নরওয়ের রূপকথা

0
222

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মহানির্মাতা- গল্পের ২য় অংশ


“সে অনেক গভীর করে খুঁড়ছে,” বলল হাইমডেল।
“সে অনেক দ্রুত খুঁড়ছে,” ফ্রেয়ার ভাই ফ্রে বলল।
“অবশ্যই সে ভালো গর্ত আর পরিখা খুঁড়তে পারে,” অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলল লোকি। “কিন্তু ভেবে দেখ তাকে পাহাড় থেকে কত কত পাথর এখানে টেনে আনতে হবে। পরিখা খনন করা এক জিনিস আর এত এত পাথর এত মাইল দূর থেকে কারো সাহায্য ছাড়া টেনে এনে একটার উপর একটা নিখুঁতভাবে বসানো যেটার ভিতর দিয়ে পিঁপড়াও গলে যেতে পারবে না, সবচেয়ে লম্বা দানবের চেয়েও উঁচু হবে, এমন প্রাচীর বানিয়ে ফেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।”
ফ্রেয়া বিরক্তির সাথে লোকির দিকে তাকালো, কিন্তু কিছুই বলল না।
সূর্য ডুবে গেলে লোকটি তার ঘোড়ায় চড়ে পাথর আনতে পাহাড়ের দিকে রওনা হয়ে গেল। ঘোড়ার পিছনে নরম মাটিতে টেনে নেওয়ার উপযোগী একটা নিচু স্লেড আটকানো ছিল। দেবতারা তাদের চলে যেতে দেখল। শীতের আকাশের চাঁদ তখন মাথার উপর জোৎস্না ছড়াচ্ছিল।

“সে এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসবে,” বলল লোকি। “দেখা যাক ঘোড়াটা একবারে কত পাথর টেনে আনতে পারে। এটাকে যথেষ্ট শক্তিশালী মনে হচ্ছে।”
দেবতারা তাদের ভোজ কক্ষে গমন করল। সেখানে প্রচুর হাসি ঠাট্টা হলো, কিন্তু ফ্রেয়া মোটেই সেসবে যোগ দিল না।
সকালের পূর্বে তুষারপাত হলো, তুষারের হালকা চাদরে চতুর্দিক ঢেকে গেল, শীত বাড়ার সাথে সাথে আরো ভারী তুষারপাত হবে, এটা তারই অগ্রিম বার্তা।
হাইমডেল, যে এসগার্ডে কে আসে কে যায়, সব দেখে আর নজরে রাখে, যার চোখে কোনো কিছুই এড়ায় না, অন্ধকার থাকতেই দেবতাদের ডেকে তুলল। আগের দিন আগন্তুকের খোড়া পরিখার কাছে সবাই গিয়ে জড়ো হলো। ভোরের আবছা আলোয় তারা দেখল নির্মাতা লোকটা তার ঘোড়াটিকে সাথে নিয়ে তাদের দিকে হেঁটে আসছে।
ঘোড়াটি সাবলীলভাবে অনেকগুলো গ্রানাইট পাথরের খন্ড টেনে নিয়ে আসছে। পাথরগুলো এতই ভারী যে, স্লেডটি মাটিতে গভীর দাগ টেনে আসছে।


লোকটি যখন দেবতাদের দেখতে পেল, সে তার হাত নেড়ে আনন্দিতভাবে সুপ্রভাত জানাল। সে উদীয়মান সূর্যের দিকে ইশারা করল আর দেবতাদের উদ্দেশ্যে চোখ টিপল। সে স্লেড থেকে ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে নিলো আর তাকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিলো। তারপর সে আগের দিন খুঁড়ে রাখা পরিখায় পাথরের খন্ডগুলো অনায়াসে দক্ষতায় বসাতে শুরু করল।
“ঘোড়াটা আসলেই খুব শক্তিশালী,” সবচেয়ে সুন্দর দেবতা বাল্ডার বলল। “কোনো সাধারণ ঘোড়া এত ভারী পাথর টানতে পারার কথা নয়।”
“এতটা শক্তিশালী ঘোড়ার কথা আমরা কল্পনাই করিনি,” বলল জ্ঞানী দেবতা ভাসির।
“আহ,” বলল লোকি, “ঘোড়াটা দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এটা তার প্রথম দিন। এটা প্রতিরাতে এত পাথর টানতে পারবে না। আর শীত আসছে। ভারী তুষার পড়বে, তুষারঝড়ে চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে আসবে, পাহাড়ে যাতায়াত অনেক কঠিন হয়ে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। সবই আমাদের পরিকল্পনামাফিক হবে।”
“আমি তোমাকে ঘৃণা করি,” শক্ত মুখ করে লোকির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্রেয়া বলল। সে ভোর হতেই এসগার্ডে ফিরে গেল, অন্যদের মতো প্রাচীরের ভিত্তি তৈরী হওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করল না।
প্রতি রাতে নির্মাতা আর তার ঘোড়া খালি স্লেড নিয়ে পাহাড়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেত। প্রতিদিন সকালে তারা ফিরে আসত, ঘোড়াটি প্রতিদিনই বিশটি করে গ্রানাইটের খন্ড টেনে নিয়ে আসত, যার প্রতিটি খন্ডের আকার ছিল সবচেয়ে লম্বা মানুষের চেয়েও বড়।
প্রতিদিন প্রাচীর উঠতে লাগল, প্রতিদিন বিকেলে সেটি পূর্বের দিনের চেয়ে আরো বৃহৎ হয়ে উঠতে লাগল।
ওডিন দেবতাদের ডেকে পাঠাল।
“প্রাচীরটি দ্রুত তৈরী হয়ে যাচ্ছে,” বলল সে। “আর আমরা একটি অলঙ্ঘনীয় শপথ, বাহুবন্ধনীর শপথ আর অস্ত্রের শপথ করেছি যে, যদি সে সময়মত প্রাচীর তৈরী করতে পারে, আমরা তাকে চন্দ্র আর সূর্য দেব আর সুন্দরী ফ্রেয়ার সাথে বিয়ে দেবো।”
জ্ঞানী ভাসির বলল, “নির্মাতা লোকটি যে কাজ করছে, কোনো মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। আমার সন্দেহ হয়, সে কোনো মানুষ নয়।”
“একটা দানব সম্ভবত,” বলল ওডিন।
“যদি থর এখানে থাকত!”, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাল্ডার বলল।
“থর উত্তরে ট্রোলদের সাথে যুদ্ধ করছে,” বলল ওডিন। “সে যদি ফিরেও আসে, আমাদের শপথ অলঙ্ঘনীয়।”
লোকি তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। “আমরা সবাই বৃদ্ধ মহিলাদের মতো অকারণে উদ্বিগ্ন হচ্ছি। সে যদি সবচেয়ে শক্তিশালী দানবও হয়, লোকটা গ্রীষ্মের প্রথম দিনের আগে প্রাচীরের কাজ শেষ করতে পারবে না। এটা একেবারেই অসম্ভব।”
“থর যদি এখন থাকত,” বলল হাইমডেল, “কি করতে হবে, সে হয়ত বলতে পারত।”
তুষার পড়া শুরু হয়ে গেল, কিন্তু ভারী তুষারও প্রাচীর নির্মাতাকে থামাতে পারল না, পারল না সাভদিলফেয়ারির গতিও কমাতে। বাদামী মদ্দা ঘোড়াটি ভারী তুষার আর তুষার ঝড়ের ভিতর দিয়ে, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা আর সরু গিরিসংকটের মধ্য দিয়ে বড়ো বড়ো পাথরভরা স্লেড টেনে নিয়ে যেতে থাকল।
দিন বড়ো হতে থাকল। প্রতিদিন অনেক পূর্বেই সকাল হতে লাগল। বরফ গলতে শুরু করল, বরফগলা জলে ভারী কাদা জল তৈরী হলো, যেটা জুতোতে আটকে থাকে আর চলাচলের সময় পা আঁকড়ে থেকে চলার গতি কমিয়ে দেয়।
“ঘোড়াটা এই কাদার মধ্য দিয়ে পাথর টানতে পারবে না,” বলল লোকি। “পাথর কাদাপানিতে ডুবে যাবে আর ঘোড়ার পা কাদায় আটকে যাবে।”


কিন্তু সাভদিলদেয়ারিকে ভারী কাদাজল আটকাতে পারল না, সে একইভাবে পাথর টেনে এসগার্ডে আনতে লাগল, যদিও পাথরের স্লেড এত ভারী ছিল যে, সেটি পাহাড়ের পাদদেশে গভীর দাগ সৃষ্টি করেছিল। এখন নির্মাতা লোকটিকে শত শত ফুট উপরে পাথর উঠাতে হচ্ছিল, আর সে অনায়াসে সেগুলো একটার উপর একটা বসিয়ে প্রাচীর বানিয়ে যাচ্ছিল।
কাদা শুকিয়ে গেল, আর বসন্তের ফুল ফুটতে শুরু করল, আর এসগার্ডের চারদিকে উঠতে লাগল সুবৃহৎ এক প্রাচীর। এটি তৈরী সম্পন্ন হলে এটি হবে অলঙ্ঘনীয়, কোনো দানব, ট্রোল, বামন বা মানুষ এটা পেরিয়ে এসগার্ডে ঢুকতে পারবে না। আর আগন্তুক লোকটি একতালে প্রাচীর বানিয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টি হোক কিংবা তুষারপাত, লোকটি আর তার ঘোড়া কিছুই কেয়ার করছিল না। প্রতিদিন সকালে তারা পাহাড় থেকে পাথর টেনে আনত, প্রতিদিন নির্মাতা লোকটা পুর্বের দিনের কাজের উপর গ্রানাইটের খন্ড বসিয়ে প্রাচীরটি আরো উঁচু করত।
আর এখন শীতের শেষ দিন এসে গেছে, প্রাচীরের কাজ প্রায় শেষ।
এসগার্ডে দেবতারা তাদের সিংহাসনে বসেছে, তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে।
“সূর্যটা”, বলল বাল্ডার, “আমরা সূর্যটা দিয়ে দিলাম!”
“রাত-দিন আর সপ্তাহ হিসাব করার জন্য আকাশে আমরা চন্দ্রকে স্থাপন করেছিলাম,” কাব্যের দেবতা ব্রাগি বলল হতাশভাবে, “আমরা আর চাঁদের দেখা পাব না।”
“আর ফ্রেয়া, ফ্রেয়াকে ছাড়া আমাদের কিভাবে চলবে?”, জানতে চাইল টীর।
“নির্মাতা লোকটি যদি আসলেই একটা দানব হয়,” বরফশীতল কন্ঠে বলল ফ্রেয়া, “তাহলে আমি তাকে বিয়ে করব আর তার সাথে যতুনহাইমে চলে যাব। মজার বিষয় হলো, আমি কাকে বেশি ঘৃণা করব, দানবটিকে যে আমাকে নিয়ে যাবে, নাকি তোমাদের সবাইকে যারা আমাকে তার হাতে তুলে দেবে?”
“এভাবে বলো না”, লোকি কথা বলতে শুরু করল, কিন্তু ফ্রেয়া তাকে কথা না বলতে দিয়ে বলে উঠল, “যদি দানবটি আমাকে নিয়ে যায়, চন্দ্র আর সূর্য নিয়ে যায়, আমি এসগার্ডের দেবতাদের কাছ থেকে শুধু একটি জিনিস চাই।”
“কি চাও তুমি,” জানতে চাইল বিশ্বপিতা ওডিন, যে এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি।
“যে এই দুর্যোগের জন্য দায়ী আমি যাওয়ার আগেই তার মৃত্যুদন্ড দেখতে চাই,”, বলল ফ্রেয়া, “আমার মনে হয়, এতে উচিত বিচার হবে। যদি আমাকে তুষার দানবদের রাজ্যে যেতে হয়, আকাশ থেকে চন্দ্র আর সূর্যকে খুলে নেওয়া হয় আর পৃথিবী অনন্ত আঁধারে ঢাকা পড়ে, যে আমাদের এই অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে, জীবন দিয়ে তাকে এর দায় চুকাতে হবে।”
“আহ”, বলে উঠল লোকি, “দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করাটা খুবই কঠিন হবে। আমার যদ্দুর মনে পড়ে, সকল দেবতারাই এই দুর্ভাগ্যজনক ভুলের জন্য দায়ী। সবাই মিলেই বিষয়টি প্রস্তাব করেছিল, আর সবাই তাতে রাজি হয়েছিল।”
“তুমি এটা প্রস্তাব করেছিলে,” বলল ফ্রেয়া। “তুমি এই বেকুবদের কথার জালে ফাঁসিয়েছ। আমি এসগার্ড ত্যাগ করার পূর্বেই তোমাকে মৃত দেখতে চাই।”


“আমরা সবাই”, বলতে শুরু করল লোকি, কিন্তু দেবতাদের সবার চেহারার ভাব দেখে সে চুপ মেরে গেল।
“লাউফির পুত্র লোকি”, বলল ওডিন, “এটা তোমার কু পরামর্শের ফল”।
“এটা তোমার অন্য পরামর্শের মতই খারাপ ছিল,” বলল বাল্ডার। লোকি তার দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানল।
“আমরা চাই, নির্মাতা লোকটা তার বাজিতে হেরে যাক”, বলল ওডিন, “শর্ত ভঙ্গ করা ছাড়াই। তাকে অবশ্যই ব্যর্থ হতে হবে।”
“আমি জানি না, আপনি আমার কাছে কি আশা করেন,” বলল লোকি।
“আমি তোমার কাছে কিছু আশা করি না,” বলল ওডিন, “কিন্তু যদি নির্মাতা কাল বিকালের মধ্যে প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়, তোমার মৃত্যু খুবই দীর্ঘ আর যন্ত্রণাদায়ক, খারাপ আর লজ্জাস্কর হবে।”
লোকি একে একে সকল দেবতাদের দিকে তাকাল, তাদের চেহারায় সে শুধু রাগ, ঘৃণা আর মৃত্যু দেখতে পেল। সে কোনো দয়া বা ক্ষমার লেশমাত্র দেখতে পেল না।
এটা আসলেই খুব খারাপ মৃত্যু হবে। কিন্তু এখন বিকল্প কী? সে কি করতে পারে? সে নির্মাতাকে আক্রমণ করতে পারে না। পরিবর্তে-লোকি মাথা ঝাকাল। “এটা আমার উপর ছেড়ে দিন।”
লোকি হল ছেড়ে বেরিয়ে গেল, কোনো দেবতাই তাকে থামানোর কোনো চেষ্টা করল না।
(চলবে)
নীল গেইম্যানের ‘নর্স মিথোলজি’ থেকে অনূদিত। অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here