নরওয়ের রূপকথা, লোকির সন্তানেরা-২

0
165


দেবতারা যখন লোকির সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাটিকে দানবদের রাজ্য থেকে নিয়ে আসে, তখন সেটি ছিল একটি কুকুরের বাচ্চার মতো ছোটো, টীর বাচ্চাটির গলায় আর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করত, তার সাথে খেলা করত। বাচ্চাটি ছিল একটা নেকড়ে, বাদামী আর কালো রঙের মিশেল, তার চোখ ছিল কয়লার মতো কৃষ্ণবর্ণ।
নেকড়ে ছানাটি কাঁচা মাংস খেত, কিন্তু সে মানুষের মতো কথা বলত, দেবতা আর মানুষদের ভাষায়। তার নাম ছিল ফেনরির।
এটি খুব দ্রুত বড়ো হচ্ছিল। একদিন যদি এটি নেকড়ের আকার হয়, পরদিন এটি ভালুকের মতো বড়ো হয়, তার পরের দিন বিরাট এলক হরিনের মতো বড়ো হয়ে যায়।
দেবতারা ফেনরিকে দেখে ভয় পেয়ে যায়, শুধু টীর ছাড়া। সে এখনো নেকড়েটির সাথে খেলাধুলা করে, সে একাই তাকে প্রতিদিন কাঁচা মাংস খাওয়ায়। প্রতিদিন বাচ্চাটি আগের দিনের চেয়ে বেশি খায় আর আগের দিনের চেয়ে আরো বড়ো, শক্তিশালী আর ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
ওডিন বাচ্চাটিকে বেড়ে উঠতে দেখে অমঙ্গলের আশংকায় নিমজ্জিত হয়, তার স্বপ্নে সে সৃষ্টিজগত ধ্বংসের সময়কালে নেকড়েটিকে দেখতে পায়। সবচেয়ে সুদূর অতীত, যা সে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়, সেখানে সে শুধু ফেনরিরের গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ চোখ আর সাদা দাঁত দেখতে পায়।
দেবতারা এক সভায় মিলিত হলো আর সিদ্ধান্ত নিলো ফেনরিরকে তারা বেঁধে রাখবে।
দেবতারা তাদের কামারশালায় ভারী শিকল আর বেড়ি তৈরী করল আর সেটি ফেনরিরের কাছে নিয়ে গেল।
“ফেনরির, এই দেখ,” দেবতারা ফেনরিরকে বলল, যেন এটা একটা মজার খেলা। “তুমি খুব দ্রুত বড়ো হয়ে গেছ। আমরা তোমার শক্তি পরীক্ষা করতে চাই। আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী শিকল আর বেড়ি এনেছি, তোমার কি মনে হয় এটা তুমি ভাঙতে পারবে?”
“আমার মনে হয় আমি পারব,” বলল ফেনরির। “আমাকে বাঁধ।”
দেবতারা বিশাল শিকল ফেনরিরের চতুর্দিক ঘিরে ভালো করে বাঁধল আর তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিলো। দেবতারা যতক্ষণ তাকে বাঁধল, ফেনরির চুপচাপ অপেক্ষা করল। বিশাল নেকড়েটিকে শক্তিশালী শেকলে বাঁধতে পেরে দেবতারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
“এখন,” চিৎকার করল থর।
ফেনরির তার শরীর মোচড়াল আর পায়ের পেশী ফোলাল, দেবতাদের শিকল শুকনো ডালের মতো ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।
বিরাট নেকড়েটি চাঁদের দিকে মুখ তুলে বিজয়ানন্দে গর্জন করে উঠল। “আমি তোমাদের শেকল ভেঙ্গে ফেলেছি,” বলল সে, “ভুলে যেও না।”
“আমরা ভুলব না,” বলল দেবতারা।
পরের দিন টীর নেকড়েটিকে মাংস খাওয়াতে গেলে নেকড়ে বলল, “আমি শেকল ভেঙ্গে ফেলেছি, আমি খুব সহজেই সেগুলো ভেঙ্গেছি।”
“হ্যা, তুমি শেকল ভেঙ্গে ফেলেছ, আমি দেখেছি।”
“তোমার কি মনে হয়, তারা আবার আমার শক্তি পরীক্ষা নেবে? আমি তো প্রতিদিনই আরো বড়ো আর শক্তিশালী হচ্ছি।”
“তারা আবার তোমাকে পরীক্ষা করবে, আমি আমার ডান হাত বাজি ধরে বলতে পারি,” বলল টীর।
নেকড়েটি ক্রমাগত বড়ো হচ্ছিল আর দেবতারা তাদের কামারশালায় নতুন শেকল তৈরীতে ব্যস্ত ছিল। শেকলটির একেকটি অংশ এতই ভারি ছিল যে সেটি একজন মানুষের জন্য উঠানো কঠিন ছিল। এটা ছিল দেবতাদের বানানো সবচেয়ে শক্ত লোহার শেকল, যেটি মাটির গভীর থেকে তুলে আনা আর আকাশ থেকে খসে পড়া ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরী করা হয়েছিল। তারা এই শেকলের নাম দিল দ্রুমি।
দেবতারা শেকলটি ঘুমন্ত ফেনরিরের আছে টেনে নিয়ে এল।
“আবার?” বলল সে।
“যদি তুমি এই শেকল থেকে মুক্তি পেতে পার,” তাকে বলল দেবতারা, “তোমার শক্তিমত্তার কথা সকল দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। সবাই তোমার প্রশংসা করবে। যদি এই শেকল তোমাকে বেঁধে রাখতে না পারে, তাহলে প্রমাণ হবে, সকল দেবতা আর দানবদের চেয়ে তুমি শক্তিশালী।”
ফেনরির সম্মতি জানিয়ে মাথা ঝাকাল, আর দ্রুমি নামক শেকলের দিকে তাকাল, এত বড়ো আর শক্তিশালী শেকল আগে কখনো তৈরী হয়নি।
“বিপদকে মোকাবিলা করা ছাড়া সম্মান অর্জন করা যায় না,” কিছুক্ষণ ভেবে বলল নেকড়ে। “আমি বিশ্বাস করি এই শেকল আমি ভাঙ্গতে পারব, বাঁধ আমাকে।”
তারা তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলল।
বিশাল নেকড়েটি তার শরীর মুচড়ে, পায়ের পেশী ফুলিয়ে শেকল ভাঙতে চেষ্টা করল, কিন্তু শেকল ভাঙ্গতে পারল না। দেবতাদের চোখে বিজয়ের আনন্দ ফুঁটে উঠতে শুরু করল, কিন্তু বৃহৎ নেকড়েটি তার শরীর মোচড়াতে শুরু করে, সর্বশক্তিতে তার চার পায়ের সকল পেশী ব্যবহার করে শেকল ভাঙ্গতে চেষ্টা করতে লাগল। তার চোখ জ্বলতে লাগল, দাঁত বেরিয়ে পড়ল আর মুখ থেকে ফেনা বেরুতে শুরু করল।
সে গর্জন করতে করতে শরীর মোচড়াতে শুরু করল। সে তার সর্বশক্তিতে শেকল ভাঙ্গতে চেষ্টা করতে লাগল।
দেবতারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছনে সরে গেল, তারা পিছনে সরে ভালই করেছিল কারণ প্রথমে শেকলে ফাঁটল ধরল, তারপর শিকলটি টুকরো টুকরো হয়ে ভয়ংকর বেগে চতুর্দিকে ছুটে যেতে শুরু করল, পরবর্তী বহু বছর ধরে দেবতারা বড়ো গাছে বা পাহাড়ের পাশে শেকলের ভাঙা টুকরো খুজে পেত।
“আমি পেরেছি,” চিৎকার করল ফেনরির, আর নিজের সাফল্যে মানুষ আর নেকড়ের মতো গর্জন করল।
নেকড়ে লক্ষ্য করল, দেবতারা যারা তার শেকল ভাঙ্গার সংগ্রাম দেখছিল, তার সাফল্যে মোটেই খুশি হতে পারেনি, এমনকি টীরও নয়। ফেনরির, লোকির সন্তান, বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হলো।
আর নেকড়ে ফেনরির প্রতিদিন বড়ো থেকে আরো বড়ো হতে লাগল।
ওদিকে ওডিন এ বিষয়ে ভাবল, আর গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হলো। সে তার মিমিরের কুয়ো থেকে পাওয়া সব জ্ঞান দিয়ে ভাবল আর বিশ্ব-বৃক্ষ থেকে নিজেকে উৎসর্গ করে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে চিন্তা করল, কিভাবে একটা উপায় বের করা যায়।
অবশেষে ওডিন একটা উপায় খুঁজে পেল। সে ফ্রে’র সংবাদবাহক শুভ্র এলফ স্কিরনিরকে ডেকে পাঠাল, আর তাকে গেইপনির নামে একটা শিকলের কথা বর্ননা করল। স্কিরনির তার ঘোড়ায় চড়ে রংধনু সেতু পেরিয়ে ভারটালহাইমে যাত্রা করল, সাথে নিয়ে গেল বামনদের জন্য এমন এক শেকল বানানোর নির্দেশনা, সেই শেকল কেউ কোনদিন দেখেনি।
বামনরা স্কিরনিরের কাছ থেকে শেকল বানানোর নির্দেশনা শুনল, তারা ভয়ে কেঁপে উঠল, কিন্তু তারা রাজি হলো আর তাদের পারিশ্রামিকের পরিমাণ জানাল। যদিও বামনদের পরিশ্রামিক অনেক বেশি ছিল, স্কিরনির রাজি হলো, কারণ ওদিন তাকে সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিল। বামনরা শেকল বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান জোগাড় করল।
বামনরা শেকল বানানোর জন্য ছয়টি উপাদান জোগাড় করল-
প্রথম জিনিসটি ছিল বিড়ালের পায়ের ছাপ।
দ্বিতীয় জিনিসটি হলো একজন নারীর দাঁড়ি।
তৃতীয় জিনিসটি ছিল পাহাড়ের ছাদ।
চতুর্থ জিনিসটি ছিল ভালুকের পেশি।
পঞ্চম জিনিসটি ছিল মাছের নিশ্বাস।
ষষ্ঠ আর সর্বশেষ জিনিসটি ছিল পাখির থুথু।
এই প্রত্যেকটি জিনিস গেইপনির তৈরীতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
(তুমি বলছ, তুমি এগুলোর কোনোটাই কখনো দেখনি? অবশ্যই কখনো দেখনি। কারণ বামনরা এগুলোকে শেকল বানাতে ব্যবহার করে ফেলেছে)
বামনরা যখন তাদের কাজ শেষ করল, তার স্কিরনিরকে একটা কাঠের বাক্স দিলো। বাক্সের ভিতর ছিল সিল্কের মতো মসৃণ আর নরম একধরনের লম্বা রশি। এটা ছিল প্রায় স্বচ্ছ আর ওজনে একেবারেই হাল্কা।
স্কিরিনির কাঠের বাক্স সাথে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে এসগার্ডে ফিরে এলো। সে যখন ফিরে আসে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সে দেবতাদের দেখাল বামনদের কারখানা থেকে কি জিনিস নিয়ে এসেছে, এটা দেখে দেবতারা খুবই খুশি হলো।
(চলবে)
নীল গেইম্যানের ‘নর্স মিথোলজি’ থেকে অনুদিত। অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here