নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া

0
662

নারী ও শিশু ডেস্ক: বেগম রোকেয়া সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন বিভ্রান্তি দূর করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। অবরোধ, নারী স্বাধীনতা, পর্দা, অশ্লীলতা, যৌতুক প্রথা, বিধবা বিয়ে, বাল্যবিয়ে, তালাক নিয়ে ভ্রান্তি ও বাড়াবাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ইসলামের সঠিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। কাজেই বেগম রোকেয়াকে ইসলামী চিন্তাবিদ বলা যায়।

রোকেয়াকে নিয়ে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, তার সামগ্রিক লেখনী ও জীবনের শিক্ষা বাদ দিয়ে খণ্ডিত কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন। এসব বিতর্ক ইতোমধ্যে নানাভাবে অত্যন্ত সার্থকতার সাথেই খণ্ডন করা হয়েছে। বেগম রোকেয়ার এই উদ্ধৃতি দেওয়া হয় যাতে তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা প্রথমত যাহা মানি নাই পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়ে শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রচার করিয়াছেন।’’

এখানে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। কিন্তু যদি রোকেয়ার সামগ্রিক সাহিত্যের আলোকে এ মন্তব্য ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে দেখা যাবে এসব হচ্ছে মূলত তার ক্ষোভের কথা। এখানে ধর্মগ্রন্থ বলতে কোনোভাবেই কুরআন বা হাদিসকে বোঝানো হয়নি। বরং সে সময় ধর্মগ্রন্থের নামে কিছু অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তির বই প্রচলিত ছিল যাতে নারী অধিকারের বিপক্ষে বলা হতো। কুরআনে সামগ্রিকভাবে নারী-পুরুষের সাম্যের কথা বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, ‘যদি ঈশ্বর কোনো দূত রমণী-শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধহয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। দূতগণ ইউরোপে যান নাই কেন? আমেরিকা এবং সুমেরু হইতে কুমেরু পর্যন্ত যাইয়া ‘রমণী জাতিকে নরের অধীনে থাকিতে হইবে’ ঈশ্বরের এই আদেশ শুনান নাই কেন? ঈশ্বর কি কেবল এশিয়ারই ঈশ্বর?

তার এ কথায় দূত বলতে বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.)-কে মনে করা সঙ্গত হবে না। বরং যেসব পুরুষ অন্যায়ভাবে ঐশ্বরিক দুতের বার্তার অপব্যাখ্যা করে এ অঞ্চলে নারীকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন তাদেরই বোঝানো হয়েছে। কেননা রোকেয়া তার বিভিন্ন লেখায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিভিন্ন প্রসঙ্গে প্রাণভরে স্মরণ করেছেন। তার চেয়েও বড়ো কথা ‘মতিচূর’ প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’, ‘নবনূর’-এ প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমাদের অবনতি’ শিরোনামে। এতে মূল প্রবন্ধের পাঁচটি পরিচ্ছদ পরিবর্জিত হয়ে নতুন সাতটি অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়েছিল, যাতে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ ছিল না। অথচ আজও রোকেয়ার এ দু-একটি উদ্ধৃতিকে অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। (দ্রষ্টব্য : এ রহমান, বেগম রোকেয়া ও ইসলাম, দি উইটনেস প্রকাশিত ‘রোকেয়া সন্ধানে’ থেকে)।

বাংলা ১৩৩৮ সালের মাসিক মোহাম্মদীতে রোকেয়া মুসলমানদের নামের বিকৃতির বিষয়ে কঠোরভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মুসলমানদের নাম আরবি ভাষায় হবে এটিই ট্রাডিশন। এটি তাকে সঠিক পরিচয় দেয়। রোকেয়া এর ওপর দৃঢ় থাকতে বলেছিলেন।

তিনি ১৩৩৮ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদীতে স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ছেলেবেলায় আমি মার মুখে শুনতাম, ‘ কুরআন শরীফ ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করবে’ এসব কথা অতি সত্যি। কোরআন শরীফের সর্বজনীন শিক্ষা আমাদের নানা কুসংস্কারের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কুরআন শরীফের বিধান অনুযায়ী ধর্ম-কর্ম আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করবে।”

এত স্পষ্ট বক্তব্যের পরও বেগম রোকেয়াকে ধর্ম বিরোধী ও ইসলাম বিরোধী বলা চরম মিথ্যাচার ও একাডেমিক ডিজঅনেস্টি। বেগম রোকেয়া একজন উঁচু মানের সমাজ সংস্কারক ছিলেন।

বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো আমাদের উপমহাদেশের নারীরা বহুকাল ধরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত ও নির্যাতিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপারে সঙ্কীর্ণতা আমাদের সমাজের বৈশিষ্ট্য, যার প্রধান কারণ হলো কুসংস্কার ও বাড়াবাড়ি। এসবের বিরুদ্ধে যে কণ্ঠটি সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে সেটি বেগম রোকেয়ার। তারই প্রচেষ্টায় একশ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে নারীর অবস্থা কিছুটা উন্নতি লাভ করেছে বলে মনে হয়। বেগম রোকেয়া যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন সে বিবেচনায় তার বলিষ্ঠতা ও সাহসিকতা আমাদের অভিভূত করে। সে সমাজে এমন বিপ্লবী কথা উচ্চারণ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু বেগম রোকেয়া নির্ভীকচিত্তে তার বক্তৃতায়, লেখায় ও কাজে নারীমুক্তির কথা ব্যক্ত করেছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। সেসব দিক থেকে বেগম রোকেয়া যেকোনো বিবেচনায় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কয়েকজন নারীর একজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here