নরওয়ের রূপকথা

0
22

রাগনারক: দেবতাদের শেষ পরিণতি-২
ওডিন সোজা ফেনরিরের দিকে তার ঘোড়া ছোটাবে। নেকড়ে ফেনরির এখন কল্পনাতীত আকারের বড়ো হয়ে গেছে। বিশ্বপিতা হাতের মুঠিতে তার বর্শা গাংনীর শক্ত করে ধরে সামনে অগ্রসর হবেন।
থর দেখবে ওডিন নেকড়ের মোকাবিলা করতে গেছে। দেখে থর মুচকি হাসবে আর আরো দ্রুত চলার জন্য তার ছাগলগুলোর উপর চাবুক হানবে আর তার হাতুড়ি হাতে সোজা মিডগার্ডের সর্প জরমুন গুন্ডারের দিকে এগিয়ে যাবে।
ফ্রে জ্বলন্ত আর দানবাকৃতির সুরটারের মুখোমুখি হবে। সুরটারের হাতে থাকবে বিশাল এক জ্বলন্ত তরবারি। ফ্রে প্রাণপনে যুদ্ধ করবে, কিন্তু সুরটারের জ্বলন্ত তরবারির কাছে ফ্রের তরবারি আর বর্ম পরাজিত হবে আর দেবতাদের মধ্যে ফ্রেই প্রথম ধরাশায়ী হবে। মৃত্যুর সময় ফ্রে তার তরবারিটির জন্য আফসোস করবে, যে তরবারিটি বহুদিন আগে সে জার্ডের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য স্কিরনিরকে দিয়ে দিয়েছিল। আজ সেটি থাকলে সে নিজেকে বাঁচাতে পারত।
যুদ্ধের নিনাদে চতুর্দিক ভারি হয়ে উঠবে। ওডিনের যোদ্ধা আইন হারজারেরা লোকির সেনা নরকের মৃতদের সাথে ভয়ানক সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।
নরকের হাউন্ড জার্ম ক্রোধে গর্জন করতে থাকবে। সে আকারে ফেনরিরের চেয়ে ছোটো, কিন্তু তবুও সে সকল কুকুরের চেয়ে বড়ো আর ভয়ংকর। সেও মাটির নিচ থেকে তার বাঁধন ছিড়ে পৃথিবীর যোদ্ধাদের গলা ছিড়ে ফেলে হত্যা করার জন্য ফিরে আসবে।
এক হাত বিশিষ্ট টীর তাকে থামাবে আর তাদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হবে। টীর সাহসিকতার সাথে লড়াই করবে, কিন্তু লড়াইতে তাদের দুজনেরই মৃত্যু হবে। টীরের গলা কামড়ে ধরা অবস্থায় জার্মের মৃত্যু হবে।
থর অবশেষে মিডগার্ডের সর্পকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, যেটা সে অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে পোষণ করত।
থর তার হাতুড়ি দিয়ে বিশাল সর্পের মাথা থেতলে দেবে, সর্পের মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই সে লাফিয়ে পিছনে সরে আসবে।
সর্পের মাথা যখন মাটিতে আছড়ে পড়বে, থর সেটা থেকে নয় ফুট দূরে থাকবে, কিন্তু সেটা যথেষ্ট হবে না। মরার আগে, সর্প থরের উপর কালো বিষ ছিটিয়ে তার বিষথলি খালি করে ফেলবে।
থর ব্যথায় কাতরে উঠবে আর তার হত্যা করা সর্পেরই বিষে মৃতুবরণ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।
ওডিন সাহসিকতার সাথে ফেনরিরের সাথে যুদ্ধ করবে, কিন্তু নেকড়ে এখন দুনিয়ার যে কোনো কিছুর চেয়ে বড়ো আর ভয়ংকর। চন্দ্রের চেয়ে বড়ো, বড়ো সূর্যের চেয়েও। ওডিন নেকড়ের মুখের ভিতর তার বর্শা চালাবে, কিন্তু ফেনরিরের এক কামড়ে সেটা অদৃশ্য হয়ে যাবে। নেকড়ে আরেকটা কামড় বসাবে এবং কুড়মুড় শব্দ হবে, আর বিশ্বপিতা, দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আর জ্ঞানী ওডিন, নেকড়ের পেটে অদৃশ্য হয়ে যাবে, তাকে আর কখনো দেখা যাবে না।
চুপচাপ আর নির্ভরযোগ্য দেবতা, ওডিনের পুত্র ভিডার, তার পিতার মৃত্যু দেখবে। সে সামনে এগিয়ে যাবে আর তার পা দিয়ে নেকড়ের নিচের চোয়াল মাটিতে চেপে ধরবে।
ভিডারের দুই পা দেখতে দুই রকম। তার এক পায়ে সাধারণ জুতা। কিন্তু অন্য পায়ের জুতা সেই সময়ের শুরু থেকেই বানানো হচ্ছে। মানুষ নিজেদের জুতা বানানোর সময় গোড়ালীর দিক হতে যে চামড়ার অংশ কেটে ফেলে দেয়, এগুলো জোড়া লাগিয়ে লাগিয়ে এই জুতা তৈরি হচ্ছে।
(যদি তুমি দেবতাদের শেষ যুদ্ধে সাহায্য করতে চাও, জুতা বানানোর পর চামড়ার টুকরো অংশ ফেলে দাও। চামড়ার টুকরো আর ফেলে দেওয়া অংশ ভিডারের জুতায় পরিণত হবে)
এই বিশেষ জুতা বিশাল নেকড়ের নিচের চোয়াল মাটির সাথে চেপে রাখবে, ফলে নেকড়ে আর নড়াচড়া করতে পারবে না। তখন ভিডার এক হাত বাড়িয়ে নেকড়ের উপরের চোয়াল ধরবে আর সেটা নেকড়ের মুখ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে আসবে। আর তাতে ফেনরির মারা যাবে এবং ভিডাল তার পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে।
ভিগ্রিড ময়দানের যুদ্ধক্ষেত্রে দেবতারা তুষার দানবদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে, তুষার দানবেরা দেবতাদের সাথে লড়তে লড়তে মারা যাবে। হেলের অর্ধমৃত সৈন্যরা শেষ যুদ্ধের ময়দানে কচুকাটা হয়ে মরে পড়ে থাকবে, আর তাদের পাশেই আইনহারজারেরা মৃত কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের নিচে শেষবারের মতো মৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে, যুদ্ধ করার জন্য আর কখনো তারা বেঁচে উঠবে না।
লোকির বাহিনীর মধ্যে একমাত্র লোকি বেঁচে থাকবে, তার মুখ রক্তাক্ত, চোখে পাগলা দৃষ্টি আর কাঁটা ঠোটের কোনে সন্তুষ্টির হাসি।
দেবতাদের রক্ষী, রংধনু সেতুর রক্ষক হাইমডেল তখনো জীবিত থাকবে। সে তার রক্তে ভেজা তরবারি হফুড হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে দন্ডায়মান থাকবে।
ভিগ্রিডের ভিতর দিয়ে মৃতদেহ, রক্ত আগুন পেরিয়ে তারা একে অপরের মুখোমুখি হবে।
“আহ,” বলবে লোকি, “দেবতাদের প্রহরী হাইমডেল। তুমি দেবতাদের জাগাতে অনেক দেরী করে ফেলেছ, হাইমডেল। তাদের একে একে মরতে দেখাটা খুবই মজাদার ছিল, তাই না?”
লোকি হাইমডেলের চেহারায় দুর্বলতা আর আবেগ খুঁজল, কিন্তু হাইমডেল নির্লিপ্তই থাকল।
“তোমার তাহলে কিছুই বলার নেই, নয় মায়ের সন্তান হাইমডেল? যখন আমি মাটির গভীরে বন্দি ছিলাম, সাপের বিষ আমার মুখের উপর পড়ছিল, অসহায় সিজিন পাত্র হাতে বিষ ধরতে চেষ্টা করছিল, যখন আমি নিজের ছেলের অন্ত্র দিয়ে বাঁধা ছিলাম, এই সময়টার কথা ভেবেই আমি নিজেকে পাগল হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছি, মনে মনে এই দিনটির কথাই চিন্তা করেছি, যখন আমি আর আমার সন্তানেরা দেবতাদের যুগের ইতি ঘটাব আর দুনিয়া ধ্বংস করে দেবো।”
হাইমডেল তখনো কিছুই বলবে না, কিন্তু সে লোকিকে সজোরে আঘাত করবে, আর তার তরবারি লোকির বর্মে আঘাত করবে, লোকি সেই আঘাত ঠেকাবে আর ক্ষিপ্রতার সাথে পালটা আঘাত করবে।
যুদ্ধ করতে করতে তারা স্মরণ করবে, অনেক দিন আগে তারা একবার যুদ্ধ করেছিল, যখন দুনিয়া অনেক সহজ ছিল। তারা সীল রূপে ফ্রেয়ার কন্ঠহারের জন্য লড়াই করেছিল, যে কন্ঠহারটি লোকি ওডিনের কথায় ফ্রেয়ার কাছ থেকে চুরি করেছিল, আর হাইমডেল সেটি উদ্ধার করে ফেরত দিয়েছিল।
লোকি তার অপমানের কথা কখনো ভোলে না।
তারা যুদ্ধ করতে থাকবে, একে অপরকে কেটে ফেলা, তলোয়ার দিয়ে ফুঁড়ে ফেলার আঘাত করার চেষ্টা করতে থাকবে।
যুদ্ধ করতে করতে একসময় হাইমডেল আর লোকি দুজনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে, দুজনেই ভীষণভাবে আহত থাকবে।
“সব কিছু শেষ হয়েছে,” ফিসফিস করবে লোকি, “আমি জিতে গেছি।”
কিন্তু হাইমিডেল তার রক্তাক্ত সোনালী দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুচকি হাসবে, “আমি তোমার চেয়ে ভবিষ্যৎ বেশি দেখতে পাই,” হাইমডেল লোকিকে বলবে। “ওডিনের ছেলে ভিডার নেকড়ে ফেনরিরকে হত্যা করেছে আর ভিডার বেঁচে আছে। ওডিনের আরেক ছেলে ভালিও বেঁচে আছে। থর মারা গেছে, কিন্তু সন্তান মাগনি আর মডি বেঁচে আছে। তারা তাদের মৃত বাবার হাত থেকে মিওলনির তুলে নিয়েছে। তারা সেটা ব্যবহার করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী।”
“তাতে কিছু আসে যায় না। সমস্ত দুনিয়া জ্বলছে,” বলল লোকি। “মরণশীল মানুষেরা সব মরে শেষ হয়ে গেছে। মিডগার্ড ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি জিতে গেছি।”
“তুমি যা দেখছ, আমি তার চেয়ে অনেক বেশি দেখতে পাই, লোকি। আমি এমনকি বিশ্ববৃক্ষ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি,” হাইমডেল শেষ নিশ্বাসে বলল, “সুরটারের আগুন বিশ্ববৃক্ষকে স্পর্শ করতে পারেনা আর দুজন মানব-মানবী ইগড্রাসীলের গুড়ির মধ্যে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে। নারীটি হলো জীবন আর পুরুষটি হল জীবনতৃষ্ণা। তাদের বংশধরেরা আবার পৃথিবীকে মানুষে পূর্ণ করবে। এখনই সব শেষ নয়। আসলে শেষ বলে কিছু নেই। এটা শুধুমাত্র পুরাতন সময়ের সমাপ্তি, লোকি, আর নতুন এক সময়ের শুরু। মৃত্যুর পরই জীবন আসে। তুমি হেরে গেছ।”
নীল গেইম্যানের ‘নর্স মিথোলজি’ থেকে অনূদিত।

অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here