নরওয়ের রূপকথা

0
161

মহানির্মাতা-১
থর গিয়েছিল উত্তরে, ট্রোলদের সাথে যুদ্ধ করতে। থরের অনুপস্থিতিতে এসগার্ড ছিল অনেকটাই শান্তিপূর্ণ কিন্তু একই সাথে ছিল অরক্ষিতও। সময়টা শুরুর দিকের, এসির আর ভানিরদের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, দেবতারা তাদের দুনিয়া সাজাচ্ছে। এসগার্ড ছিল অরক্ষিত।
“আমরা সবসময় থরের উপর নির্ভর করে থাকতে পারি না”, বলল ওডিন, “আমাদের সুরক্ষার প্রয়োজন। দানবরা আসবে। ট্রোলরাও আমাদের আক্রমণ করবে।”
“আপনি কি প্রস্তাব করছেন?” দেবতাদের প্রহরী হাইমডেল জানতে চাইল।
“একটা প্রাচীর”, বলল ওডিন “এটা এত উঁচু হবে যে তুষার দানবদের আটকাবে। এতটা চওড়া হবে যে সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রোলও সেটাকে ভাঙ্গতে পারবে না।”
“এরকম একটা প্রাচীর”, বলল লোকি, “এত উচু আর এত চওড়া করে বানাতে অনেক বছর সময় লেগে যাবে।”
ওডিন সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল, “কিন্তু তারপরও”, সে বলল, “আমাদের একটা প্রাচীর বানানো দরকার।”
পরদিন এসগার্ডে এক আগন্তুক এলো। লোকটা ছিল অনেক লম্বা আর মিস্ত্রির পোশাক পরা। তার সাথে ছিল বিশাল বড় বাদামী রঙের একটা মদ্দা ঘোড়া।
“লোকজন বলছিল, তোমাদের নাকি একটা প্রাচীর বানাতে হবে”, বলল আগুন্তুক।
“হ্যাঁ, ঠিক তাই”, বলল ওডিন।
“আমি তোমাদের একটা প্রাচীর বানিয়ে দিতে পারি। সবচেয়ে লম্বা দানবও সেটা টপকাতে পারবে না। প্রাচীরটা এত চওড়া হবে যে, সবচেয়ে শক্তিলালী ট্রোলও সেটা ভেঙ্গে ঢুকতে পারবে না। পাথরের উপর পাথর বসিয়ে এমন নিখুঁত প্রাচীর বানাব যে, একটা পিপড়াও এর মধ্য দিয়ে ঢুকার জন্য ফাঁক খুজে পাবে না । আমি তোমাদের এমন প্রাচীর বানিয়ে দেবো, যেটা হাজার হাজার বছর টিকে থাকবে।”
“এমন একটা প্রাচীর বানাতে অনেক সময় লেগে যাবে”, বলল লোকি।
“মোটেই না”, বলল আগন্তুক,“আমি এটা তিন মৌসুমের মধ্যে বানাতে পারব। আগামীকাল শীতের প্রথম দিন। আমি প্রাচীর তৈরীর জন্য এই শীত, গ্রীষ্মকাল ও তার পরের শীত পর্যন্ত সময় নেব।”
“তুমি যদি এটা বানাতে পার” বলল ওডিন, “বিনিময়ে তুমি কি চাও?”
“এই কাজের বিনিময়ে আমি খুব কমই চাই”, লোকটা বলল, “শুধুমাত্র তিনটা জিনিস চাই। আমি সুন্দরী দেবী ফ্রেয়াকে বিয়ে করতে চাই।”
“এটা কম কোনো বিষয় নয়”, বলল ওডিন, “আর এ বিষয়ে ফ্রেয়ার নিজস্ব কোনো মত থাকলেও আমি অবাক হব না। অন্য দুটি জিনিস কি?”
আগন্তুক আত্মবিশ্বাসের হাসি হাসল। “যদি আমি তোমাদের প্রাচীর বানিয়ে দিতে পারি, আমি ফ্রেয়াকে বিয়ে করতে চাই। আমি দিনে কিরণ দেওয়া সূর্য আর রাতে জোৎস্না দেওয়া চন্দ্রটি চাই। এই তিনটি জিনিস দেবতারা আমাকে দিতে হবে, যদি আমি প্রাচীরটি বানাতে পারি।”
দেবতারা সবাই ফ্রেয়ার দিকে তাকাল। সে কিছুই বলছিল না কিন্তু তার ঠোঁট দুটো শক্ত করে পরষ্পর আঁটা ছিল আর তার মুখ রাগে সাদা হয়ে গিয়েছিল।
“বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করো”, ওডিন আগন্তুককে বলল। লোকটা বাইরে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করল, কোথায় সে তার ঘোড়ার খাবার আর পানি পেতে পারে। ঘোড়াটির নাম ছিল সেভডিল ফেয়ারি, অর্থাৎ যে দুর্ভাগা যাত্রায় বেরিয়েছে।
ওডিন নিজের কপালে হাত বুলাল। সে দেবতাদের দিকে ফিরল।
“এখন কি করণীয়?”
দেবতারা সবাই সমস্বরে কথা বলতে শুরু করল।
“চুপ কর”, চিৎকার করে বলল ওডিন, “একজন একজন করে বলো।” সকল দেব-দেবীদের মতামত ছিল আর সবার মত ছিল একইরকম। ফ্রেয়া, সূর্য আর চন্দ্র খুবই মূল্যবান আর গুরুত্ত্বপূর্ণ। প্রাচীর বানানোর বিনিময়ে একজন আগন্তুককে এগুলো দিয়ে দেওয়া মোটেই উচিত হবে না।
ফ্রেয়ার আরও অতিরিক্ত মতামত ছিল। তার মত ছিল লোকটাকে তার ধৃষ্টতার জন্য আচ্ছামত উত্তম মধ্যম দিয়ে এসগার্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক।
সুতরাং, বলল বিশ্বপিতা ওডিন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা লোকটাকে না করে দেবো।”
দরবার কক্ষের এক কোনা থেকে শুকনো কাশির শব্দ শোনা গেল। এমন কাশি সাধারণত কারো মনযোগ আকর্ষণের জন্য দেওয়া হয়। দেবতারা ফিরে তাকাল কে কাশল দেখার জন্য। তারা দেখল লোকি মুখে হাসি নিয়ে একটা হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে কিছু বলতে চায়।
“আমার জানানো উচিত, বলল লোকি, “তোমরা গুরুত্ত্বপূর্ণ একটা বিষয় মিস করে যাচ্ছ।”
“দেবতাদের অনিষ্ট সৃষ্টিকারী লোকি, আমার মনে হয় না আমরা কোন বিষয় বাদ দিয়ে গেছি”, কর্কশভাবে বলে উঠেন ফ্রেয়া।
“তোমরা সবাই বিষয়টি উপেক্ষা করে যাচ্ছ”, বলল লোকি। “আগন্তুক যে প্রস্তাব করেছে, সেটা এক কথায় অসম্ভব। দুনিয়ায় এমন কোনো লোক নেই যে তিন মৌসুমে এমন উঁচু আর চওড়া প্রাচীর বানাতে পারে। কোনো দেবতা বা দানবের পক্ষেই সম্ভব নয়, কোনো মানুষের পক্ষে তো নয়ই। আমি আমার গায়ের চামড়া বাজি ধরে বলতে পারি।”
লোকির কথায় দেবতারা সবাই মাথা ঝাকাল, তাদের লোকির কথায় সম্মত বলে মনে হলো। শুধু ফ্রেয়াকে রাগান্বিত দেখাল।
“তোমরা সবাই বোকা”, বলল ফ্রেয়া, “বিশেষ করে তুমি, লোকি। তুমি নিজেকে খুব চালাক ভাব, না?”
“মিস্ত্রী লোকটা যা বলেছে, সে হয়ত করে দেখাতে পারবে”, বলল লোকি, “অসম্ভব মনে হলেও সে পারবে। তাই আমি প্রস্তাব করছি আমরা লোকটার প্রস্তাবে রাজি হব, কিন্তু তাকে আমরা কঠিন শর্ত দেবো। সে প্রাচীর একাই বানাবে, অন্য কারো সাহায্য নিতে পারবে না আর তিন মৌসুমের পরির্বতে যে প্রাচীর বানানোর জন্য মাত্র এক মৌসুম সময় পাবে। যদি গ্রীষ্মের প্রথম দিনে প্রাচীর অসমাপ্ত থাকে এবং সেটাই আসলে হবে- আমরা তাকে কিছুই দেবো না।”
“প্রাচীর না বানানোর চেয়ে এই প্রস্তাব দিয়ে আমাদের কি সুবিধা হবে?”
লোকির ধৈর্যচ্যুতি হলেও সে চেহারায় প্রকাশ করল না । ‘দেবতারা সবাই কি বোকা?’ সে ব্যাখ্যা করে বুঝাতে শুরু করল, যেমন করে লোকজন বাচ্চা ছেলেদের বুঝায়।
“মিস্ত্রি লোকটা প্রাচীর বানাতে শুরু করবে। সে সেটা সময়মত শেষ করতে পারবে না । সে বোকার মত ছয় মাস বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে। ছয় মাস পর আমরা তাকে তাড়িয়ে দেবো- আমরা তাকে তার স্পর্ধার জন্য উত্তম মধ্যমও দিতে পারি- তারপর তার বানানো ভিত্তির উপর আমরা সামনের বছরগুলোতে প্রাচীরটা সম্পূর্ণ করে ফেলব। আমাদের ফ্রেয়াকে হারানোরই ভয় নেই, চন্দ্র আর সূর্যের কথা বাদই দিলাম।
“এক মৌসুমে দেয়াল বানাতে লোকটা কেন রাজি হবে?” যুদ্ধ দেবতাটি জানতে চাইল।
“সে হয়তো রাজি হবে না”, বলল লোকি, “তবে তাকে বেশ অহংকারী মনে হয়েছে এবং আমার মনে হচ্ছে, চ্যালেঞ্জটা সে ফেলতে পারবে না।”
সকল দেবতারা গর্জন করল, লোকির পিঠ চাপড়াল আর লোকিকে বলল যে সে খুবই চালাক। এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে সে তাদের দলে আছে। এখন তারা বিনা পারিশ্রামিকে একটা দেয়ালের ভিত্তি পেয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা আর দরকষাকষি দক্ষতার জন্য একে অপরকে অভিনন্দন জানাল।
ফ্রেয়া কিছুই বলল না। সে তার জ্যোতির্ময় কন্ঠ হারে হাত রাখল। যখন সে গোসল করছিল, এই হারটিই লোকি সীল মাছের রূপ ধরে চুরি করেছিল, সেটি উদ্ধার করার জন্য হাইমডেলকে সীল মাছের বেশে লোকির সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। সে লোকিকে মোটেই বিশ্বাস করে না। কথাবার্তা যেদিকে গড়ালো, সে বিষয়টিকে পাত্তা দিলো না।
দেবতারা নির্মাতাকে দরবার হলে ডাকল। সে চতুর্দিকে দেবতাদের দিকে তাকাল। তারা খোশ মেজাজে একে অপরকে খোঁচা দিচ্ছিল আর হাসাহাসি করছিল। শুধু ফ্রেয়া হাসছিল না।
“কি সিদ্ধান্ত হলো”, জানতে চাইল নির্মাতা।
“তুমি তিন মৌসুম সময় চেয়েছিলে”, বলল লোকি, “আমরা তোমাকে এক মৌসুম সময় দেবো, শুধুমাত্র এক মৌসুম। আগামীকাল শীতের প্রথম দিন। তুমি যদি গ্রীষ্মের প্রথম দিনের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পার, তুমি কিছুই পাবে না। কিন্তু তুমি যদি প্রাচীর বানানোর কাজ শেষ করতে পার- তুমি যেমন উঁচু আর চওড়া করে বানানোর কথা বলেছ, তাহলে তুমি যা চেয়েছ সবই পাবে, চন্দ্র, সূর্য আর সুন্দরী ফ্রেয়া, তবে তুমি অন্য কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য নিতে পারবে না, কাজটা তোমাকে একা করতে হবে।”
আগন্তুক কয়েক মুহুর্ত কিছুই বলল না। সে দূরে তাকাল আর লোকির শর্তগুলো নিয়ে ভাবল। তারপর সে দেবতাদের দিকে তাকাল আর কাঁধ ঝাকাল।
“তোমায় বলছি, আমি অন্য কারো সাহায্য নিতে পারব না। আমি শুধু আমার ঘোড়া সেভদিলফেয়ারিকে দিয়ে পাথর টানাতে চাই যে পাথর ব্যবহার করে দেয়ালটি বানাব। আমার মনে হয় এটা কোনো অযৌক্তিক অনুরোধ নয়।”
“এটা অযৌক্তিক নয়” ওডিন রাজি হলো। অন্য দেবতারাও সম্মতি দিলো আর বলাবলি করল, ভারি পাথর টানার জন্য ঘোড়া খুবই ভালো কাজে দেয়।
তারা শপথ নিল, দৃঢ় শপথ। দেবতারা আর আগন্তুক তাদের অস্ত্রের শপথ নিল। শপথ নিল ওডিনের সোনালি বাহুবন্ধনী ড্রপনিরের আর ওডিনের বর্শা গাংনিরের, গাংনিরের উপর শপথ নিলে সেটা আর ভাঙা যায় না। তারা শপথ নিল তারা শর্ত পালন করবে,একে অপরের সাথে প্রতারণা করবে না।
পরদিন সকালে যখন সূর্য উদিত হলো, দেবতারা লোকটির কাজ দেখার জন্য জড়ো হলো। লোকটি তার হাতের তালুতে থুতু লাগিয়ে প্রাচীরের ভিত্তির জন্য গর্ত খুড়তে শুরু করল।
(চলবে)
নীল গেইম্যানের নর্স মিথোলজি’ থেকে অনূদিত। অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here