নরওয়ের রূপকথা

0
160


মহানির্মাতা- গল্পের শেষ অংশ
নির্মাতা প্রাচীরে পাথর বসানোর কাজ আজকের মতো শেষ করল। আগামীকাল গ্রীস্মের প্রথমদিনে, যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকবে, সে তার প্রাচীর নির্মাণ কাজ শেষ করবে এবং তার পারিশ্রামিক নিয়ে এসগার্ড ত্যাগ করবে। আর মাত্র বিশ খন্ড পাথর বসানো বাকি। সে তার উঁচু কাঠের মাঁচা থেকে নামল আর শীষ বাজিয়ে তার ঘোড়াটিকে ডাকল। সভদিল ফেয়ারি বরাবরের মতই প্রাচীর থেকে আধা মাইল দূরে বনের ধারে লম্বা ঘাসের তৃণ ভূমিতে ঘাস খাচ্ছিল। কিন্তু সে বরাবরই মালিকের শীষ শুনে প্রাচীরের কাছে ফেরত আসত।
নির্মাতা তার পাথর টানা কাঠের স্লেডের দড়িটি ধরল আর সেটি ঘোড়ায় আটকানোর জন্য গিট পাকিয়ে তৈরী করল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে গেছে, কিন্তু সেটা আগামী কয়েক ঘন্টায় অস্ত যাবে না, আকাশের উঁচুতে স্বর্গের কাছে বাঁকা চাঁদটাকে ধূসর দেখালেও ছিল স্বমহিমায় বর্তমান। শীঘ্রই এই দুটোই তার হবে, আর ফ্রেয়া, যে সূর্য আর চন্দ্রের চেয়েও সুন্দর। জয়ের ফলাফল তার হাতে আসার আগে নির্মাতা সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হতে রাজি নয়। সে দীর্ঘদিন- সমগ্র শীতকাল কঠোর পরিশ্রম করেছে।
সে তার ঘোড়ার জন্য আবার শীষ বাজাল। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, তাকে কখনোই দুবার শীষ বাজাতে হয় না। সে এবার সভদেল ফেয়ারিকে দেখতে পেল, তৃণভূমির বন্য ফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাকাতে, একপা এগোয়তো এক পা পিছিয়ে যায়, যেন সে বসন্তের উষ্ণ বাতাসে মনোমুগ্ধকর কিছুর ঘ্রাণ পেয়েছে। “সভদিল ফেয়ারি, নির্মাতা ডাক দিলো, আর ঘোড়াটি কান খাড়া করল আর তৃণভূমির মধ্যদিয়ে প্রাচীর পানে দ্রুতগতিতে ধাবিত হলো।
নির্মাতা ঘোড়াটিকে তার দিকে ছুটে আসতে দেখে সন্তুষ্ট হলো। তৃণভূমিতে ঘোড়ার খুরের শব্দধ্বনিত হচ্ছিল, সেই শব্দ উঁচু গ্রানাইটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। একসময় নির্মাতার কাছে মনে হচ্ছিল, একপাল ঘোড়া বুঝি তার দিকে ছুটে আসছে।
না, একপাল ঘোড়া নয়, শুধু একটাই ঘোড়া, ভাবল নির্মাতা।
সে তার মাথা নাড়ল আর তার ভুল বুঝতে পারল। একটা ঘোড়াতো নয়! একটা ঘোড়ার খুরের শব্দ নয়, দুইটা ঘোড়ার শব্দ।
দ্বিতীয় ঘোড়াটি ছিল একটা পিঙ্গল বর্ণের মাদী ঘোড়া। নির্মাতা এক নজর দেখেই বুঝল, সেটা একটা মাদী ঘোড়া। সভদেল ফেয়ারি চরকির মতো ঘুরল আর তৃণভূমির ভিতর দিয়ে ছুটে গেল, গতি কমাল আর উচ্চস্বরে ডেকে উঠল।
পিঙ্গল বর্ণের মাদী ঘোড়াটা তাকে পাত্তাই দিল না। সে দৌড়ান বন্ধ করল, যেন সে মদ্দা ঘোড়াটাকে দেখতেই পায় নি, সে মাথা নিচু করে ঘাস খাওয়ার ভান করল, কিন্তু সভদেল ফেয়ারি তার ৮-১০ গজের কাছে যেতেই সে দৌড়াতে শুরু করল, প্রথমে আস্তে আস্তে, ক্রমেই দ্রুত গতিতে। বাদামী মদ্দা ঘোড়াটি তার পিছন পিছন ধাবিত হলো, দৌড়ে মাদী ঘোড়াটিকে ধরার চেষ্টা করতে লাগল, প্রায়ই খুব কাছে পৌছে যাচ্ছিল, আবার পিছনে পড়ে যাচ্ছিল।
গোধুলির সোনালী আলোয় ধুসর আর বাদামী রঙের ঘোড়া দুটো তৃণভূমিতে ছুটে বেড়াতে লাগল, যেন নৃত্যরত একটা জুটি নেচে চলেছে।
নির্মাতা জোরে তালি বাজাল, শীষ দিল, সভদেল ফেয়ারির নাম ধরে বারবার ডাকল, কিন্তু মদ্দা ঘোড়াটি তার দিকে ফিরেও তাকাল না।
ঘোড়াটিকে ধরার জন্য নির্মাতা তৃনভূমিতে দৌড়ে গেল, কিন্তু পিঙ্গল বর্ণের ঘোড়াটি যেন জানত তাকে কি করতে হবে। সে মদ্দা ঘোড়াটির মাথার পাশে তার কান আর নাক ঘসল, আর বনের দিকে দিকে দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করল, এত দ্রুত গতিতে ছুটছিল, যেন তার পিছনে নেকড়ে আক্রমণ করেছে। সভদেল ফেয়ারি তার পিছন পিছন ছুটল আর মুহূর্তের মধ্যে তারা বনের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
নির্মাতা ঘোড়াটিকে অভিশাপ দিলো আর ঘোড়াটির ফিরে আসার অপেক্ষা করল।
ছায়ারা ক্রমে দীর্ঘায়িত হলো কিন্তু সভদেলফেয়ারী ফিরে এলো না।
নির্মাতা তার পাথর টানা স্লেডের কাছে ফিরে এল। সে বনের দিকে তাকাল। হাতে থুথু ফেলে স্লেডের দড়ি তুলে নিল আর ঘাসের তৃণভূমি আর বসন্তের ফুলের রাজ্য পেরিয়ে পাহাড়ের খনির দিকে রওনা হয়ে গেল।
সে ভোরের মধ্যে ফিরে এলো না। নির্মাতা যখন পাথরের স্লেড নিয়ে এসগার্ডে ফিরে এল, তখন সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে।
তার স্লেডে ছিল মাত্র দশটি পাথরের খন্ড, এই কয়টি খন্ডই সে কেটে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে, সে ভারী পাথরগুলোকে গালাগাল দিচ্ছিল আর পাথর টানা স্লেডটাকে টেনে হিচড়ে প্রাচীরের কাছে নিয়ে আসছিল।
তোরণের কাছে দাঁড়িয়ে সুন্দরী ফ্রেয়া তাকে দেখছিল।
“তোমার কাছে মাত্র দশটি পাথর খন্ড আছে”, ফ্রেয়া তাকে বলল, “দেয়ালের কাজ শেষ করার জন্য তোমার এর দ্বিগুন পাথর খন্ড দরকার।”
নির্মাতা কিছুই বলল না। সে শক্ত মুখে তার পাথরগুলো টেনে অসমাপ্ত তোরণের কাছে আনল। তার চেহারায় হাসির লেশমাত্র ছিল না।
“থর পূর্ব থেকে ফিরে আসছে”, ফ্রেয়া বলল তাকে, “সে শীঘ্রই আমাদের সাথে যোগ দেবে।”
এসগার্ডের দেবতারা নির্মাতাকে পাথর নিয়ে আসতে দেখে এগিয়ে এল। তারা রক্ষাব্যুহের মতো ফ্রেয়াকে ঘিরে দাঁড়াল।
তারা প্রথমে নিঃশব্দে দেখল, তারপর তাদের চেহারায় হাসি ফুটল, তারা উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল।
“হেই”, চিৎকার করল বাল্ডার, “তুমি সূর্যটা পাবে যদি তুমি প্রাচীরটা শেষ করতে পার। তোমার কি মনে হয়, তুমি সূর্যটা সাথে নিয়ে যেতে পারবে?”
“এবং চন্দ্রটা”, বলল ব্রাগি, “দুঃখের বিষয় হলো, তোমার ঘোড়াটা তোমার সাথে নেই। সে থাকলে তোমার সবগুলো পাথর টেনে আনতে পারত।”
দেবতারা সবাই উচ্চস্বরে হাসতে লাগল।
নির্মাতা তার স্লেডের দড়ি ছেড়ে দিয়ে দেবতাদের দিকে ফিরল। “তোমরা প্রতারণা করেছ!” বলল সে। তার মুখ রাগে কালো হয়ে গিয়েছিল।
“আমরা প্রতারণা করিনি, বলল ওডিন। “তোমার চেয়ে বেশি নয়। তুমি কি মনে কর তুমি একটা দানব এটা জানার পর আমরা তোমাকে প্রাচীর বানাতে দিতাম?”
নির্মাতা এক হাতে একটা গ্রানাইটের খন্ড তুলে নিয়ে আরেক হাত দিয়ে আঘাত করে সেটা দুই টুকরা করল। সে দুই হাতে দুই খন্ড পাথর নিয়ে দেবতাদের দিকে ঘুরল। সে ক্রমে লম্বা হতে লাগল, লম্বা হতে হতে পঞ্চাশ ফুট ছাড়িয়ে গেল। তার চেহারা দুমড়ে গেল, তাকে আর এক মৌসুম আগে আসা শান্ত আর স্থিরচিত্তের আগন্তুকের মত লাগছিল না। তার চেহারা রাগে ঘৃণায় মিশ্রিত পাথুরে গ্রানাইট মুর্তির মতো লাগছিল।
“আমি পাহাড়ী দানব,” বলল সে। “আর তোমরা দেবতারা সব প্রতারক আর নোংরা শপথ ভঙ্গকারী। যদি আমার ঘোড়াটা থাকত, আমি প্রাচীরের কাজ শেষ করে ফেলতে পারতাম। সুন্দরী ফ্রেয়া, চাঁদ আর সূর্যকে আমার পারিশ্রামিক হিসেবে নিয়ে যেতে পারতাম। আমি তোমাদের অনন্ত অন্ধকার আর ঠান্ডায় রেখে যেতাম।”
“কোনো শপথ ভঙ্গ করা হয়নি,” বলল ওডিন। “কিন্তু কোনো শপথই এবার তোমাকে আমাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।”
পাহাড়ি দানব রাগে গর্জন করে উঠল, আর দুই হাতে দুই পাথর খন্ড নিয়ে দেবতাদের দিকে ধেয়ে এল।
দেবতারা দুপাশে সরে গেল, শুধুমাত্র তখনই দানবটা দেখতে পেল তাদের পিছনে কে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ম পরা বিশালাকৃতির লাল দাড়ির এক দেবতা, হাতে একটা লোহার হাতুড়ি। সে হাতুড়িটা একবার মাত্র ঘুরাল, সেটা দানবের দিকে তাক হতেই হাত থেকে ছেড়ে দিলো।
থরের হাত থেকে হাতুড়িটি ছুটি যেতেই আকাশে বিজলি চমকে উঠল আর বজ্রপাতের শব্দ হলো।
পাহাড়ী দানব তার দিকে হাতুড়িটি ছুটে আসতে দেখল, সেটি যতই কাছে আসছিল ততই বৃহৎ হচ্ছিল। হাতুড়ির আঘাতে দানবের ভবলিলা সাঙ্গ হলো।
দেবতারা তারপর নিজেরা প্রাচীরের বাকী কাজ শেষ করল। যদিও পাহাড়ের উঁচু খনি হতে পাথর কেটে সেগুলোকে টেনে এসগার্ডে এনে তোরণের উপর সঠিক স্থানে বসাতে তাদের আরো অনেক সপ্তাহ লেগে গিয়েছিল। মহা নির্মাতার কাটা আর বসানো পাথরের মতো সেগুলো এতটা নিখুঁতভাবে কাটা বা বসানো ছিল না।
অনেক দেবতার মত ছিলো দানবটাকে থর মেরে ফেলার আগে তাকে দিয়ে প্রাচীরের আরো কিছু কাজ করিয়ে নেওয়া যেত। পূর্বদিক থেকে ফিরে আসার পর মজাদার একটা কাজ তার জন্য তৈরী রাখার জন্য থর দেবতাদের প্রশংসা করল।
আশ্চর্যজনকভাবে, সভদেলফেয়ারিকে প্রলুদ্ধ করে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশংসার বন্যায় ভাসার জন্য লোকিকে খুজে পাওয়া গেল না। সে কোথায় আছে, কেউ জানত না। যদিও এসগার্ডের তৃণভূমিতে চরে বেড়ান একটা চমৎকার পিঙ্গলবর্ণের মাদী ঘোড়ার কথা লোকমুখে প্রায়ই শোনা যেত। বছরের একটা বড় সময় লোকি নিরুদ্দেশ থাকল, তারপর হঠাতই একদিন উদয় হলো, একটা ধুসর অশ্বশাবক সাথে নিয়ে।
এটা ছিল একটা খুবই সুন্দর অশ্বশাবক কিন্তু তার চার পায়ের পরিবর্তে আটটি পা ছিল। অশ্বশাবকটি লোকি যেখানে যেত, তার পিছন পিছন যেত, তার গায়ে নাক ঘসত আর এমন আচরণ করত যেন লোকি তার মা এবং আসলে সে তাই ছিল।
অশ্ব শাবকটি বড় হয়ে ‘স্লিপনির’ নামে এক বিশাল ধুসর মদ্দা ঘোড়ায় পরিণত হয়, সবচেয়ে শক্তিশালী আর সবচেয়ে দ্রুতগামী, এত দ্রুতগামী আর শক্তিশালী অশ্বকে কেউ কখনো দেখে নি, যে বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছুটতে পারত।
মানুষ আর দেবতাদের দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো ঘোড়া স্লিপনিরকে লোকি ওডিনকে উপহারস্বরূপ প্রদান করে।
অনেকেই ওডিনের ঘোড়ার প্রশংশা করে কিন্তু খুব কম লোকই লোকির উপস্থিতিতে ঘোড়াটির জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কথা বলার সাহস রাখে। লোকি কিভাবে সভদেলফেয়ারিকে প্রলুদ্ধ করে তার মালিকের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল আর তার নিজের মন্দ পরামর্শের প্রভাব থেকে দেবতাদের রক্ষা করেছিল, এই বিষয়ে তোমাকে কোনো কথা বলতে শুনলে লোকি তোমার জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করতেও পিছপা হবে না। লোকি তার অসন্তোষ পুষে রাখে এবং এই ছিল দেবতাদের প্রাচীর তৈরী হওয়ার গল্প।
নীল গেইগ্যানের ‘নর্স মিথোলজি’ থেকে অনূদিত। অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here