নারী জাগরণে লালন সাঁই

0
219

নারী ও শিশু ডেস্ক: নারী লালনের গানের একটি অন্যতম প্রধান উপজীব্য। বিভিন্ন গানের মাধ্যমে লালন নারীর অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন। তিনি নারীকে ঘরের বউ থেকে সমাজ উন্নয়নের অংশ ওঠার জন্য আহ্বান করেছেন।

লালন তার গানে বলেছেন, ‘কুলের বৌ হয়ে মন আর কতদিন থাকবি ঘরে/ঘোমটা ফেলে চল না রে যাই সাধবাজারে।’ এই গানের মাধ্যমে লালন নারীর প্রতি পুরনো ধারণা ঝেড়ে ফেলে নতুন ধারণার প্রবর্তন করেছেন। সমাজের বহু বছরের পুরনো সংস্কার পরিবর্তনের জন্য যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। লালন ফকির যে শুধু নারী মুক্তির কথা বলেছেন তা নয়, তিনি তার সাধনার সঙ্গী রূপেও নারীকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

লালনের নারী সাধনা নিয়ে বহু মত প্রবর্তিত আছে। অনেকেই লালনের নারী সাধনা সম্পর্কে তির্যক মন্তব্য করেছেন। যদিও লালনের মূল নারী সাধনা তা সমর্থন করে না। কিন্তু কিছু ভণ্ড ও অসাধু বাউলের বিকৃত মানসিকতার ফলে অনেকেই লালন সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করেন। লালনের বিভিন্ন গানে নানা নারী পৌরাণিক চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। রাধা, যশোদা, সুভদ্রা, দেবকী এমন আরও অনেকেই। রাধা কখনও তার গানে এসেছে গোপী, কখনও বা রাইকিশোরী, আবার কখনও চন্দ্রাবলী হয়ে। লালনের গানে এসেছে যশোদা এবং দেবকীর নানা কথা ও কাহিনী। যেমন একটি গানে তিনি বলেছেন, ‘ছেড়ে দে মা হাতের বাঁধন/যেদিকে যায় এই দুই নয়ন/পরের মাকে ডাকবে এখন লালন/তোর গৃহে আর রবে না।’ লালন নারীর কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘কালো চুলে শোভে নারী/সাদা হলে হয় সে বুড়ি।’ অর্থাৎ বয়স বাড়লে নারীর মর্যাদা বা সমাজে তার কদর কমে যায়। নারীকে লালন তার বহু গানে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন, সুন্নাত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কী হয় বিধান/বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/বামনি চিনি কী ধরে ॥

মরমি সাধক লালন ফকির আমাদের সামাজিক পরিবেশে নারীর বেদনার কথা অনেক উপমার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি সমাজ সংসারের অন্তরালে চাপা পড়া নারীর শক্তির কথা তুলে ধরেছেন। নারীকে তার আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল করেছেন। নারী যে কেবল কুলের বউ নয়, নারীও শক্তি সে কথা আমরা লালনের বহু গানে পেয়েছি।

মানুষ স্বভাবতই স্বাধীনতা চায়। নারীও তার ব্যতিক্রম নয়। যে একবার স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করেছে সে আর পরাধীনতার বেড়ি পরতে চাইবে না। নারীর এই প্রকৃতিই উঠে এসেছে লালনের ‘কুলের বউ ছিলাম বাড়ি/হলাম ন্যাড়ি ন্যাড়ার সাথে/ কুলের আচার কুলের বিচার/আর কি ভুলি সেই ভোলাতে’থ এই লাইনগুলোতে।

বাঙালি সমাজে নারী ছিল অপরিহার্য কিন্তু মূল্যহীন। সীমাবদ্ধ জীবন ছিল নারী জীবনের রূপরেখা। উনিশ শতকে বাঙালি নারী সমাজের জাগরণ ঘটেছিল। নারী নানাভাবে নিজের স্বাতন্ত্র ও স্বাধিকার ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিল। লালনের নানা গান ও মতও এ ব্যাপারে নারী জাগরণের উৎসাহ জুগিয়েছে।

মহাত্মা লালন তার আদর্শে, মতে, পথে সর্বদাই নারীর শক্তির, নারীর গৌরবের দিক তুলে ধরেছেন। আমাদের আজকের সমাজেও যার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু কমেনি।

তথ্যসূত্র: প্রজ্ঞা সিদ্দীক, লালন সাঁই ও নারী অধিকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here