নবজাতকের জন্ডিস- হতে পারে তা কোনো জটিল রোগের উপসর্গ

0
348

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়) :


নবজাতকের জন্ডিস কী?
সাধারণত জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে রক্তে বিলিরুবিন নামক এক বিশেষ রঞ্জক পদার্থের মাত্রা বেড়ে গিয়ে নবজাতকের চোখ, চামড়া কিছুটা হলদেটে রঙ ধারণ করে, তাকে নবজাতকের জন্ডিস বলে।
শতকরা ৬০ থেকে ৮০ ভাগ নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে এই জন্ডিস দেখা দেয়। বিলিরুবিনের মাত্রা প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে ৫ মিলিগ্রামের বেশি হলে নবজাতকের শরীরে এই জন্ডিস পরিলক্ষিত হয়।

ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস কী?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে নবজাতকদের যে জন্ডিস হয় তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ফিজিওলোজিক্যাল জন্ডিস (Physiological jaundice)। জন্মের পর শিশুর যকৃৎ পুরোপুরি কর্মক্ষম হয়ে উঠতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। এই সময়ে যকৃতের এই অপরিপক্কতার কারণে বিলিরুবিনের মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে গিয়ে জন্ডিস হতে পারে। তবে এই জন্ডিস নবজাতকের জন্য ক্ষতিকর নয়।

ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের লক্ষণ: নবজাতকের এই জন্ডিস সাধারণত জন্মের দ্বিতীয় দিনের পর থেকে দেখা দেয় এবং রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা সাধারণত ১২ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকে। নবজাতকের দেহে এই জন্ডিসের বিস্তৃতি সাধারণত পেট পর্যন্ত হয় এবং দশদিনের মধ্যে এই জন্ডিস ভালো হয়ে যায়।
তবে নবজাতকের জন্ডিস হলেই যে তা স্বাভাবিক জন্ডিস, তা নয়। এই জন্ডিস কখনো কখনো নবজাতকের জটিল কোনো রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে নবজাতকের যে সাধারণ জন্ডিস হয় সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের করণীয় কী?
নবজাতকের জন্ডিস যদি সাধারণ জন্ডিস বা ফিজিওলোজিক্যাল জন্ডিস হয় যেখানে বিলিরুবিনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে বা জন্ডিসের বিস্তৃতি সাধারণত নবজাতকের পেট পর্যন্ত থাকে সেক্ষেত্রে নবজাতককে প্রতিদিন সকালের মিষ্টি রোদে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় পর্যন্ত রাখতে হবে। শীতকাল হলে সরাসরি রোদের আলোর জন্য ঘরের বাহিরে শিশুকে নেওয়া যাবে না। এতে নবজাতকের ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে জানালাবন্ধ অবস্থায় পর্দা সরিয়ে নবজাতকের শরীরে সূর্যের আলো লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি শিশুকে নিয়মিত মাতৃদুগ্ধ পান করাতে হবে।
তবে জন্ডিসের মাত্রা যদি অনেক বেশি হয় বা জন্ডিস যদি নবজাতকের হাত ও পা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় সেক্ষেত্রে ফটো থেরাপি (নবজাতককে বিশেষ ধরনের আলোকরশ্মির নীচে রেখে চিকিৎসা) এমনকি ‘রক্ত পরিবর্তন’ এর চিকিৎসার (Exchange transfusion) প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং, জন্ডিসের মাত্রা বেশি মনে হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

কোন কোন ক্ষেত্রে নবজাতকের জন্ডিসের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে?

  • নবজাতকের শরীরে জন্ডিস যদি জন্মের প্রথম দিনেই দেখা যায়।
  • জন্ডিস যদি দুই সপ্তাহ বয়সের পরেও ভালো না হয়।
  • জন্ডিস যদি সমগ্র শরীর অর্থাৎ হাত এবং পা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
  • জন্ডিসের পাশাপাশি যদি পায়খানার রং হলুদ বর্ণের না হয়ে সাদা বা ফ্যাকাসে হয় এবং প্রস্রাবের রঙ বেশ গারো হয়।
  • জন্ডিসের পাশাপাশি যদি অন্যান্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন- নবজাতকের নেতিয়ে পড়া বা নড়াচড়া কম করা, খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি।

নবজাতকের জন্ডিস হওয়ার সাথে রক্তের গ্রুপের কোনো সম্পর্ক আছে কি?

হ্যাঁ। মা এবং নবজাতকের উভয়ের রক্তের গ্রুপের সাথে নবজাতকের জন্ডিস হওয়ার সম্পর্ক আছে।

মায়ের রক্ত যদি ‘নেগেটিভ’ গ্রুপের হয় এবং বাচ্চার রক্ত যদি ‘পজেটিভ’ গ্রুপের হয় তাহলে নবজাতকের অনেক বেশি মাত্রায় জন্ডিস হতে পারে। তবে প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। সাধারণত পরবর্তী নবজাতকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। একে বলা হয় ‘আর এইচ ইন কমপ্যাটিবিলিটি’ (Rh incompatibility)।

আবার মায়ের রক্তের গ্রুপ যদি ‘ও পজেটিভ’ হয় এবং বাচ্চার রক্তের গ্রুপ যদি ‘এ’ অথবা ‘বি’ পজেটিভ হয় সেক্ষেত্রেও নবজাতকের জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একে বলা হয় ‘এবিও ইনকমপ্যাটিবিলিটি’ (ABO incompatibility)।

দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিসের কারণ কী?
নবজাতকের শরীরে যদি ১৪ দিন বয়সের পরেও জন্ডিস পরিলক্ষিত হয় তাকে বলে দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিস (Prolong jaundice) এবং এই জন্ডিসের পাশাপাশি যদি পায়খানার রং হলদে না হয়ে সাদা বা ফ্যাকাসে হয় এবং প্রস্রাবের রঙ অনেক গারো হয়, সেক্ষেত্রে এই জন্ডিস অন্য কোনো রোগের উপসর্গ হিসেবে ধরতে হবে। যেমন:

  • বিলিয়ারি অ্যাট্রেশিয়া (যকৃৎ থেকে যে নালীর মাধ্যমে পিত্ত অন্ত্রে এসে পৌছায়, সেই পথটি জন্মগতভাবে বন্ধ থাকে এই রোগে)।
  • নিওনেটাল হেপাটাইটিস সিনড্রোম যা মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে নবজাতকের দেহে কোনো ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে অথবা বংশগত কিছু রোগের (যেমন: গ্যালাকটোসেমিয়া) কারণেও হতে পারে।
  • এর পাশাপাশি, কনজেনিটাল হাইপো থাইরইডিজম (জন্মগতভাবে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সঠিক পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ না হওয়া), রক্তে বা মূত্রতন্ত্রে জীবাণু সংক্রমণ নবজাতকের এই দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিসের ক্ষেত্রে করণীয় কী?
কিছু রোগের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে অথবা চিকিৎসা শুরু করতে দেরী হলে যকৃৎ বা লিভার নষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন: এই দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিসের কারণ যদি হয় ‘বিলিয়ারি অ্যাট্রেশিয়া’ তাহলে তার মূল চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন এবং এই অপারেশন সাধারণত দুই মাসের আগে যদি করা যায় তাহলে তার সফলতার হার ভালো। কিন্তু দুই মাসের পরে যদি অপারেশন করা হয় সেক্ষেত্রে খুব বেশি একটা লাভ হয় না।
আবার ‘কনজেনিটাল হাইপোথাইরইডিজম’ এ যদি চিকিৎসা শুরু করতে দেরী হয় তাহলে শিশুর বুদ্ধি-বিকাশ ব্যাহত হবে।
সুতরাং, জন্ডিস ২ সপ্তাহ পার হবার পরেও যদি নবজাতকের দেহে পরিলক্ষিত হয়, তখন দেরী না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ। কারণ, যত তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় সম্ভব, ততো তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। সুতরাং, নবজাতকের দীর্ঘমেয়াদী জন্ডিস এর বিষয়ে কোনো অবহেলা নয়।
[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here