নফসের উৎকর্ষ সাধনের উপায়

4
658

আশেকে রাসুল শাহরিয়ার মাহমুদ অপু

ধর্মীয় শাস্ত্র পাঠ করে ধর্মকে জানা যায়, কিন্তু বাস্তব প্রশিক্ষণ ব্যতীত তা সঠিকভাবে পালন করা যায় না। তাই আল্লাহ্ তায়ালা অতীতে অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করে মানব জাতিকে ধর্ম পালনে উদ্ভুদ্ধ করেছেন। তারা বিধি-বিধানসমূহ নিজে পালন করে সমকালীন যুগের মানুষকে তা পালনের জন্য বাস্তব প্রশিক্ষণ দান করেছেন। যা অনুসরণ করে মানুষ নিজেকে আল্লাহর অনুগত ও আত্মসমর্পণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে।
নবুয়তের পর মানবজাতিকে ধর্মীয় আচরণে উদ্বুদ্ধ করতে যাঁদেরকে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত করেছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেন, “আমার সৃষ্টির মাঝে একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা মানুষকে সৎপথ দেখাবে এবং সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।” (সূরা আল আরাফ ৭ : আয়াত ১৮১) এ সম্প্রদায়ের সঙ্গ লাভ করে ধর্মীয় আচরণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য আল্লাহ্ তায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেন, “হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় করো এবং সাদেকিনদের (সত্যাশ্রয়ীদের) সঙ্গ লাভ করো।” (সূরা তওবা ৯ : আয়াত ১১৯) এই সত্যাশ্রয়ী হলেন- আল্লাহর অলীগণ, যাঁরা আল্লাহর মনোনীত মহামানব, তাঁরা নিজেরা আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান এবং অন্যের কলুষিত আত্মার কুরিপুসমূহ চিহ্নিত করে তা দমন করে দিতে সক্ষম। যাঁরা হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরা নিজের নফসকে দমন করে স্বীয় প্রভুর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের কর্তব্য হচ্ছে- তাঁদের সান্নিধ্য লাভ করে তাঁদের নির্দেশিত পন্থায় নিজের নফসকে মুসলমান করা। জনৈক সাহাবি শয়তান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে হযরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘‘আমি আমার শয়তানকে মুসলমান করেছি, তোমরা তোমাদের শয়তানকে মুসলমান করে নাও।’’ মৃত্যুর পর মানুষকে যখন কিয়ামতের ময়দানে প্রশ্ন করা হবে তুমি পাপ কাজ করেছ কেন? সে তখন বলবে আমি করিনি, শয়তান করিয়েছে। শয়তানকে উপস্থিত করে জিজ্ঞেস করা হবে- তুমি কি পাপ কাজ করিয়েছ? তখন শয়তান বলবে, সে কি কখনও আমাকে দেখেছে? শয়তান তখন তার বিপক্ষে সাক্ষী দিবে এবং তাকে দোজখে নিক্ষেপ করতে বলবে। সুতরাং মানুষের নফসই হচ্ছে- শয়তান।

নফস মূলত চার প্রকার। যথা : (১) নফসে আম্মারা (২) নফসে লাউয়ামা (৩) নফসে মোতমাইন্না ও (৪) নফসে মোলহেমা।

এই নফসের জন্ম হয়েছে মূলত আগুন, পানি, বায়ু ও মাটির উপাদান দিয়ে। আগুনের চরিত্র, পানির চরিত্র, বায়ুর চরিত্র এবং মাটির চরিত্র এই চারটা উপাদানে মানুষ সৃষ্টি। আর এইগুলো থেকেই নফসের জন্ম। মানুষের মধ্যে আগুন, পানি, বায়ু, মাটির চরিত্র তথা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মায়া, মদ ও মাৎসর্য এই ষড়রিপুগুলি বিদ্যমান। পিতার শুক্রকিট থেকে এসব উপাদানের মধ্য দিয়ে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। সবার মধ্যে এই ষড়রিপু আছে। সময় এলেই তা প্রকাশ পায়। নফসকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন অসংখ্য নবি-রাসুল তথা মহামানব প্রেরণ করেছেন। তাঁরা এসে বলেছেন, তোমার মধ্যে নফস রয়েছে, তাকে তোমরা পরিশুদ্ধ করে নাও। নফসকে পরিশুদ্ধ করতে পারলেই সে হবে আল্লাহর প্রতিনিধি। আমাদের মধ্যে নফসও আছে, আল্লাহর সত্তাও আছে।

১. নফসে আম্মারা : আমরা জীবনে কিছু সময় নফসের দ্বারা পরিচালিত হই আবার কিছু সময় আল্লাহ্র দ্বারা পরিচালিত হই। মানুষ যখন পাপের কাজ করে, পাপের চিন্তা করে, নিজের মানবীয় গুণের বিপরীতধর্মী চিন্তা-চেতনা ও কর্ম করে এতে মানুষের বিবেক বা রূহের শক্তিতে ভাটা পড়ে এবং ক্রমান্বয়ে পাপ-পঙ্কিলতায় আসক্তি জন্মে এবং বিনা দ্বিধায় পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং তার এই চরিত্র তাকে সর্বতোভাবে অপবিত্র দেহ-মনের অধিকারী করে। তখন এই নফসকে নফসে আম্মারা বলে। এটাই নফসের প্রথম অবস্থা। সকল মানুষের মধ্যে এটা আছে, ফলে মানুষ এটা দ্বারা পরিচালিত হয়। মানুষের নফসের কুরিপু সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “মানুষের মধ্যে এটা (নফসে আম্মারা) আছে, ফলে মানুষ রিপুর দ্বারা পরিচালিত হয়।” মানুষের নফসের কুরিপু সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “মানুষের কুরিপুসমূহ মানুষের অসৎ কাজের কুমন্ত্রণা দেয়।”

২. নফসে লাউয়ামা : যখন মানুষ কোনো অলী-আল্লাহর শরণাপন্না হয়, তখন সে সবক নিয়ে নফসে আম্মারা থেকে নফসে লাউয়ামায় উপনীত হয়। নফসে লাউয়ামা হচ্ছে- অনুশোচনাকারী নফস। এই নফসের ক্ষেত্রে মানুষ পাপ কাজ করলে তার অনুশোচনা হয়। কিন্তু নফসে আম্মারায় পাপ কাজ করলে, লুট-পাট করলে, খুন-খারাবি করলে কোনো প্রকার অনুশোচনা হয় না। কিন্তু এক ধাপ এগিয়ে লাউয়ামায় গেলে তার অনুশোচনার সৃষ্টি হয়। আসলে নফসে লাউয়ামায় মানুষের ভালো-মন্দের উভয় প্রকার প্রবণতা থাকে। কখনও সৎ কাজে, কখনও পাপ কাজে জড়িত হয়। পাপ কাজে জড়িত হলে আস্তে আস্তে তার মধ্যে অনুশোচনা হয়।

৩. নফসে মোতমাইন্না : এরপরে সাধক সাধনা করতে করতে আরো একধাপ উন্নত স্তরে গেলে নফসে মোতমাইন্না বা প্রশান্ত নফসে প্রবেশাধিকার ঘটে। নফসে মোতমাইন্না হচ্ছে প্রশান্ত আত্মা। এ নফস পরম প্রশান্তির মধ্যে থাকে। তার মাঝে কোনো অশান্তি নেই, প্রশান্তি আছে। নফসে মোতমাইন্না পাপের কল্পনাও করতে পারে না, যেহেতু নফসে মোতমাইন্না প্রশান্ত নফস, সেহেতু তা আল্লাহ্র গুণাবলি ধারণ করে পরিশুদ্ধ জীবন-যাপন এবং পরকালের জন্য নিশ্চিত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ প্রশান্ত নফস সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, “হে প্রশান্ত নফস! ফিরে এসো সন্তুষ্টচিত্তে তোমার প্রভুর কাছে। আমার অলী বন্ধুদের সাথে যুক্ত হও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো।”

৪. নফসে মোলহেমা : সাধক নফসে মোতমাইন্নায় থাকা অবস্থায় সাধনা করতে করতে আল্লাহর সাথে তার যোগাযোগ হয়ে যায়। যোগাযোগ শুরু হলে সে অবস্থাকে বলে নফসে মোলহেমা। এ নফসে আল্লাহর পক্ষ থেকে এলহাম আসে। যখন যে নির্দেশ প্রয়োজন, আল্লাহর নিকট থেকে সে নির্দেশ এসে থাকে এবং কোনো বিপদ-আপদ থাকলে তাকে আল্লাহ্ সতর্ক করে দেন।

অতীতে যেসব নবি-রাসুলের উপর আসমানি কিতাব নাজিল হয়েছিল, তাঁরা সবাই নফসে আম্মারা থেকে নফসে মোলহেমাতে পৌঁছার পরেই আল্লাহর সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাঁরাই মহামানব, যারা আল্লাহর প্রিয় এবং মোর্শেদে মোকাম্মেল। হাদিস শরীফে আছে, যাঁদেরকে দেখলে আল্লাহ্র কথা মনে হয় তাঁরাই অলী-আল্লাহ্। হযরত রাসুল (সা.) এক যুদ্ধাভিযান থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, আমরা জেহাদে আজগর (ছোটো) হতে জেহাদে আকবরের (বড়ো) দিকে যাচ্ছি। এই জেহাদে আকবর হলো নিজের নফসের সাথে যুদ্ধ করে তা পরিশুদ্ধ করা। তাই আমাদের মহান রাব্বুল ইজ্জতের কাছে ফরিয়াদ, আমরা যেন আমাদের মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের কদমে থেকে নফসে মোলহেমায় পৌঁছতে পারি। আল্লাহ্ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

4 COMMENTS

  1. খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি পোস্ট।
    মহান রাব্বুল আলামীন যেনো তাঁর প্রেরিত যুগের ইমাম তথা মহামানবের উছিলায় নিজেদের নফসের উন্নতি সাধনের তৌফিক দান করেন…আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here