নরওয়ের রূপকথা

0
332

দেবতাদের বহুমূল্য রত্ন-২

ব্রুক আর এইত্রি তাদের কামারশালায় প্রবেশ করল। কামারশালায় অন্ধকার জ্বলন্ত কয়লার কমলা রংয়ের আগুনে আলোকিত ছিল। এইত্রি সেলফ থেকে এক টুকরো বরাহের চামড়া তুলে নিল আর যন্ত্রের উপর স্থাপন করল।

“এই রকম একটা দিনের জন্যই এই চামড়াটি আমি এতদিন সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম”, এইত্রি বলল। ব্রুক শুধু মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে, এইত্রি বলল”, তুমি হাঁপরটা চালাও। একতালে হাঁপর চালাতে থাক। আমি ভালো পরিমাণ তাপ চাই, একইরকম তাপ, কমবেশি হলে হবে না, তাহলে কাজটা ভালো হবে না।

ব্রুক হাঁপর চালাতে শুরু করল, কামারশালার আগুনে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস ঢুকতে লাগল আর আগুনের তাপে সবকিছু উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আগুন তার পছন্দমতো গরম হওয়া পর্যন্ত এইত্রি অপেক্ষা করল।

এইত্রি যখন তার কাজ করার জন্য বাইরে যাওয়ার জন্য দরজা খুলল, একটা বড় কালো উড়ন্ত মাছি ঘরে ঢুকল, এটি সাধারণ মাছির মতো ছিল না, ভোমরার মতও নয়, তবে আকারে ছিল অনেক বড়ো। এটা উড়ে ঘরে ঢুকল আর রুমের ভিতরে চক্রাকারে উড়তে লাগল।

ব্রুক ঘরের বাইরে এইত্রির হাতুড়ির শব্দ, ধাতুর ঘষাঘষি, মোচড়ানোর শুনতে পেল। কালো বড়ো মাছিটি, এত বড়ো মাছি যেটি তুমি কখনো দেখো নি, ব্রুকের বাহুর পিছনে এসে বসল।

ব্রুকের দুই হাতই হাঁপর চালানোয় ব্যস্ত ছিল, সে মাছিটিকে তাড়াতে পারল না। মাছিটি ব্রুকের হাতে জোরে কামড়াল।

ব্রুক হাঁপর চালিয়ে গেল, থামল না।

দরজা খুলে গেল, এইত্রি ঘরে ঢুকল আর যন্ত্র থেকে তার বানানো জিনিসটি তুলল, দেখতে সেটি একটি বৃহৎ বরাহের মতো হলো, স্বর্ণের লোমযুক্ত।

“খুব ভালো কাজ হয়েছে” এইত্রি বলল, “একুট তাপের তারতম্য হলেই কাজটা বরাবাদ হয়ে যেত।”
“তুমিও খুব ভালো কাজ করেছে”, বলল ব্রুক।
সিলিং এর কোনায় বসে বড়ো আকারের মাছিটি অসন্তোষে আর বিরক্তিতে বিড়বিড় করল।
এইত্রি এক খন্ড স্বর্ণ যন্ত্রে স্থাপন করল।
“পরের রত্নটি দেবতাদের চমৎকৃত করবে, যখন আমি বলব, হাঁপর চালানো শুরু করবে এবং যা কিছু হোক…
“হাঁপর চালানো বন্ধ করা যাবে না, একতালে চালাতে হবে , কমবেশি করা যাবে না?”
“ঠিক তাই। কাজটা খুবই জটিল।”
“ঠিক আছে”, ব্রুক বলল।
এইত্রি রুম ত্যাগ করল, বাইরে গিয়ে কাজ শুরু করল, ব্রুক এইত্রির ডাকের জন্য অপেক্ষায় থাকল, এইত্রি বলার সাথে সাথে হাঁপর চালাতে শুরু করল।

মাছিটি ভাবনা চিন্তা করতে করতে রুমের মধ্যে চক্রাকারে উড়তে লাগল, উড়তে উড়তে ব্রুকের ঘাড়ের পিছনে এসে বসল। সেটি ব্রুকের ঘাড়ে সর্বশক্তিতে কামড়াল। ব্রুকের ঘাড় থেকে লাল রক্ত বেরিয়ে মেঝের সাথে গাড়িয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু বামন কারিগর হাঁপর চালানো থামাল না।

এইত্রি ফিরে এল। সে যন্ত্র থেকে সাদা রঙের একটি বাহু বন্ধনী তুলে ধরল। সেটাকে ঠান্ডা করার জন্য পানিতে ফেলল। পানি থেকে বাষ্পের কুন্ডুলি উঠল, বাহুবন্ধনীটি দ্রুত ঠান্ডা হয়ে প্রথমে কমলা, তারপর লাল, আর সবশেষে পুরাপুরি ঠান্ডা হয়ে সোনালি রং ধারণ করল।
“এটাকে ড্রপনির মানে ডাকা হবে”

“এবার”, বলল এইত্রি, “আমি এমন একটা রত্ন বানাব, যেটা আমি বহুদিন ধরেই বানাতে চাই। আমার শ্রেষ্ঠ কাজ। কিন্তু এই কাজটি অন্য দুটির চেয়ে অনেক কঠিন সুতরাং তোমাকে…”
“ ক্রমাগত হাঁপর চালাতে হবে, থামা যাবে না, তাই তো?” জানাতে চাইল ব্রুক।
“ঠিক তাই”, জবাব দিল এইত্রি, “আগের চেয়ে অনেক সাবধানে। মোটেই কম বেশি করা যাবে না, তাহলে গোটা ব্যাপারটা মাটি হয়ে যাবে।”

বড়ো মাছিটি (যে আসলে লোকি ছিল) দেখল এইত্রি একটা কাঁচা লোহার বৃহৎ খন্ড তুলে নিল আর যন্ত্রে বসিয়ে দিলো, লোকি এত বড়ো কাঁচা লোহার খন্ড কখনোই দেখেনি।

এইত্রি ঘর ত্যাগ করল আর ব্রুককে হাঁপর চালাতে বলল। ব্রুক হাঁপর চালাতে লাগল, ওদিকে এইত্রির হাতুড়ির শব্দ, লোহা ঝালাই আর আকার দেওয়ার শব্দ শোনা যেতে লাগল।

মাছির বেশ ধরে থাকা লোকি সিদ্ধান্ত নিলো, সাবধানে থাকার আর সময় নেই। এইত্রির সেরা কাজে দেবতারা চমৎকৃত হয়ে যাবেন। আর যদি দেবতারা চমৎকৃত হন, সে তার মাথাটা হারাবে। লোকি উড়ে গিয়ে ব্রুকের দুই চোখের মাঝে গিয়ে বসল আর চোখের পাতায় কামরাতে শুরু করল। বামন ক্রমাগত হাঁপর চালিয়ে গেল, তার চোখে কামড়ের ব্যথা সহ্য করে, লোকি আরো জোরে শক্ত করে, নিদারুণভাবে কামড় বসাল। বামনের চোখের পাতা থেকে রক্ত গড়িয়ে তার চোখে মুখে পড়তে লগল, সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না।

ব্রুক চোখ টিপে মাথা ঝাকিয়ে মাছিটি তাড়াতে চেষ্টা করল। সে তার মাথা এদিক ওদিক নাড়াল। সে তার মুখ ঝাকাল আর ফুঁ দিয়ে মাছিটি মুখ থেকে সরাতে চাইল। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো ফল হল না। মাছিটি ক্রমাগত কামড়ে গেল, বামন শুধু রক্ত দেখতে পেল। সে তীব্র ব্যথা অনুভব করল।

ব্রুক তার হাঁপরের হাতল নিচে নামাল আর হাতল থেকে একহাত সরিয়ে মাছির উপর চাপড় মারল। এতো জোরে আর দ্রুত মারল যে লোকি কোনোমতে উড়ে গিয়ে জীবন বাঁচাল। ব্রুক দ্রুত হাঁপরের হাতল ধরল আর হাঁপর চালাতে লাগল।

‘হাঁপর থামাও’, এইত্রি চিৎকার দিয়ে বলল।
এইত্রি ঘরে প্রবেশ করল আর খোলা দরজা দিয়ে মাছিটি দ্রুত ঘর ত্যাগ করল। এইত্রি তার ভাইয়ের দিকে অসন্তোষের সাথে তাকাল। রক্ত আর ঘামে ব্রুুকের মুখ একেবারে মাখামাখি হয়ে আছে।
“আমি জানি না, সে সময় তুমি কি করছিলে। আরেকটু হলেই তুমি সব নষ্ট করে দিচ্ছিলে, শেষ দিকে তাপ বেড়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, দেখ আমি যেমনটি আশা করেছিলাম, এই রত্নটা মোটেই ততটা চমৎকার হয়নি।”
লোকি আসল লোকির আকারে খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করল।
“প্রতিযোগিতার জন্য সবকিছু প্রস্তুত?” লোকি জানতে চাইল।
“ব্রুক এসগার্ড গিয়ে আমাদের উপহার দেবতাদের দেবে আর তোমার মাথাটি কেটে নিয়ে আসবে।” এইত্রি বলল, “আমি এখানেই আমার কামারশালায় থেকে জিনিসপত্র বানাতে পছন্দ করি।”
ব্রুক তার ফুলে থাকা চোখ দিয়ে লোকির দিকে তাকাল।
“আমি তোমার মাথা কাটার অপেক্ষায় আছি। ব্যাপারটা একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌছে গেছে।”
(চলবে)

নীল গেইম্যানের ‘নর্স মিথলজী’ থেকে অনূদিত।
অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here