নরওয়ের রূপকথা, লোকির সন্তানেরা-১

0
214

লোকি ছিল সুদর্শন এবং সে এটা জানত। লোকজন তাকে ভালোবাসতে আর বিশ্বাস করতে চাইত। কিন্তু সে ছিল আত্মকেন্দ্রিক আর অনির্ভরযোগ্য, দুষ্টু আর শয়তান। সে সিজিন নামে এক নারীকে বিয়ে করেছিল। যখন তাদের বিয়ে হয়, সিজিনকে সুন্দর আর সুখি মনে হতো কিন্তু এখন তাকে দেখলে মনে হয় সে সর্বদা একটা খারাপ খবরের আশংকায় আছে। সে এক পুত্র সন্তান জন্ম দেয়, যার নাম ছিল নাফ্রি। কিছুদিন পর তাদের আরেক পুত্র সন্তান হয়, নাম ভালি।
মাঝে মধ্যেই লোকি নিরুদ্দেশ হয়ে যেত, অনেক দিন তার কোনো হদিস পাওয়া যেত না। সিজিনকে দেখে মনে হতো, সে সবচেয়ে খারাপ খবরের আশংকায় আছে। কিন্তু লোকি সর্বদাই তার কাছে ফিরে আসত। লোকিকে চতুর আর অপরাধী মনে হতো, কখনো মনে হতো সে কিছু একটা নিয়ে গর্বিত।
তিনবার সে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, আর তিনবারই সে একসময় ফিরে এসেছিল।
তৃতীয়বার লোকি যখন অজ্ঞাত বাস থেকে এস গার্ডে ফিরে এলো, ওডিন তাকে ডেকে পাঠাল।
“আমি স্বপ্নে দেখেছি,” তাকে বলল প্রবীণ এক চক্ষু দেবতা। “তোমার সন্তান সন্ততি আছে।”
“আমার এক পুত্র আছে, নাফ্রি। ভালো ছেলে কিন্তু আমি স্বীকার করছি সে প্রায়ই তার পিতার কথা শোনে না। আরেক পুত্র আছে, ভালি, সে আবার অনুগত আর সংযত স্বভাবের।
“আমি তাদের কথা বলিনি। তোমার আরো তিন সন্তান আছে, লোকি। তুমি তুষার দানবদের রাজ্যের দানবি আঙ্গোরবদার সাথে সময় কাটানোর জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাও। তার গর্ভে তোমার তিন সন্তান জন্ম নিয়েছে। আমি ঘুমের মধ্যে অন্তর্চক্ষু দিয়ে তাদের দেখেছি, আর আমার দুরদৃষ্টি বলছে, ভবিষ্যতে তারা দেবতাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো শত্রু হবে।”
লোকি কিছুই বলল না। সে নিজেকে লজ্জিত দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাকে বরং সন্তুষ্ট দেখাচ্ছিল।
ওডিন দেবতাদের ডেকে পাঠাল, সে থর আর টীরের নেতৃত্বে একদল দেবতাদের তুষার দানবদের রাজ্য যতুনহাইমে পাঠাল, লোকির সন্তানদের এসগার্ডে নিয়ে আসার জন্য।
দেবতারা দানবদের রাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। অনেক বিপদের সাথে যুদ্ধ করে তারা অবশেষে আঙ্গরবদার বাড়ি পৌছাল। সে এ ধরনের কোনো ঘটনা আশা করেনি, সে তার সন্তানদের তার বিশাল হলে খেলাধুলা করার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। লোকি আর আঙ্গরবদার সন্তানদের দেখে দেবতারা খুবই বিস্মিত হলেও তাদের কর্তব্য কর্মে ব্যাঘাত ঘটতে দিলো না। তারা বাচ্চাগুলোকে ধরল, সবচেয়ে বড়ো বাচ্চাটাকে পাইন গাছের গুড়িতে বেঁধে ঝুলিয়ে নিলো, দ্বিতীয় বাচ্চাটাকে মুখ বন্ধ দিয়ে মুখ বেঁধে গলায় একটা দড়ি পরিয়ে নিলো, তৃতীয় বাচ্চাটা বিষন্ন বদনে তাদের সাথে সাথে এমনিতেই হেঁটে আসতে থাকল।
তৃতীয় বাচ্চাটির ডান পাশে যারা ছিল, তারা একটি সুন্দর বাচ্চা মেয়ে দেখতে পাচ্ছিল, আর যারা মেয়েটির বাম পাশে ছিল, তারা তার দিকে না তাকানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল, কারণ মেয়েটির শরীরের অন্য অংশ ছিল মৃত মানুষের পঁচা-গলা শরীরের মতো।
“একটা জিনিস খেয়াল করেছ?” তুষার দানবদের রাজ্য যতুনহাইনের মধ্য দিয়ে ফিরতি পথে তৃতীয় দিন থর টীরকে জিজ্ঞেস করল। রাতের বেলা একটা সমতল জায়গা দেখে তারা তাবু ফেলেছে, টীর লোকির দ্বিতীয় সন্তানের পশমী গলায় হাত বুলাচ্ছিল।
“কি?”
“তারা আমাদের অনুসরণ করছে না, এমনকি বাচ্চাদের মাও আমাদের পিছনে আসছে না, মনে হচ্ছে যেন তারা চায়, আমরা বাচ্চাগুলোকে যতুনহাইম থেকে নিয়ে যাই।”
“ফালতু কথা,” জবাব দিল টীর। কিন্তু মুখে বললেও অজানা এক আশংকায় আগুনের পাশে বসেও টীর শিউরে উঠল।
আরো দুইদিন কষ্টকর যাত্রা শেষে তারা ওডিনের রাজ সভায় এসে পৌছাল।
“এরা হল লোকির সন্তানেরা”, সংক্ষেপে জানান দিলো টীর।
লোকির প্রথম সন্তান একটা পাইন গাছের গুঁড়িতে বাঁধা ছিল, আর সেটা ইতোমধ্যে পাইন গাছের চেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। এটির নাম ছিল জরমুন গুন্ডর, আর এটা ছিল একটা সাপ। “আমরা এটাকে ধরে নিয়ে ফিরে আসার যাত্রার সময়কালে এটা অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছে।”
“সাবধান,” থর বলল। “এটা জলন্ত কালো বিষ ছিটাতে পারে। এটা আমার দিকে বিষ ছিটিয়ে ছিল, কিন্তু মিস করেছে। তাই এটাকে আমরা গাছের গুড়িতে বেঁধে এনেছি।”
“এটা এখনো বাচ্চা,” বলল ওডিন। “এটা এখনো বড়ো হচ্ছে। আমরা এটাকে এমন স্থানে পাঠাবো, যেখানে এটা কারো ক্ষতি করতে পারবে না।”
ওডিন জরমুন গুন্ডারকে যেখানে সকল ভুমির শেষ, মিডি গার্ডকে চতুর্দিক ঘিরে থাকা যে সমুদ্র, সেই সমুদ্রের তীরে নিয়ে গেল আর মুক্ত করে দিল, আর তাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে চক্রাকারে সাতার কাটতে কাটতে দূরে চলে যেতে দেখল।
ওডিন তার এক চক্ষু দিয়ে সর্পটিকে দিগন্তে হারিয়ে যেতে দেখল, আর ভাবল সে কাজটি সঠিক করল কিনা। সে আসলে জানে না। সে তাই করেছে, সেটা সে স্বপ্নে দেখেছে। কিন্তু স্বপ্নরা যতটুকু দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি জানে, এমনকি সবচেয়ে জ্ঞানী দেবতার কাছেও তারা সবটুকু প্রকাশ করে না।
সর্পটি মহাসমুদ্রের ধুসর জলের নিচে বাড়তে থাকবে, বাড়তে বাড়তে একসময় পুরো পৃথিবীকে বেষ্টন করে ফেলবে। মানুষজন জরমুন গুন্ডারকে মিড গার্ডের সর্পনামে ডাকবে।
ওডিন তার রাজ সভায় ফিরে এল। সে লোকির দ্বিতীয় সন্তানকে তার সামনে আসতে নির্দেশ দিল।
সে মেয়েটির দিকে তাকাল, তার মুখের এক পাশে ছিল গোলাপী গাল, লোকির মতো সুন্দর সবুজ চোখ, সুন্দর ঠোট। মুখের অন্য পাশে ছিল মৃত মানুষের মত পঁচে বিকৃত হয়ে যাওয়া ত্বক, পঁচা ধুসর আর ঘোলা চোখ, আর ঠোট বিহীন চোয়াল, তার দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছিল।
“তোমাকে তারা কি নামে ডাকে, বালিকা?” জানতে চাইল বিশ্ব পিতা।
“তারা আমাকে হেল নামে ডাকে,” মেয়েটি বলল, “আপনি চাইলে আমাকে এই নামেই ডাকতে পারেন, মহামান্য বিশ্ব পিতা।”
“তুমি খুব বিনয়ী,” বলল ওডিন, “এটুকু স্বীকার করতেই হচ্ছে।”
হেল কিছুই বলল না। সে শুধু তার বরফ খন্ডের মত শীতল সবুজ চোখ আর মৃত ফ্যাকাশে ঘোলা চোখ তুলে তাকিয়ে থাকল, তার চোখে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না।
“তুমি জীবিত?” ওডিন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল। “নাকি মৃত?”
“আমি শুধু আমি, হেল, আঙ্গরবদা আর লোকির কন্যা,” বলল মেয়েটি। “আর আমি মৃতদের সবচেয়ে পছন্দ করি। তারা খুবই সাধারণ আর আমার সাথে সম্মানের সাথে কথা বলে। জীবিতরা আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায়।”
ওডিন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হল এবং তার স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। তখন ওডিন বলল, “এই বাচ্চাটি সবচেয়ে গভীরতম অন্ধকার স্থানের শাসক হবে, নয় দুনিয়ার সকল মৃতের শাসক। যারা রোগে, বৃদ্ধ বয়সে, দুর্ঘটনা আর বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে সব অভাগা আত্মার রানী হবে সে। যারা বীরের মতো যুদ্ধে মৃত্যু বরণ করবে, তারা সর্বদা আমাদের সাথে এখানে ভেল হালায় যোগ দেবে। কিন্তু যারা অন্যভাবে মারা যাবে, তারা হেলের সঙ্গী হবে, তার সাথে অনন্ত আঁধারে থাকবে।
মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসার পর এই প্রথম হেল হাসল, তার অর্ধেক জীবিত মুখে।
ওডিন তাকে পাতালে অন্ধকার রাজ্যে নিয়ে গেল। সে তাকে তার সুবিশাল হল দেখাল যেখানে সে তার প্রজাদের গ্রহণ করবে।
“আমি আমার খাবার পাত্রের নাম দিলাম ক্ষুধা” বলল হেল। সে একটা চাকু তুলে নিল, “এটাকে ডাকব মহামারি। আর শয্যার নাম হবে মৃত্যু শয্যা।”
লোকির দুই সন্তানের গতি হলো। একজনের সমুদ্রে আর আরেকজন পাতালে অন্ধকার জগতে। কিন্তু তৃতীয়জনকে নিয়ে কি করা যায়?
(চলবে)
নীল গেই ম্যানের নর্সমিথোলজি থেকে অনূদিত। অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here