নরওয়ের রূপকথা-নীল গেইম্যান

0
258

১ম অধ্যায়
শুরুর আগে ও পরে

শুরুতে কিছুই ছিল না, স্বর্গ-মর্ত্য কিছুই না, না ছিল তারা, না ছিল আকাশ। শুধু ছিল অন্তহীন, আকার আকৃতিবিহীন ধোঁয়াশা আর ছিল সদা জ্বলন্ত আগুনের জগত।

উত্তরে ছিল নিলহাইম। সেখানে ১১টি বিষাক্ত নদী কুয়াশার বুক চিরে বয়ে চলেছিল। নদীগুলোর উৎসমুখে ছিল এক গর্জনশীল ঘূর্ণী, নাম তার হেভেরগেলমির। নিলহাইম ছিল ঠান্ডার চেয়েও ঠান্ডা। সেখানে অন্ধকার ঘন কুয়াশা চতুর্দিকে ঘিরে থাকত। আকাশ সেখানে কুয়াশায় ঢাকা থাকত, ভূমিও থাকত ঠান্ডা কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
দক্ষিণে ছিল মাসপেল। মাসপেল ছিল আগুন। সবকিছু উজ্জ্বল আর জ্বলন্ত। একদিকে মাসপেল যেমন ছিল আলোকিত, অন্যদিকে নিলহাইম ছিল ধূসর গলিত লাভা, যেখানে কুয়াশার জগত ছিল বরফাচ্ছন্ন। ভূমি ছিল কামারের আগুনের মতো জ্বলন্ত আর উত্তপ্ত। নিরেট কোনো ভূমি ছিল না, ছিল না আকাশ। শুধু ছিল আগুনের লেলিহান শিখা, উত্তাপের ঘূর্ণি আর গলিত পাথরের সাগর।

মাসপেলের আগুনের শেষপ্রান্তে যেখানে কুয়াশা প্রজ্বলিত হয়ে আলোকিত হয়েছিল, যেখানে ভূমির শেষ, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুরটার, যে দেবতাদের চেয়েও প্রাচীন। সময়ের শুরু থেকে সেখানে সে আজও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে আছে এক জ্বলন্ত তরবারি, যেখানে গিয়ে মিশেছে গলিত লাভা আর জমাট কুয়াশা।
বলা হয়ে থাকে, যখন দুনিয়া ধ্বংস হবে, যেটাকে বলা হয় রাগনারক, শুধুমাত্র তখনই সুরটার তার স্থান ত্যাগ করবে। সে মাসপেল থেকে আগুনের তরবারি হাতে বেরিয়ে পড়বে আর পৃথিবীকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে। একে একে সকল দেবতা তার সামনে ধরাশায়ী করবে।

অনুচ্ছেদ ২
মাসপেল আর নিলহাইমের মাঝে ছিল এক অসীম শূন্যস্থান। কুয়াশার জগতের নদীগুলো সেই শূন্যস্থানে প্রবাহিত হতো। এই শূন্যস্থানকে বলা হতো গিনুনগাগাপ। অনন্তকাল ধরে প্রবাহিত হয়ে বিষাক্ত নদীগুলো আগুন আর কুয়াশার জগতের মধ্যবর্তী স্থানে সৃষ্টি করল বিশালাকৃতির হিমবাহ। শূন্যস্থানের উত্তরে বরফের জগত ঠান্ডা কুয়াশা আর বরফ শীলায় ঢাকা ছিল কিন্তু দক্ষিণে, যেখানে হিমবাহ আগুনের জগতকে স্পর্শ করেছিল, যেখানে মাসপেলের আগুনের শিখা বরফের সাথে মিলিত হয়েছিল, আগুনের দুনিয়ার উত্তপ্ত হাওয়া বরফের উপর বসন্তের মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

যেখানে আগুন আর পানি মিলিত হয়েছিল, আগুন বরফকে গলিয়ে দিয়েছিল আর বরফগলা জলে সৃষ্টি হলো প্রথম জীবের, দেখতে মানুষের মতো কিন্তু আকারে পৃথিবীর চেয়েও বড়ো, সকল দানবের চেয়েও বৃহৎ। সে না ছিল পুরুষ, না ছিল মহিলা আবার একসাথে দুটোই ছিল।
এই জীবটিই সকল দানবের পূর্বপুরুষ, একে বলা হতো ইমির।
বরফগলা জলে শুধুমাত্র ইমিরের জন্ম হয়নি, আরো সৃষ্টি হয়েছিল এক শিংবিহীন গাভীর, কল্পনাতীত বড়ো তার আকার। গাভীটি খাদ্য ও পানির জন্য বরফের পাহাড় চেটে খেত। তার ওলান থেকে নদীর স্রোতের মতো দুধ প্রবাহিত হতো। সেই দুধ খেয়ে ইমির পুষ্টি পেত।
দানব ইমির দুধ খেয়ে ক্রমেই বৃহৎ হতে লাগল।
ইমির গাভীটিকে ডাকত অধুমলা।
গাভীটির জিহবা বরফের ভিতর থেকে প্রথম মানুষকে চেটে বের করে আনল। প্রথম দিনে শুধু মানুষটির চুল দৃশ্যমান হলো, দ্বিতীয় দিন মাথা ও তৃতীয় দিনে পুরো শরীর আবির্ভূত হলো।
সে ছিল বুরি, সকল দেবতাদের পূর্বপুরুষ।

ইমির ঘুমিয়ে পড়ল, ঘুমন্ত অবস্থায় ইমিরের বাম বাহুর নিচ থেকে জন্ম নিল এক পুরুষ আর নারী দানব, পা থেকে জন্ম হলো আরেক ছয় মাথা দানব। ইমিরের এই সন্তানদের থেকেই সকল দানবের সৃষ্টি হলো।
বুরি এই দানবদের থেকে একজনকে তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করল। তাদের এক পুত্র সন্তান হলো, তাকে তারা ডাকত বোর নামে। বোর বেস্টলা নামে এক দানব কন্যাকে বিয়ে করল। তাদের তিন ছেলে জন্ম নিল, ওডিন, ভিলি আর ভি।

বোরের তিন ছেলে ওডিন, ভিলি আর ভি যুবক বয়সে উপনীত হলো। মাসপেলের আগুন আর নিলহাইমের অন্ধকার দেখতে দেখতে তারা বড়ো হয়ে উঠেছিল। কিন্ত তারা জানত, দুটি স্থানই তাদের জন্য মৃত্যুপুরি। তারা তিন ভাই অনন্তকাল ধরে গিনুনগাগাপের অসীম শূন্যতায় আগুন আর কুয়াশার জগতের মাঝে আটকা পড়ে থাকল।

সেখানে না ছিল সমুদ্র, না ছিল বালুকাবেলা; ছিল না কোনো লতা-পাতা বা ঘাস-পাথর, ছিল না মাটি বা গাছপালা; কোনো আকাশ ছিল না, তারাও ছিল না; সেসময় কোনো পৃথিবী ছিল না, স্বর্গ-মর্ত্য কিছুই না। শুধু ছিল এক অসীম শূন্যতা, এক বিশাল শূন্যস্থান, যাকে দুনিয়া আর জীবন দ্বারা পূরণ করতে হবে।

এটা ছিল সব কিছু সৃষ্টি হওয়ার সময়। ভি, ভিলি আর ওডিন গিনুনগাগাপের অসীম শূন্যতায় দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল আর কি করতে হবে সে বিষয়ে আলোচনা করল। আলাপ করল জীবন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ওডিন, ভিলি আর ভি দানব ইমিরকে হত্যা করল। এটা তাদের করতেই হতো। বিশ্বজগত সৃষ্টি করার জন্য এছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না। এটা ছিল সব কিছুর শুরু, একটি মৃত্যু যেটি জীবনের শুরু করেছিল।

তারা বিশাল দানবটিকে ছুরিকাঘাত করল। ইমিরের শরীর থেকে অবিশ্বাস্য পরিমাণে রক্ত বের হয়ে আসতে লাগলো। সমুদ্রের জলের মতো নোনা, মহাসাগরের পানির মতো ধূসর রক্তের ঝর্ণা বন্যার মতো সহসা বেরিয়ে আসতে লাগল; সেই রক্তের স্রোত এত শক্তিশালী আর গভীর ছিল যে সকল দানব সেই রক্তের বন্যায় ভেসে গেল আর ডুবে মারা গেল। শুধুমাত্র ইমিরের দৌহিত্র করজেলমির আর তার স্ত্রী বেঁচে রইল। তারা একটি কাঠের বাক্সকে নৌকার মতো ব্যবহার করে বন্যা থেকে বেঁচে গেল। যেসব দানবকে আমরা ভয় পাই বা আজও দেখি, তারা সবাই এই দুজনের বংশধর।

ওডিন আর তার ভাইয়েরা ইমিরের মৃতদেহ থেকে মাটি সৃষ্টি করল। ইমিরের হাড়গোড় জড়ো করে বানাল পাহাড় পর্বত।

যে নুড়ি-পাথর, কাঁকড়-বালি তোমরা দেখ, সেগুলো ছিল ইমিরের দাঁত আর হাড়ের ভাঙ্গা অংশ, যেগুলো ওডিন, ভিলি আর ভির সাথে ইমিরের সংঘাতের সময় ইমিরের গা থেকে খসে পড়েছিল।
পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে যে সমুদ্রগুলো, সেগুলো আসলে ইমিরের ঘাম আর রক্ত।

আকাশের দিকে তাকাও, তুমি আসলে ইমিরের খুলির ভিতর দিয়ে দেখছ। রাতের আকাশে যে তারকারাজি, গ্রহ নক্ষত্র, ধুমকেতু আর খসে পড়া তারা, সেগুলো সব মুসপেলের অগ্নিদুনিয়ার আগুনের ফুলকি। আর যে মেঘমালা আমরা দিনের বেলা আকাশে দেখি? সেগুলো একসময় ইমিরের মগজ ছিল, না জানি তারা আজও কি কথা ভেবে চলেছে!
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here