নজরুল দর্শনে মানবধর্ম ও মানবকল্যাণ

1
279

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম

লক্ষ করলে দেখা যায় যে, একজন একপেশে চরম অহংবাদীর ন্যায় নজরুল কেবল আত্মসত্তার মহিমা বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়ে যাননি। সমান গুরুত্বের সঙ্গে তিনি বর্ণনা করেছেন মানুষের সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্বের কথা। এ অঞ্চলের যে বিশাল জনগোষ্ঠীর মাথা ছিল অবনত, তাদের নজরুল সাহস দিয়ে বলেন : ‘উঠ, বল চিরউন্নত মমশির’। স্বদেশ ও স্বজাতির দুঃখ-গ্লানি, পরাজয়-পরাভবে গভীর মর্মবেদনা বোধ করে তিনি অনেকটা অভিযোগের সুরে বলেন:
কাণ্ডারী, তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জন।

নজরুল জানতেন Charity begins at home; আর তাই তিনি তাঁর মানবতাবাদী অভিযান শুরু করেন ‘আমি’ বা আত্মসত্তাকে মহিমান্বিত করার এবং স্বদেশ-স্বজাতির কল্যাণে আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য কেবল এই আত্মসত্তা কিংবা এই স্বদেশ স্বজাতির স্বার্থ সুরক্ষা নয়- তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য নিখিল বিশ্বের বেদনালাঞ্ছিত মানুষের ব্যাপক ও স্থায়ী কলাণ। তাই তো ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার আলবার্ট হলে তাঁর সম্মানে আয়োজিত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদত্ত মানপত্রের জবাবে কবি বলেন : “আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের। … যে কুলে যে সমাজে যে ধর্মে যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই আমি কবি।”

নিখিল বিশ্বের সব মানুষের সেবা ও কল্যাণের প্রয়োজনীয়তার প্রতি ইঙ্গিত করে কবি যৌবনের গান-এ আরও বলেন : “যাহারা মানবজাতির কল্যাণসাধন করেন সেবা দিয়া, ধর্ম দিয়া তাহারা মহৎ। … আমরা সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ধর্মের, সকল কালের। আমরা মুরীদ যৌবনের। এই জাতি ধর্ম কালকে অতিক্রম করিতে পারিয়াছে যাহাদের যৌবন, তাহারাই আজ মহামানব, মহাত্মা, মহাবীর। তাহাদিগকে সকল দেশের সকল ধর্মের সকল লোক সমান শ্রদ্ধা করে।”

নজরুল যে দরদ ও আন্তরিকতা দিয়ে, যে ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে মানবজাতির ঐক্য ও অখণ্ডতার জয়গান করেছেন তাতে নিঃসন্দেহে তাঁকে অভিহিত করা যায় বিশ্বমানবতার কবি হিসেবে। তিনি নিপীড়িত মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছেন পূর্বাপর। তাঁর মতে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে অনৈক্য দুঃখজনক। হিন্দু মুসলিম, অভিজাত অপজাত, প্রভু ভৃত্য প্রভৃতি বৈষম্যসৃষ্টির মাধ্যমে মানবজাতির অখণ্ডতাকে অস্বীকার করা অমার্জনীয় অপরাধ। তাই তো কবি তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন :
গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিষ্টান।

নজরুলের মতে, বিভিন্ন ছল-ছুতায়, বিশেষত ধর্মের নামে বিভেদ বৈষম্য সৃষ্টির যে কোনো প্রয়াস অন্যায় অমানবিক। মানুষে মানুষে বৈষম্যসৃষ্টি প্রকৃত ধর্মের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম কেবল কিছু মন্ত্রতন্ত্র কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপার নয়। কারণ, শেষ বিশ্লেষণে ধর্মমাত্রেরই লক্ষ্য মানবকল্যাণ। যিনি কল্যাণপথের অনুসারী, তিনি যথার্থই একজন ধার্মিক ব্যক্তি। এ অর্থেই বলা হয় মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। অন্যদিকে, যে ধর্মকর্ম করার অর্থ মানুষের অকল্যাণসাধন, তা যথার্থ ধর্ম নয়, ধর্মের নামে প্রচলিত ছদ্মবেশী কুসংস্কার মাত্র। এ যুক্তিতেই নজরুল তাঁর ‘গোঁড়ামী ধর্ম নয়’ কবিতায় বলেন : ধর্মকে যারা অসাধু উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করে, ধর্মের নামে ধর্মতন্ত্র কায়েম করে, নিরীহ মানুষকে পীড়ন করে, তারা বিষাক্ত সাপ ও দৈত্যের চেয়েও ক্ষতিকর রাক্ষস-গোষ্ঠীস্বরূপ। কবির ভাষায় :
নাই যার পরমত-সহিষ্ণুতা সে কভু নহে ধার্মিক
এরা রাক্ষস-গোষ্ঠী, ভীষণ দৈত্যাধিক।
উৎপীড়ন যে করে, নাই তার কোনো ধর্ম ও জাতি,
জ্যোতির্ময়েরে আড়াল করেছে, এরা আঁধারের সাথী।

নজরুলের মতে, ধর্মের কথাই বলি আর দর্শনের কথাই বলি, সর্বত্রই মানুষ বিবেচিত মানুষ হিসেবে; অথচ জীবনে ও সমাজে এমন অপশক্তির অভাব নেই যা কিনা ধর্ম দর্শন নির্বিশেষে সবকিছুকে ব্যবহার করছে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও সর্বনাশ সাধনে। তাই নজরুলের উদাত্ত আহ্বান : মানুষকে বহাল করতে হবে মানুষের মর্যাদায়, গ্রহণ করতে হবে মানুষ হিসেবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, দরিদ্র অশিক্ষিত বলে, কিংবা বিশেষ একটি ধর্মসম্প্রদায়ে জন্ম বলে কাউকে দূরে সরিয়ে রাখা অন্যায়। যেমন, এক আল্লাহ্ জিন্দাবাদ কবিতায় নজরুল বলেন :
ভেদ বিভেদের কথা বলে যারা, তারা শয়তানী চেলা
আর বেশীদিন নাই, শেষ হয়ে এসেছে তাদের খেলা।

নজরুল ছিলেন পুরোদস্তুর অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। তাই তো এই উপমহাদেশের দুই প্রধান ধর্মসম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ, অনৈক্য ও দাঙ্গার ঘটনায় ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়েছেন কবি। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেন একই দেশমাতৃকার সন্তান হিসেবে সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সেজন্যই তিনি বার বার গেয়েছেন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জয়গান। যেমন, এই ঐক্য-সম্প্রীতির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই কাণ্ডারী হুঁসিয়ার কবিতায় তিনি বলেন :
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনো জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।
মোরা এক বৃন্তে দু’টি ফুল হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তার প্রাণ [পুতুলের বিয়ে]

উল্লেখ্য যে, সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ ও দাঙ্গাপরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ হলেও কবি কিন্তু হতাশায় ভেঙ্গে পড়েননি এতটুকু। তাই আমরা দেখতে পাই যে, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার (১৯২৬) দুঃসময়েও তিনি উচ্চারণ করেছেন এই আশার বাণী :
যে লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির চূড়া
সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here