ধর্ম ও মনুষ্যত্ব

0
199

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) কবিগুরু নামে খ্যাত। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর কবি-হৃদয়ে দার্শনিক যুক্তির চেয়ে প্রত্যক্ষ অনুভূতির প্রাধান্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে তিনি কাব্যিক অনুভূতির চাপে দার্শনিক যুক্তি-বিচারের পথ পরিহার করেননি। “তিনি দার্শনিকের মতো চিন্তা করেননি, অথচ তাঁর চিন্তা যুক্তিহীন ভাবালুতায় দুর্বল নয়। তাঁর মধ্যে এমন একটি সূক্ষ্ম বোধশক্তি ছিল যা তাঁর সমস্ত কল্পনার মধ্যে মনস্বিতা সঞ্চার করেছে। অন্ধ আবেগের বদলে (Philosopher-poet) হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর সাহিত্যকর্মে একদিকে যেমন উপস্থিত কবিহৃদয়ের প্রগাঢ় অনুভূতি, অন্যদিকে তেমনি স্পষ্ট আদর্শবাদী জীবনদর্শনের রূপ-স্বরূপ।

একথা মাথায় রেখেই আমরা এখন সংক্ষেপে আলোচনা করব কবিগুরুর ধর্মদর্শনের মানবিক তাৎপর্য নিয়ে। শুরু করি এভাবে যে কোনো বস্তুরই একটা স্বকীয়তা বা নিজস্ব ধর্ম আছে। ঠিক তেমনি মানুষের একটা নিজস্ব ধর্ম আছে, আর এটি হলো মানবধর্ম-মনুষ্যত্ব। পানির যেমন পানিত্ব থাকা অপরিহার্য, তেমনি মানুষের মনুষ্যত্ব থাকতে হয়। তবে মনুষ্যত্ব এমনিতে আসে না। পশু যেখানে তার পশুত্ব পায় জন্মসূত্রে, মানুষকে তার মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয় চেষ্টা সাধনা দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: “ধর্ম মানেই মনুষ্যত্ব-যেমন আগুনের ধর্ম অগ্নিত্ব, পশুর ধর্ম পশুত্ব, তেমনি মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা।” মানুষ কথায় ও কাজে এক হবে, স্বভাবে ও চরিত্রে সংযমী হবে, অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে এসবই- মানবধর্মের মৌলিক উপাদান। এগুলো না থাকলে আমরা কাউকে ভাল মানুষ বলি না, বলতে পারি না। তখন বলি অমুক লোক বড় বিদ্বান বটে, কিন্তু কিছুতেই ভালো মানুষ নয়। তার কারণ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি যত উন্নত জ্ঞানই দিক-না কেন, মানবধর্মের অনুশীলন না থাকলে সমাজ ও সভ্যতা হীন-জঘন্য রূপ নিয়ে দেখা দেয়। আর এ জন্যই উন্নত সমাজ গড়তে হলে, যথার্থ সভ্যতার অধিকারী হতে হলে, দয়া মায়া প্রেম সহানুভূতি প্রভৃতি মহৎ মানবিক গুণ তথা মানবধর্মের মনন ও অনুশীলন অপরিহার্য। এ অর্থেই বলা হয়, মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। যে ধর্মকর্মের অর্থ মানুষের অনিষ্ট করা, প্রকৃত ধর্ম নয়, ধর্মের ছদ্মবেশী কুসংস্কারমাত্র। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থেই এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়।

ধর্ম বলতে রবীন্দ্রনাথ নিছক আচার-অনুষ্ঠান পালন, মোক্ষমসাধনা কিংবা পরলোকচর্চাকে বোঝেননি, বোঝেছেন সমগ্র জীবনচর্চাকে। তাঁর ভাষায় : “আমরা চর্চা করি এমন এক ধর্ম যেখানে- “সামাজিক কর্তব্যতন্ত্র… রিলিজিয়ন, পলিটিক্স, সমস্তই আছে।” ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও উপসনার ব্যাপারই নয়, জীবন সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণাও বটে। ধর্ম মানে দেহ-মন-বুদ্ধি-ইচ্ছার সামগ্রিক কর্ষণ, সমগ্র জীবনচর্চা-সমাজ ও বিশ্বমানবতার কল্যাণচিন্তা। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ ধর্মকে পূর্বাপর দেখেছেন মানুবমুক্তির উপায় হিসেবে। তাইতো কবি বলেন : জীবনের প্রতি বিমুখ মনেপ্রাণে যুক্ত করায় এবং জ্ঞান ও প্রীতির প্রেরণা নিয়ে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ায়। এ প্রসঙ্গে কবিগুরুর অমর বাণী :
বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ।

ধর্মপথে সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণ সাধনের যে প্রয়াস আধুনিক বাঙালি মনীষীদের মধ্যে স্পষ্ট, রবীন্দ্রনাথে তার সার্থক প্রতিফলন লক্ষণীয়। তাঁর ধ্যান-ধারণা ও ভাব-কল্পনা একান্তভাবেই সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদ, আচার-পদ্ধতি ও আনুষ্ঠানিকতার বিরোধী। মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও একাত্মবোধের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সব ‘মানুষের সমান বয়সী’ সব মানুষের স্ব-জাতি হয়ে থাকার। ধর্ম প্রচার-এ তিনি বলেন, “সংসারে একমাত্র যাহা সমস্ত বৈষম্যের মধ্যে ঐক্য, সমস্ত বিরোধের মধ্যে শান্তি আনয়ন করে, সমস্ত বিচ্ছেদের মধ্যে একমাত্র যাহা মিলনের সেতু তাহাকেই ধর্ম বলা হয়। তাহা মনুষ্যত্বের এক অংশে অবস্থিত হইয়া অপর অংশের সহিত কলহ করে না- সমস্ত মনুষ্যত্ব তাহার অন্তর্ভুক্ত।” ‘শুদ্ধাচারে যোগাসনে’ নয় আত্মত্যাগ ও সেবাকর্মের মাধ্যমেই মানুষ পারবে পরিপূর্ণতা লাভ করতে। এই অনুভূতিতেই কবি দার্শনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন Religion of Man শীর্ষক তাঁর বিখ্যাত হিবার্ট বক্তৃতায়।

এই একই বক্তব্যের ভাব তিনি প্রকাশ করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত মানুষের ধর্ম নামক বক্তৃতামালায়। ধর্ম মানে সামগ্রিক জীবনচর্চা, মনুষ্যত্বের বহুমুখী বিকাশ- রবীন্দ্রনাথের এ মত ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে সাম্প্রতিক ও হালের ধর্মবেত্তা ও দার্শনিকদের কাছ থেকে। যেমন, এ মতেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের বিশিষ্ট প্রবক্তা কাজী আব্দুল ওদুদের (১৮৯৪-১৯৭০) ‘বিকাশধর্ম’ নামক মতবাদে। তাঁর মতে, ‘তাই ধর্ম যা জীবনের বিকাশের সহায়ক, আর তাই অধর্ম যা তেমন সাহায্য করে না।” এ ধর্মের উদ্বোধন ঘটে জ্ঞান ও উপলব্ধির মাধ্যমে এবং এর মূল লক্ষ্য থাকে, মানব কল্যাণের দিকে। এ অর্থে এই ধর্ম প্রকৃতই মানবধর্ম। যে ধর্মে পরিবর্তনের অনুমোদন নেই, বা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর, সে ধর্মকে ওদুদ সমালোচনা করেছেন আচারপূজা বলে।

আমি নিজেও মনে করি যে, ধর্ম ও দর্শন উভয়েরই লক্ষ্য জীবন- সত্য, সুন্দর ও কল্যাণময় জীবন। যথার্থ দর্শন যেমন জীবনদর্শন, তেমনি যথার্থ ধর্মও মানবধর্ম। যে ধর্মকর্মের অর্থ নিছক তপজপ কিংবা মানুষের অকল্যাণ সাধন, সে ধর্ম প্রকৃত ধর্ম নয়, ধর্মের ছদ্মবেশী কুংসংস্কারমাত্র। মানবজীবনের সার্থকতা ও পরিপূর্ণতা নিহিত দয়া মায়া প্রেম সহানুভূতি প্রভৃতি গুণ অনুশীলন, মনুষ্যত্বের মর্যাদা সুরক্ষা সমুন্নত করায়। তাইতো রবীন্দ্রনাথ জীবনকে দেখেছেন প্রেমের লীলা হিসেবে, মানুষকে পরামর্শ দিয়েছেন জ্ঞান, প্রেম ও কর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপনের, প্রেমসংস্পৃষ্ট কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য। কারণ, তাতে করেই সম্ভবত মনুষ্যত্বের বিকাশ, তাতেই পাওয়া যায় সীমার মধ্যে অসীমের প্রত্যক্ষ পরশ। তবে মনে রাখতে হবে যে, একক মনুষ্যত্বের মুক্তি নেই, মুক্তি নিহিত সমগ্র মানবসমাজের পূর্ণ প্রকাশে। একটি প্রদীপ যেমন রাতের অন্ধকার ঘোচাতে পারে না, তেমনি একক ব্যক্তির চেষ্টায়ও সমাজের ব্যাপক কল্যাণসাধিত হয় না। এর জন্য চাই সব মানুষের সমবেত প্রচেষ্টা। এটাই মানুষের পূর্ণতার সাধনা, এটাই মানবধর্মের মূল কথা। এ ধর্মকর্মের অভাবেই আজ দিকে দিকে এত হাহাকার, বিপুল বিত্তের মধ্যে এক মহাশূণ্যতা।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি, বিশ্বমানবতার কবি। তিনি বাঁচতে চেয়েছেন এই পৃথিবীর মানুষের মাঝে, সীমার মাঝে পেতে চেয়েছেন অসীমকে। তাঁর মতে, এই বিশাল বিশ্বকে আমরা যে একান্ত আপন করে নিয়েছি, তার কারণ এখানে অবশ্যই একটা ঐক্য বিদ্যমান। সুতরাং, অনাবিল সুখ-শান্তির খাতিরে বিসর্জন দিতে হবে অহমিকা, পরিহার করতে হবে সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা, প্রশস্ত করতে হবে প্রীতি ও প্রেমের অনুভূতিকে। মনে রাখতে হবে যে, জ্ঞানহীন কর্ম মানুষকে অধঃপতিত করে পশুত্বের স্তরে, আর প্রেমহীন কর্ম তাকে ঠেলে দেয় হিংস্রতার দিকে। জ্ঞান আমাদের কর্মে সৃষ্টি করে নিখিল বিশ্বের ঐক্য ও অখন্ডতাবোধ। সেই বোধ থেকে যখন সঞ্চারিত হয় প্রীতি, তখনই আমরা ব্রতী হই পরহিতসাধনে, তখনই উদ্বুদ্ধ হই বিশ্বমানবতাবোধে। কর্মের সঙ্গে যখন সংযোগ ঘটে প্রীতির, তখনই আমরা আনন্দ পাই পরহিতে, মা যেমনটি পান তার সন্তানের সেবা করে। এহেন প্রীতি ও প্রেমের মাধ্যমে সমগ্র জগৎকে সুন্দর ও সংহত করার প্রত্যয়ই কবি ব্যক্ত করেছেন পুরস্কার কবিতার একটি ছত্রে:
সংসার-মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাবো করিয়া মধুর,
দু-একটি কাঁটা করি দিব দূর-
তার পরে ছুটি নিব।

[লেখক : অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দর্শন বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের প্রাক্তন ডিন, উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সভাপতি, গোবিন্দদেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রাক্তন সহ-সভাপতি]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here