্যন্ত বোরিং করে পানি পাওয়া গেছে কিন্তু সেখানে পানির সঙ্গে চিকন ও মিহি বালু রয়েছে। তারপর ১ হাজার ৪৬০ ফুট পর্যন্ত পানির কোনো অ্যাকুইফার (জলাধার) পাওয়া যায়নি।

গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ফাঁকা জমি পড়ে রয়েছে। অল্প কিছু জমিতে চৈতালির আবাদ করা হয়েছে। কৃষক মোবারক আলী (২৬) বললেন, বর্ষায় ভালো বৃষ্টি হলে ধান হয়। তারপর জমি পড়ে থাকে। গ্রামে বিএমডিএর তিনটি গভীর নলকূপ রয়েছে। আগে একটি নলকূপের অধীনে ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যেত। আগের মতো আর পানি ওঠে না। এখন ৫০ বিঘা জমিতেও পানি দেওয়া যায় না। এক ঘণ্টা পানি নিতে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা খরচ পড়ে।


তানোর উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূগর্ভস্থ আরএসএস-৩২ নম্বর কূপ রয়েছে। ১৯৮৪ সাল থেকে এই কূপের পানির পরিমাপ নেন কূপ পর্যবেক্ষক আহমেদ আলী। তিনি বললেন, আগে ৮ থেকে ১০ ফুটের মধ্যেই পানি পেতেন। এখন মিটারের মাপ হয়েছে। গত বছর সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৫ মিটার নিচে নেমেছিল পানির স্তর। প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে।


আর উঠছে না। এবার এখনো বোরো মৌসুম শুরু হয়নি। ইতিমধ্যে গত সোমবার ১৯ দশমিক ৮৫ মিটার নিচে পানি পাওয়া গেছে। এবার শেষ পর্যন্ত পানি হয়তো ২১ মিটার নিচে চলে যাবে। যেখান থেকে আর উঠবে না।

উচ্চাডাঙ্গায় এখনো কেন গভীর নলকূপ চলছে, জানতে চাইলে বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশীদ বলেন, নতুন করে কোনো নলকূপ বাসানো হচ্ছে না। যে কয়টি চলমান, পানি না পেলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।


ওয়ারপোর এই প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য পানিসম্পদের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে অর্থাৎ এই এলাকায় কী পরিমাণ পানি আছে, তা জানতে হবে। এ জন্য তাঁরা জরিপ করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here